ট্রাম্পকে পাশ কাটাতে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা: হরমুজ দিয়ে যেভাবে তেল নিচ্ছে বিভিন্ন দেশ
হরমুজ প্রণালিতে দুই সপ্তাহের অস্থিরতা ও সহিংসতার পর, ট্র্যাকার চালু রেখে একটি আন্তর্জাতিক মালবাহী জাহাজ নিরাপদে এই ইরানি জলপথ অতিক্রম করেছে। বিশেষজ্ঞরা এটিকে একটি বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইরানের বাইরের প্রথম কোনো জাহাজ হিসেবে, পাকিস্তান-পতাকাবাহী জাহাজ 'করাচি', যা 'লরাক্স' নামেও পরিচিত, রবিবার বিকেলে নিজস্ব অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) সিগন্যাল চালু রেখে প্রণালিটি অতিক্রম করে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ ঘোষণা এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হত্যার কয়েকদিন পর, হরমুজ প্রণালির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে ইরান। এর ফলে উপসাগরে আটকা পড়েছে শত শত জাহাজ। ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অর্গানাইজেশন (ইউকেএমটিও)-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরে অন্তত ১৬টি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান শিপিং রুট হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখান দিয়ে প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেল তেল পারাপার হয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব দেশ আলোচনায় বসতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য তেহরান প্রণালিতে নিজেদের কঠোর অবস্থান শিথিল করতে পারে। কূটনীতির মাধ্যমে কিছু নির্দিষ্ট জাহাজকে নিরাপদে পারাপারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
গ্লোবাল ট্রেড ফার্ম কেপলারের মালবাহী পরিবহন বিশ্লেষক ম্যাথিউ রাইট 'দি ইন্ডিপেনডেন্ট'-কে বলেন, 'এটি ইরানের বিস্তৃতি বাড়ানোর কৌশল।'
'এই জলপথের ওপর ইরানের উল্লেখযোগ্য মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। গত দুই সপ্তাহে তারা নিজেদের কার্গোগুলো বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই সরাতে সক্ষম হয়েছে। এখন তারা এই চেকপয়েন্ট দিয়ে নির্বাচিতভাবে তেলের প্রবাহ পরিচালনা করছে। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, তারা বন্ধুভাবাপন্ন এশীয় অংশীদারদের সুযোগ দিচ্ছে', বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, 'তবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টি হলো, তেলের দামের ওপর তারা যে চাপ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে তা ক্ষুণ্ন না করে এই প্রবণতা তারা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করতে পারবে বলে আমরা মনে করি না।'
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ দিয়ে ভারতগামী জাহাজগুলোর নিরাপদ পারাপার নিয়ে আলোচনার পর, গত ফেব্রুয়ারিতে আটক করা তিনটি ট্যাঙ্কার ছেড়ে দিতে ভারতকে অনুরোধ করেছে ইরান।
পরিচয় গোপন বা পরিবর্তন এবং সমুদ্রে অবৈধভাবে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের অভিযোগে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের জলসীমার কাছাকাছি থেকে ইরান-সংশ্লিষ্ট ওই জাহাজগুলো আটক করেছিল।
এদিকে, ইরাকের তেলমন্ত্রী বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিছু তেলের ট্যাঙ্কার চলাচলের অনুমতি পেতে বাগদাদ ইরানের সাথে যোগাযোগ রাখছে। মঙ্গলবার দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এই তথ্য জানিয়েছে।
যেভাবে পার হয়েছে 'করাচি' তেলের ট্যাঙ্কার
ম্যাথিউ রাইটের মতে, আবুধাবি থেকে 'ডিএএস' নামক মিশ্র ক্রুড (অপরিশোধিত তেল) বহনকারী পাকিস্তান-পতাকাবাহী জাহাজ 'লরাক্স' প্রণালি পার হওয়ার সময় তাদের এআইএস চালু রেখেছিল।
তিনি বলেন, 'আমাদের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা নেই, তবে এটি ইঙ্গিত দেয় যে সম্ভবত এই জাহাজটিকে তাদের এআইএস চালু রাখতে বলা হয়েছিল এবং সম্ভবত ইরানই জাহাজটিকে প্রণালি পার হতে পথনির্দেশনা দিয়েছিল। এটি কেন ঘটল তা নিয়ে আমরা কেবল অনুমান করতে পারি, তবে সম্ভবত জাহাজটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এমনটি করা হয়ে থাকতে পারে।'
প্রণালি থেকে বের হওয়ার জন্য 'লরাক্স' একটি ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছিল। সাধারণত, ট্যাঙ্কারগুলোকে একটি হেয়ারপিন বাঁক (ইউ-টার্ন) অতিক্রম করতে বাধ্য করা হয়, কিন্তু জাহাজটি বের হওয়ার আগে ইরানি অংশের ছোট দ্বীপ লারাকের চারপাশ ঘুরে উত্তর দিক দিয়ে অগ্রসর হয়েছিল।
রাইট আরও জানান, এটি প্রণালি থেকে বের হওয়ার সবচেয়ে নিরাপদ পথ হিসেবে নির্দেশিত হতে পারে।
'কিছু জলসীমায় মাইন পাতা থাকার বিষয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে,' তিনি যোগ করেন। 'আমার জানামতে, প্রণালিতে মাইন পাতা হয়েছে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কারও কাছে নেই। তবে এই পারাপারটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক।'
কেপলারের তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ২০টি অ-ইরানি তেলের জাহাজ প্রণালি থেকে বেরিয়ে এসেছে। এসব জাহাজের বেশিরভাগই তাদের এআইএস বন্ধ রেখেছে, যা সমুদ্রে অন্য জাহাজের সাথে সংঘর্ষ এড়াতে এবং জাহাজের ওপর নজরদারি করতে ব্যবহৃত হয়।
রাইটের মতে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা অনেক জাহাজ যুদ্ধক্ষেত্রে না থাকলেও তাদের পরিচয় বা পণ্যের উৎস গোপন করতে নিষিদ্ধ কার্গো পরিচালনার সময় নিজেদের এআইএস বন্ধ করে 'অদৃশ্য' হয়ে যায়।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, 'অঞ্চলটি ছেড়ে যাওয়া অ-ইরানি কার্গোগুলোর ক্ষেত্রে আমরা যা দেখেছি—তারা প্রথমে অদৃশ্য হয়ে যায় এবং এরপর অন্য প্রান্তে আবার দৃশ্যমান হয়। ধারণা করা হয়, যে জাহাজ তাদের এআইএস সম্প্রচার করছে না, তাকে ট্র্যাক করা এবং সম্ভবত তার ওপর গুলি চালানো অনেক বেশি কঠিন।"
পারাপার হওয়া অনেক জাহাজই গ্রিক কোম্পানি ডাইনাকমের মতো 'ঝুঁকি-সহনশীল' কোম্পানি দ্বারা পরিচালিত।
রাইটের মতে, ডাইনাকমের মালিকানাধীন 'স্মির্নি' তেলের ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, 'কারণ এর রেট (ভাড়ার হার) অনেক, অনেক বেশি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তারা অন্তত একটি [পারাপার] সম্পন্ন করেছে, হয়তো আরও দুটি করেছে।'
গত সপ্তাহে তুরস্ক জানিয়েছে, একটি ড্রাই কার্গো (শুকনো মালবাহী) জাহাজ অনুমতি নিয়ে প্রণালি পার হয়েছে।
এই জাহাজগুলো কোথায় যাচ্ছে?
ম্যাথিউ রাইটের মতে, ইরানের তেলের বড় একটি অংশ চীনে যাবে, আর অ-ইরানি তেলের বেশিরভাগই ভারত ও পাকিস্তানে গেছে। তিনি বলেন, 'লরাক্স পাকিস্তানের, কিন্তু ডাইনাকম জাহাজে করে যাওয়া অন্য জাহাজগুলোর কয়েকটি ভারতে গেছে।'
তিনি যোগ করেন, 'ডাইনাকম জাহাজগুলো সৌদি বা সংযুক্ত আরব আমিরাতে পণ্য লোড করে ভারতে গেছে। নিষেধাজ্ঞামুক্ত সব তেলই ভারত ও পাকিস্তানে যাচ্ছে।'
কোন জাহাজগুলো আটকে আছে?
১৬ মার্চের হিসাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে উপসাগরে ৭৪৩টি মালবাহী জাহাজ আটকা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে রাইটের মতে, এই সংখ্যা ওঠানামা করেছে।
'এটি ৭৭৮ থেকে নিচে নেমেছে। ভেতরে প্রবেশের চেয়ে বেরিয়ে যাওয়া জাহাজের সংখ্যাই বেশি,' তিনি বলেন। 'এআইএস ব্ল্যাকআউটের কারণে বিষয়টি জানা বেশ কঠিন। তবে নিশ্চিতভাবেই বহির্গমন বেশি হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'কিছু জাহাজ ভেতরে প্রবেশ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ডাইনাকমের এই ছয়টি ট্যাঙ্কার ভেতরে এসেছে, যা মোট প্রবেশ করা ১২টি ট্যাঙ্কারের অর্ধেক।'
