পুরোনো পথেই ফিরল যুক্তরাষ্ট্র: লাতিন আমেরিকায় হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতায় আটক মাদুরো
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটককে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ভাবলে ভুল হবে। গত এক শতাব্দী ধরে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্র যেসব হস্তক্ষেপ বা সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ঘটিয়েছে, এটি তারই সর্বশেষ উদাহরণ।
উনিশ শতকে 'মনরো ডকট্রিন' বা মনরো নীতি গ্রহণের মধ্য দিয়ে পুরো পশ্চিম গোলার্ধকে নিজেদের 'আঙিনা' হিসেবে ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এই নীতির দোহাই দিয়ে শুধু বিশ শতকেই লাতিন আমেরিকায় বহুবার অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে ও সরকার উৎখাত করেছে তারা।
এর মধ্যে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন ও দখলের ঘটনাও রয়েছে। বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের এমন তৎপরতা ছিল সবচেয়ে বেশি।
শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, মাদুরোকে আটকের এই অভিযান ছিল 'অত্যন্ত সুপরিকল্পিত'। কয়েক দশকের অভিযানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই এই পরিকল্পনা সাজানো হয়েছিল।
ভবিষ্যতেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে কি না, এমন ইঙ্গিত দিয়ে জেনারেল কেইন বলেন, 'আমাদের আবারও এ ধরনের অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। সেই সম্ভাবনা সব সময়ই রয়েছে।'
লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সফল যত নজির
লাতিন আমেরিকার ইতিহাস বদলে দিতে যুক্তরাষ্ট্র অতীতে কীভাবে হস্তক্ষেপ করেছে, তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এখানে তুলে ধরা হলো, যেখানে সফলভাবে সরকার পরিবর্তন বা 'রেজিম চেঞ্জ' করতে সক্ষম হয়েছিল ওয়াশিংটন।
গুয়াতেমালা, ১৯৫৪
১৯৫৪ সালের জুন মাস। গুয়াতেমালার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জাকোবো আরবেনজকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এর নেপথ্যে ছিল ওয়াশিংটনের অর্থ ও প্রশিক্ষণে গড়ে ওঠা একদল ভাড়াটে সেনা। স্নায়ুযুদ্ধের সময় লাতিন আমেরিকায় এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সরকার পতনের ঘটনা।
প্রেসিডেন্ট আরবেনজের 'অপরাধ' ছিল, তিনি দেশে ভূমি সংস্কার করতে চেয়েছিলেন। আর এতে মার্কিন কোম্পানি 'ইউনাইটেড ফ্রুট করপোরেশন'-এর ব্যবসায়িক স্বার্থে আঘাত লাগত।
২০০০ সালের দিকে কিছু গোপন নথি প্রকাশ করে সিআইএ স্বীকার করে যে তারাই ওই অভ্যুত্থানে কলকাঠি নেড়েছিল। ভবিষ্যৎ হস্তক্ষেপের 'মডেল' হিসেবে তারা সেখানে মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও রাজনৈতিক কারসাজির কৌশল ব্যবহার করেছিল।
ডমিনিকান রিপাবলিক, ১৯৬৫
এক দশক যেতে না যেতেই ক্যারিবিয়ান দেশটিতে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন চালায় ওয়াশিংটন। অজুহাত সেই পুরোনো—'কমিউনিস্ট হুমকি'। ডমিনিকান রিপাবলিকের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হুয়ান বশকে এর আগেই সামরিক জান্তা উৎখাত করেছিল। বশের সমর্থকেরা যাতে আবার ক্ষমতায় ফিরতে না পারেন, সে জন্য 'অপারেশন পাওয়ার প্যাক'-এর নামে ২০ হাজার সেনা পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র।
পরে ১৯৬৬ সালের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ ওঠে এবং সেই নির্বাচনে জিতে যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দসই প্রার্থী ক্ষমতায় আসেন। যুক্তরাষ্ট্রের ওই দখলের ফলে দেশটিতে দমন-পীড়ন বাড়ে এবং লাতিন আমেরিকায় ওয়াশিংটনের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস আরও তীব্র হয়।
চিলি, ১৯৭৩
গণতন্ত্রের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অশ্রদ্ধার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে চিলির ঘটনাকেই ধরা হয়। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মদদে এক অভ্যুত্থানে উৎখাত করা হয় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে।
আলেন্দে যাতে প্রেসিডেন্ট হতে না পারেন, সে জন্য ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকেই গোপনে প্রচার চালাচ্ছিল সিআইএ। এমনকি ১৯৭০ সালে তিনি নির্বাচিত হওয়ার পরও তাকে হটাতে ৮০ লাখ ডলার খরচ করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে চিলির সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে অভ্যুত্থানের পথ তৈরি করা হয়।
ওই অভ্যুত্থানের পর জেনারেল অগাস্তো পিনোশের নেতৃত্বে চিলিতে ১৭ বছরের দীর্ঘ একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরশাসন চলে। ওই সময়ে হাজার হাজার মানুষকে রাজনৈতিক কারণে জেলে ভরা হয়, চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন।
ভেস্তে যাওয়া যত পরিকল্পনা
যুক্তরাষ্ট্রের সব ছক যে সব সময় কাজে লেগেছে, তা কিন্তু নয়। লাতিন আমেরিকায় তাদের বেশ কিছু অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা চরমভাবে ব্যর্থও হয়েছে।
কিউবা, ১৯৬১: বে অব পিগস বিপর্যয়
১৯৬১ সালের এপ্রিল। ফিদেল কাস্ত্রোর সরকারকে উৎখাত করতে কিউবার দক্ষিণ উপকূলে হামলা চালায় একদল নির্বাসিত কিউবান। এদের পেছনে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন ও অর্থায়ন। এর মাত্র দুই বছর আগে, ১৯৫৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট একনায়ক ফুলহেনসিও বাতিস্তাকে সরিয়ে বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিলেন কাস্ত্রো।
ইতিহাসের পাতায় এই ঘটনা 'বে অব পিগস' আক্রমণ নামে পরিচিত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেই চেষ্টা চরমভাবে ব্যর্থ হয়। কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবার সেনাবাহিনী মাত্র দুই দিনের মধ্যে মার্কিন মদদপুষ্ট ১ হাজার ৫০০ যোদ্ধাকে পরাস্ত করে।
এই ব্যর্থ অভিযানের ফলে কিউবা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে, যা ১৯৬২ সালের 'কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস'-এর পটভূমি তৈরি করেছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখানেই থামেনি। এরপর কাস্ত্রো সরকারকে দুর্বল করতে 'অপারেশন মঙ্গুজ' শুরু করে তারা, যার আওতায় কিউবার বেসামরিক স্থাপনায় হামলা ও নানা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালানো হতো।
নিকারাগুয়া, ১৯৭৯: কন্ট্রা বিদ্রোহ ও গৃহযুদ্ধ
১৯৭৯ সালে নিকারাগুয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট একনায়ক আনাস্তাসিও সোমোজাকে উৎখাত করে ক্ষমতায় আসেন মার্ক্সবাদী নেতা ড্যানিয়েল ওর্তেগা। কিন্তু ওয়াশিংটন এটা মেনে নেয়নি। ওর্তেগাকে হটাতে 'কন্ট্রা' নামের বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে গোপনে ২ কোটি ডলার সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান।
মজার বিষয় হলো, কন্ট্রাদের এই অর্থ জোগাতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের নিষেধাজ্ঞা ভেঙেই গোপনে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করেছিল। যা পরে 'ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি' নামে পরিচিতি পায়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই হস্তক্ষেপের ফলে নিকারাগুয়ায় এক দশক ধরে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ চলে, যাতে প্রাণ হারান প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। এত কিছুর পরও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সফল হয়নি, ওর্তেগা ক্ষমতায় টিকে যান। যদিও মাঝখানে তিনি নির্বাচনে হেরেছিলেন, তবে এক দশক পর আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন এবং ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত তিনিই দেশটির প্রেসিডেন্ট।
