ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র যা করেছে, তা অন্য দেশকেও আগ্রাসনে উৎসাহিত করতে পারে: বিশেষজ্ঞ
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের 'নতুন সাম্রাজ্যবাদী যুগের' অংশ। আন্তর্জাতিক আইন তো বটেই, খোদ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক শিষ্টাচারও এতে লঙ্ঘিত হয়েছে। এমনটাই মনে করেন কাতারের হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসি বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক সুলতান বারাকাত।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই বিশ্লেষক বলেন, তেল ও কৌশলগত স্বার্থ হাসিলের জন্যই যুক্তরাষ্ট্র এমন আগ্রাসী পথে হাঁটছে। তার আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ বিশ্বের অন্যান্য ক্ষমতাধর দেশকেও ভবিষ্যতে একই ধরনের কাজে উৎসাহিত করতে পারে, যা বিশ্বব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
গেল শনিবার ভেনেজুয়েলায় বোমা হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণ করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। ওয়াশিংটনের দাবি, মাদক পাচারের অভিযোগে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
তবে অধ্যাপক বারাকাত মনে করেন, আইনি প্রক্রিয়ার অজুহাত কেবল লোক দেখানো, আসল উদ্দেশ্য ভিন্ন। তিনি বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইন ও ভেনেজুয়েলার আইন—কোনোটিই তোয়াক্কা করছেন না। ভেনেজুয়েলার জনগণ আসলে কী চায় বা কী ভাবে, তা নিয়েও ট্রাম্পের কোনো মাথাব্যথা নেই।'
ট্রাম্প সরাসরিই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ভেনেজুয়েলা 'চালাবে' এবং দেশটির তেলসম্পদ ব্যবহার করবে। সুলতান বারাকাত বলেন, ট্রাম্পের এই বক্তব্যেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে অভিযানের মূল লক্ষ্য আসলে দেশটির তেলসম্পদ দখল করা।
এই বিশ্লেষক আরও বলেন, ট্রাম্পের জমানায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সেখানে উগ্র জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এবং শাসনব্যবস্থায় ধর্ম গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। এসব প্রবণতা বিদ্যমান আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক আইন কী বলছে?
সুলতান বারাকাত বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ যে অবৈধ, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনে কোনো অস্পষ্টতা নেই। জাতিসংঘের সনদের সপ্তম অধ্যায়ের আওতায় নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতাকে ক্ষমতাচ্যুত বা আটক করতে পারে না।
লিবিয়ার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার অভিযানে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছিল। তবে, সেই অনুমোদনের উদ্দেশ্যও সরকার পরিবর্তন ছিল না; ছিল গণহত্যা রোধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা।
ইরাক অভিযানের প্রসঙ্গও টানেন বারাকাত। তিনি বলেন, সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে—এমন 'ভিত্তিহীন' অভিযোগে ইরাকে হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট। তখনো জাতিসংঘের প্রাথমিক অনুমোদন ছিল না।
তবে ভেনেজুয়েলার ঘটনার সঙ্গে ইরাকের বড় পার্থক্য হলো, সাদ্দাম হোসেনকে আটকের পর যুক্তরাষ্ট্র তাকে তুলে নিয়ে যায়নি; ইরাকের মাটিতেই তার বিচার হয়েছিল।
বারাকাত বলেন, নাইন-ইলেভেনের হামলার পর সন্ত্রাসী হামলা ঠেকাতে আন্তর্জাতিক আইনে আন্তসীমান্ত অভিযানের কিছুটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই সুযোগটিই কাজে লাগাতে চাইছে।
নববর্ষের প্রাক্কালে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকে মাদুরোকে ইরান, হিজবুল্লাহ বা ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় ফেলা। বারাকাত একে অভিযানের বৈধতা আদায়ের 'দুর্বল চেষ্টা' বলে অভিহিত করেছেন।
কোন আইনে এই অভিযান?
অধ্যাপক বারাকাত বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া সেই দেশের ভূখণ্ডে সামরিক অভিযান চালানো সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সিরিয়া সংঘাতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে আইএসের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় বাশার আল-আসাদ সরকারের সম্মতি নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। তারা ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতে মাদুরোর বিরুদ্ধে করা মাদক পাচারের অভিযোগকে এই অভিযানের 'আইনি খুঁটি' হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আদালতের অভিযোগপত্র দিয়ে অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে তার দেশ থেকে অপহরণ করাটা সমস্যাজনক বলে মনে করেন বারাকাত। তিনি বলেন, সাধারণত অভিযুক্ত ব্যক্তি যে দেশে অবস্থান করেন, সেই দেশই তাকে আটক করে। অথবা ইন্টারপোল ও আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এভাবে সরাসরি গিয়ে তুলে আনা যায় না।
ট্রাম্পের দ্বিমুখী আচরণের কথাও তুলে ধরেন এই বিশ্লেষক। তিনি বলেন, ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করেন না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও ট্রাম্প তাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। অথচ সেই ট্রাম্পই এখন মাদুরোর বিরুদ্ধে আইসিসির প্রক্রিয়াকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছেন।
সোমবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মাদুরোকে অপহরণের বৈধতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সেখানে ওয়াশিংটন খুব একটা চাপের মুখে পড়বে না। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা এমনিতেই মাদুরোবিরোধী। রাশিয়া, চীন ও ভেনেজুয়েলার অন্য মিত্ররা একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বললেও ইউরোপীয় দেশগুলো অনেকটা কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক আইন মানার আহ্বান জানালেও সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করে কোনো সমালোচনা করেনি।
আন্তর্জাতিক রীতির সীমা লঙ্ঘন
ভেনেজুয়েলার এই অভিযানের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রেক্ষাপটে। কারণ, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ভিনদেশ থেকে মানুষ অপহরণ করে এনে নিজেদের দেশে বিচার করে আসছে (যেমন আর্জেন্টিনায় নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রে)।
অধ্যাপক বারাকাত মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আসলে একে অপরের কাছ থেকে 'শিক্ষা' নিচ্ছে। এক দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি অন্য দেশকে একই ধরনের আগ্রাসী কাজে উৎসাহিত করছে।
তিনি বলেন, গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার সময় নেতানিয়াহু ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অভিযানকে উদাহরণ হিসেবে টেনেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সন্ত্রাসীদের দমনে পশ্চিমা বিশ্ব যা করেছে, ইসরায়েলও তাই করছে। বারাকাতের ধারণা, 'এখন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ভেনেজুয়েলায় তাদের কাজের সাফাই গাইতে ইসরায়েলের সেই পুরোনো নজিরকেই ব্যবহার করবে।'
যুক্তরাষ্ট্রের এই যুক্তিতে অন্য দেশগুলোও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে ইসরায়েলি নেতাদের আটক করার চেষ্টা করতে পারে।
তবে বারাকাত বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) অনেক সদস্যরাষ্ট্র নিজ ভূখণ্ডে পেলে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের কথা বলেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মতো সীমান্ত পেরিয়ে গিয়ে অন্য দেশ থেকে কাউকে তুলে আনার 'সাহস' তাদের নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ভেনেজুয়েলা অভিযান রাশিয়া ও চীনকে একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন এই বিশ্লেষক। তিনি বলেন, 'আমি যদি পুতিন হতাম, তবে এখন নিশ্চয়ই ভাবতাম—জেলেনস্কিকে কীভাবে ধরে আনা যায়?' একইভাবে চীনও তাইওয়ানের ক্ষেত্রে এমন আগ্রাসী চিন্তাভাবনা করতে পারে।
বারাকাত জোর দিয়ে বলেন, ভেনেজুয়েলার ঘটনা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। চীন যদি এখন অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রথাগত পথ ছেড়ে সামরিক পথে হাঁটে অথবা আরও বেশি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে বিশ্ব এক নতুন ও সংঘাতময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে।
'পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, স্বাধীন রাজনীতি করার একমাত্র উপায় হলো পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হওয়া। হাতে পারমাণবিক বোমা থাকলে দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলে যায়,' বলেন তিনি।
