ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দিচ্ছে সৌদি আরব, তুরস্ক, মিশরসহ আরও ৭ দেশ
এক যৌথ বিবৃতিতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরসহ সাতটি দেশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত 'বোর্ড অব পিস'-এ যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এর আগে ইসরায়েলও প্রকাশ্যে এই জোটে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল। খবর বিবিসির।
বুধবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প জানান, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও এতে যোগ দিতে সম্মত হয়েছেন। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তার দেশ এখনো আমন্ত্রণটি পর্যালোচনা করে দেখছে।
সুইজারল্যান্ডে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈঠকে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, পুতিন তার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, 'তাকে (পুতিন) আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। আরও অনেকেই এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন।'
তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুতিন দ্রুতই এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান জানান। তিনি বলেন, আমন্ত্রণটি এখনো বিবেচনাধীন। একই সঙ্গে তিনি জানান, রাশিয়া জব্দ করা সম্পদ থেকে ১০০ কোটি ডলার দিতে প্রস্তুত। পুতিন আরও বলেন, তিনি এই বোর্ডকে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের জন্য প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন।
ধারণা করা হয়েছিল, গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার প্রায় দুই বছরের সংঘাতের অবসান এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকার পুনর্গঠন তদারকির লক্ষ্যেই এই বোর্ড গঠন করা হচ্ছে। তবে প্রস্তাবিত সনদে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের কোনো উল্লেখ নেই। বরং এতে বোঝা যাচ্ছে, জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে কাজ করার উদ্দেশ্যেই সংস্থাটি গড়ে তোলা হয়েছে।
তবে সৌদি আরব জানিয়েছে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সাত দেশের এই জোট—সৌদি আরব, তুরস্ক, মিশর, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও কাতার—গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, পুনর্গঠন এবং 'ন্যায়ভিত্তিক ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি' প্রতিষ্ঠার পক্ষে রয়েছে।
ট্রাম্পের এই নতুন জোটে মোট কতটি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কানাডা ও যুক্তরাজ্য আমন্ত্রণ পেলেও, এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, আলবেনিয়া, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, হাঙ্গেরি, কাজাখস্তান, মরক্কো ও ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে এতে যোগ দিয়েছে।
বুধবার ভ্যাটিকানও নিশ্চিত করেছে, পোপ লিও এই বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণপত্র পেয়েছেন। ভ্যাটিকানের সেক্রেটারি অব স্টেট কার্ডিনাল পিয়েত্রো প্যারোলিন সাংবাদিকদের বলেন, এতে অংশ নেবেন কি না—সে সিদ্ধান্ত নিতে পোপের কিছু সময় প্রয়োজন।
তবে স্লোভেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট গোলব জানিয়েছেন, তিনি এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, এই সংস্থাটি 'আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থায় বিপজ্জনকভাবে হস্তক্ষেপ করছে।'
ফাঁস হওয়া এক নথিতে দেখা গেছে, মাত্র তিনটি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মত হলেই 'বোর্ড অব পিস'-এর সনদ কার্যকর হবে। সদস্য দেশগুলোর মেয়াদ হবে তিন বছর, যা নবায়নযোগ্য। পাশাপাশি যেসব দেশ ১ বিলিয়ন ডলার অনুদান দেবে, তাদের জন্য বোর্ডে স্থায়ী আসনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সনদে এই সংস্থাকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ডোনাল্ড ট্রাম্প চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করবেন। নির্বাহী বোর্ডের সদস্য নিয়োগ, পাশাপাশি উপ-কমিটি গঠন বা বিলুপ্ত করার ক্ষমতাও তার হাতে থাকবে।
গত শুক্রবার হোয়াইট হাউস প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী বোর্ডের সাত সদস্যের নাম ঘোষণা করে। এদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার।
পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপের জন্য জাতিসংঘের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত নিকোলাই ম্লাদেনভকে গাজায় বোর্ডের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই ধাপে পুনর্গঠন ও নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বোর্ডটি ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত থাকবে।
শনিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানায়, পিস বোর্ডের গঠন নিয়ে 'ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো সমন্বয় করা হয়নি এবং এটি তাদের নীতির পরিপন্থী'। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের দাবি, তুরস্ক ও কাতারের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত ইসরায়েলকে পাশ কাটিয়েই নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, তুরস্ক ও কাতার গত অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতিতে মিশর ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল।
শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে হামাস ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এর আওতায় গাজায় থাকা জীবিত ও মৃত ইসরায়েলি জিম্মিদের বিনিময়ে ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনিদের মুক্তি, ইসরায়েলি বাহিনীর আংশিক প্রত্যাহার এবং মানবিক সহায়তা বাড়ানোর কথা রয়েছে।
ইসরায়েল জানিয়েছে, হামাস শেষ মৃত জিম্মির মরদেহ হস্তান্তর করলেই কেবল তারা দ্বিতীয় ধাপে অগ্রসর হবে।
তবে দ্বিতীয় ধাপটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়া অস্ত্র সমর্পণে হামাস আগেই অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অন্যদিকে, গাজা থেকে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে ইসরায়েল কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
এদিকে যুদ্ধবিরতিও অত্যন্ত নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৪৬০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের হামলায় তিন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের হামলার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা হয়। ওই হামলায় প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৫৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
