আর্কটিক দখলের রেস: কেন রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সবার নজর এই অঞ্চলে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার দাবিতে অনড় অবস্থান নেওয়ায়, আর্কটিক অঞ্চল ঘিরে বিতর্ক দিন দিন আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য মিত্র ডেনমার্কের অধীন একটি ভূখণ্ড দখলের এমন দাবি বিশ্বকে বিস্মিত করলেও, বাস্তবতা হলো—আর্কটিক দখলের প্রতিযোগিতা বহু দশক ধরেই চলমান।
আর দীর্ঘসময় ধরেই এই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে রাশিয়া। আর্কটিক অঞ্চলে মস্কোর আধিপত্য বিস্তার নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই।
আর্কটিক সার্কেলের উত্তরে অবস্থিত স্থলভাগের প্রায় অর্ধেক এবং সামুদ্রিক একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) প্রায় অর্ধেকই রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। পুরো আর্কটিক অঞ্চলের বাসিন্দাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই বসবাস করেন রাশিয়ায়।
আর্কটিক কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আর্কটিক অঞ্চলের অবদান তুলনামূলকভাবে সামান্য—মাত্র ০.৪ শতাংশ। তবুও এই অঞ্চলের মোট জিডিপির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করে রাশিয়া।
আর্কটিকে রাশিয়ার সামরিক শক্তি
দশকের পর দশক ধরে আর্কটিক অঞ্চলে নিজের সামরিক উপস্থিতি সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে রাশিয়া, নতুন ও পুরোনো সামরিক স্থাপনায় বিপুল বিনিয়োগ করছে।
কানাডাভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা সিমন্স ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, বিস্তৃত আর্কটিক অঞ্চলে বর্তমানে ৬৬টি সামরিক ঘাঁটি এবং আরও শত শত প্রতিরক্ষা স্থাপনা ও চৌকি রয়েছে। সিমন্স ফাউন্ডেশন আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ে নজর রাখে।
আর্কটিকে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে রাশিয়া ও ন্যাটো
সিমন্স ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, আর্কটিক অঞ্চলে বর্তমানে ৬০টির বেশি বড় সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং এর বাইরেও রয়েছে অসংখ্য প্রতিরক্ষা স্থাপনা। এর মধ্যে অন্তত ৩০টি আর্কটিক সামরিক স্থাপনা রাশিয়ার, যেখানে দেশটি তার পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন বহরে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে—যা আর্কটিকে রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতার মেরুদণ্ড।
সার্বজনিকভাবে পাওয়া তথ্য ও সিমন্স ফাউন্ডেশনের গবেষণা অনুযায়ী, মোট ৬৬টি বড় ঘাঁটির মধ্যে ৩০টি রাশিয়ায় এবং বাকি ৩৬টি ন্যাটোভুক্ত আর্কটিক দেশগুলোতে অবস্থিত। এর মধ্যে নরওয়েতে ১৫টি (এর মধ্যে একটি ব্রিটিশ ঘাঁটি), যুক্তরাষ্ট্রে ৮টি, কানাডায় ৯টি, গ্রিনল্যান্ডে ৩টি এবং আইসল্যান্ডে ১টি ঘাঁটি রয়েছে।
সব ঘাঁটির সক্ষমতা একরকম নয়—বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়া ন্যাটোর সামরিক সক্ষমতার সমকক্ষ নয়। তবে রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতির ব্যাপ্তি এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেভাবে দ্রুত তা সম্প্রসারিত হয়েছে, তা বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ।
একসময় ছিল সহযোগিতার ক্ষেত্র
এই চিত্র সব সময় এতটা উত্তেজনাপূর্ণ ছিল না। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর দীর্ঘ সময় ধরে আর্কটিক বা উত্তর মেরু অঞ্চলকে এমন একটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হতো, যেখানে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতায় এগোতে পারে।
১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত আর্কটিক কাউন্সিলের লক্ষ্য ছিল রাশিয়াকে বাকি সাতটি আর্কটিক দেশের কাছাকাছি আনা এবং জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও আদিবাসীদের অধিকার সুরক্ষার মতো বিষয়ে সহযোগিতা জোরদার করা।
এক পর্যায়ে নিরাপত্তা সহযোগিতারও চেষ্টা হয়েছিল। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া অবৈধভাবে দখলের আগে পর্যন্ত রাশিয়া আর্কটিক চিফস অব ডিফেন্স ফোরামের দুটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিয়েছিল।
তবে ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর—পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মস্কোর সম্পর্ক স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে এবং অধিকাংশ সহযোগিতা স্থগিত হয়ে যায়।
২০২৩ ও ২০২৪ সালে ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের ন্যাটোতে যোগদানের ফলে আর্কটিক অঞ্চল কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে—একটি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে এবং অন্যটি ন্যাটোর অধীনে।
গ্রিনল্যান্ড ও ট্রাম্পের নিরাপত্তা যুক্তি
ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড "প্রয়োজন"। তার দাবি, আর্কটিকে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান উচ্চাকাঙ্ক্ষার মুখে ডেনমার্ক এই বিশাল দ্বীপটিকে যথাযথভাবে রক্ষা করতে পারবে না।
বরফ গলছে, খুলছে নতুন নৌপথ
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আর্কটিকের যেসব নৌপথ বছরের বেশিরভাগ সময় বরফে ঢাকা থাকত, সেগুলো এখন ক্রমশ উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। নর্দার্ন সি রুট ব্যবহার করলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে যাত্রা সময় কমে প্রায় দুই সপ্তাহে নেমে আসে, যা সুয়েজ খাল দিয়ে যাত্রার প্রায় অর্ধেক।
আর্কটিক দেশ না হলেও চীন এই অঞ্চলে তার আগ্রহ গোপন করেনি। ২০১৮ সালে দেশটি নিজেকে "নিয়ার-আর্কটিক স্টেট" ঘোষণা করে এবং আর্কটিক নৌপরিবহনকে কেন্দ্র করে "পোলার সিল্ক রোড" উদ্যোগের রূপরেখা দেয়।
২০২৪ সালে চীন ও রাশিয়া আর্কটিকে যৌথ টহল কার্যক্রম শুরু করে, যা দুই দেশের বিস্তৃত সহযোগিতার অংশ।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বনাম পরিবেশগত ঝুঁকি
আর্কটিকের প্রতি আগ্রহ বাড়ার পেছনে নিরাপত্তাই একমাত্র কারণ নয়। জলবায়ু সংকটের কারণে এই অঞ্চল বিশ্বের অন্য যেকোনো এলাকার তুলনায় প্রায় চার গুণ দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে।
সমুদ্রের বরফ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও এখানকার মানুষের জীবিকা ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে। তবে অনেকের মতে, বরফ গলার ফলে খনি কার্যক্রম ও নৌপরিবহনে বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বারও খুলে যেতে পারে।
মাত্র দুই দশক আগেও প্রায় অচল দুটি নৌপথ এখন উন্মুক্ত হতে শুরু করেছে। যদিও গবেষক ও পরিবেশবাদীরা সতর্ক করেছেন, এই নির্মল ও দুর্গম অঞ্চলে বড় জাহাজ বহর পাঠানো পরিবেশ ও মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে থাকা নর্দার্ন সি রুট এবং উত্তর আমেরিকার উত্তর উপকূলের নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ—দুটিই ২০০০ দশকের শেষ দিক থেকে গ্রীষ্মের চূড়ান্ত সময়ে প্রায় বরফমুক্ত থাকছে।
সোভিয়েত আমলে রাশিয়া সীমিতভাবে নর্দার্ন সি রুট ব্যবহার করলেও— নৌ চলাচলে কঠিন চ্যালেঞ্জের কারণে এটি আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের জন্য দীর্ঘকাল উপেক্ষিত ছিল।
২০১০-এর দশকের শুরুতে বরফ গলতে শুরু করলে পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন বছরে হাতে গোনা কয়েকটি জাহাজের যাত্রা থেকে সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১০০-তে পৌঁছায়।
২০২২ সালের পর ইউরোপীয় বাজার হারানোর পর রাশিয়া চীনে তেল ও গ্যাস পরিবহনে এই রুটের ব্যবহার আরও বাড়িয়েছে।
একইভাবে নর্থওয়েস্ট প্যাসেজও ক্রমশ কার্যকর হয়ে উঠছে। ২০০০-এর দশকের শুরুতে বছরে মাত্র এক-দুটি জাহাজ যাত্রা হলেও, ২০২৩ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১-এ।
ভবিষ্যতে উত্তর মেরু বরাবর একটি কেন্দ্রীয় নৌপথও চালু হতে পারে। তবে এর জন্য যে মাত্রায় বরফ গলতে হবে, তা বৈশ্বিক উষ্ণতা আরও ত্বরান্বিত করবে, চরম আবহাওয়া বাড়াবে এবং এই অঞ্চলের অমূল্য বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের ঝুঁকি তৈরি করবে।
গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ ও বাস্তবতা
বরফ গলে গেলে আগে যেসব ভূমি কাজে লাগানো অসম্ভব ছিল, সেগুলো উন্মুক্ত হতে পারে। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার মতে, গ্রিনল্যান্ডে কয়লা, তামা, সোনা, বিরল খনিজ ও দস্তার বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে গবেষকরা বলছেন, এসব খনিজ উত্তোলন অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল হবে। কারণ, অধিকাংশ খনিজ ক্ষেত্র আর্কটিক সার্কেলের ওপরে দুর্গম এলাকায়, যেখানে এক মাইল-পুরু বরফস্তর রয়েছে এবং বছরের বড় অংশজুড়ে অন্ধকার বিরাজ করে।
আর্কটিক ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ও সিনিয়র ফেলো মাল্টে হুমপার্ট সিএনএনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সহজেই এসব সম্পদ উত্তোলন করতে পারবে—এই ধারণা "সম্পূর্ণ পাগলামি"।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দিলেও, তার সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজ ২০২৪ সালে ফক্স নিউজকে বলেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বর্তমান প্রশাসনের আগ্রহ মূলত "গুরুত্বপূর্ণ খনিজ" ও "প্রাকৃতিক সম্পদ" ঘিরেই।
