ইরান যুদ্ধ: রাশিয়া-চীন লাভে, পশ্চিমা বিশ্ব চাপে
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের বড় ধরনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়র্কশায়ারের বাড়িগুলোতে হিটিং তেলের বিল বেড়ে যাওয়া থেকে শুরু করে পাকিস্তানে খরচ বাঁচাতে স্কুল বন্ধ রাখা—এর আর্থিক প্রভাব ইতোমধ্যেই স্পষ্ট।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার জেরে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরিতে তেহরানের নেওয়া পাল্টা পদক্ষেপ যে সাময়িক নয়, তা ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে। এর প্রভাবও অসম; কেউ বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে, আবার কেউ লাভবান হচ্ছে।
নরওয়ে, কানাডা ও রাশিয়া লাভবান
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর প্রচেষ্টা থাকলেও, বিশ্ব এখনও তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিপুল মজুত থাকা দেশগুলোর জন্য এটি বড় সম্পদের উৎস, আর তাই অপরিশোধিত তেলকে 'ব্ল্যাক গোল্ড' বলা হয়। তাই এর দাম বাড়লে উৎপাদকরা লাভবান হয়, আর ব্যবহারকারীদের খরচ বাড়ে।
তবে এবারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক তেলের দামের ধাক্কার মতো নয়। মধ্যপ্রাচ্য এখনও বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের কেন্দ্র, আর হরমুজ প্রণালি তা পরিবহনের প্রধান পথ। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করায় এর প্রভাব পড়েছে কাতার ও সৌদি আরবের মতো উপসাগরীয় উৎপাদক দেশগুলোর ওপর।
ফলে বিকল্প উৎসের খোঁজে গ্রাহকরা এখন ঝুঁকছে নরওয়ে ও কানাডার মতো দেশের দিকে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর রুশ গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে গিয়ে নরওয়ে উৎপাদন বাড়িয়ে সুযোগ নেয়।
কানাডাও নিজেকে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি উৎপাদক হিসেবে তুলে ধরলেও, দেশটির উৎপাদন বাড়ানোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে রাশিয়া। ইতোমধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট কমাতে ওয়াশিংটন কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করায় ভারতের কাছে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল বিক্রি ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
কিছু হিসাব অনুযায়ী, মার্চের শেষ নাগাদ মস্কো অতিরিক্ত ৫ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে এবং ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ জ্বালানি আয়ের পথে রয়েছে।
এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্ষতির বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত রাশিয়ার জন্য বড় আর্থিক সুবিধা তৈরি করে দিচ্ছে। একই সঙ্গে, কয়লার ব্যবহার বাড়াতে থাকা দেশগুলোর কারণে ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় রপ্তানিকারকের জন্যও এটি একটি বড় সুযোগ হয়ে উঠছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ ক্ষতিগ্রস্ত
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই পুরোপুরি লাভবান নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র 'বিপুল অর্থ আয় করে'। বাস্তবতা হলো, দাম বর্তমান পর্যায়ে থাকলে মার্কিন তেল উৎপাদকরা অতিরিক্ত কয়েক দশক বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রকে নিট লাভবান বলা যায় না। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় কিছু মার্কিন কোম্পানি ক্ষতির মুখে পড়েছে। কাতারের রাস লাফান শিল্প এলাকায় এক্সনমোবিলের কার্যক্রম মার্চের শুরু থেকে বন্ধ এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়া, দীর্ঘদিন উৎপাদন সক্ষমতা কমিয়ে রাখায় অনেক শেল তেল উৎপাদক দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারছে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাথাপিছু হিসেবে আমেরিকানরা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি তেল ও গ্যাস ব্যবহার করে। শীতকালে ঘর গরম রাখা থেকে শুরু করে গাড়ি চালানোর মৌসুম, সব ক্ষেত্রেই তারা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে দামের ওঠানামার প্রভাব তাদের ওপর বেশি পড়ে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, তেলের দাম যদি ১৪০ ডলারে উঠে স্থির থাকে, তাহলে দেশটির অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়; ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যও এই ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
এ প্রভাব মূল্যস্ফীতির মাধ্যমেও পড়তে পারে। সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতি স্থায়ী হলে বছরের শেষ দিকে মূল্যস্ফীতি প্রায় ০.৫ শতাংশ বাড়তে পারে, কারণ সার ও পরিবহন খরচসহ বিভিন্ন খাতে দাম বাড়ছে।
তবে ইতিবাচক দিক হলো, সময়ের সঙ্গে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর ফলে পশ্চিমা দেশগুলো অতীতের তুলনায় এখন জ্বালানির দামের ধাক্কা সামলাতে বেশি সক্ষম।
যুক্তরাজ্যে মোট জ্বালানি ব্যবহারের অর্ধেকের বেশি এখনও তেল ও গ্যাসনির্ভর। ফলে বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মতোই যানবাহন, গৃহস্থালি হিটিং এবং উৎপাদনশিল্পের মতো জ্বালানিনির্ভর খাতগুলো এখনও ঝুঁকিতে রয়েছে।
এই প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা শুধু দামের ভবিষ্যৎ গতিপথ নয়, বরং এসব দেশের সরকারের প্রতিক্রিয়ার ওপরও নির্ভর করছে—যা এখন বড় বিতর্কের বিষয়। অনেক দেশের সরকারই বড় আকারের প্রণোদনা বা সহায়তা প্যাকেজ দিতে অনিচ্ছুক, কারণ তাদের নিজেদের অর্থনীতিও চাপে রয়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় বন্ডবাজারের প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যেই ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর ব্যয় আরও বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করেছে।
প্রাথমিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এশিয়ার মোট অপরিশোধিত তেলের ৫৯ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, আর দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ৭০ শতাংশ।
সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ও খরচ বৃদ্ধির কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে পতন দেখা গেছে। পাশাপাশি দেশটির চিপ শিল্পের ওপরও ঝুঁকির কথা জানিয়েছেন নীতিনির্ধারকেরা। বিশ্বে ব্যবহৃত মেমোরি চিপের অর্ধেকের বেশি উৎপাদন করে দক্ষিণ কোরিয়া।
অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোতে জ্বালানি রেশনিং, চার দিনের কর্মসপ্তাহ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে পরিকল্পনা ও কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে এশিয়ার সবচেয়ে বড় জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশগুলো কিছুটা নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে। চীনের কাছে কয়েক মাসের চাহিদা মেটানোর মতো মজুত রয়েছে এবং দেশটি ইরান থেকে আমদানি বাড়িয়েছে বলে জানা গেছে।
ভারতও একই পথে এগোচ্ছে এবং রাশিয়া থেকে আমদানির সুযোগ নিচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ গতিপথের ওপর নির্ভর করবে। তবে ইরানের ওপর হামলার পরিকল্পনার সময় যুক্তরাষ্ট্র এই অর্থনৈতিক পরিণতিগুলো পুরোপুরি বিবেচনায় নিয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু বিভিন্ন দেশ নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ার ও সংকটের ঝুঁকি আরও বাড়বে।
