১৯৯৬ সালে দুটি বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের যুক্তরাষ্ট্রের
১৯৯৬ সালে কিউবা ও ফ্লোরিডার মধ্যবর্তী আকাশসীমায় দুটি বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় কিউবার সাবেক নেতা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিকদের হত্যা করার ষড়যন্ত্রসহ বেশ কয়েকটি অপরাধের অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বুধবার এই মামলার ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে কিউবান-আমেরিকান সংগঠন 'ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ'-এর বিমান ভূপাতিত করা এবং তিন আমেরিকানসহ চারজনকে হত্যার দায়ে কাস্ত্রো ও আরও পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
৯৪ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রো ওই সময় কিউবার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ছিলেন এবং বিমান ভূপাতিত করার ওই ঘটনার পর তিনি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক নিন্দার মুখে পড়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র যখন কিউবার কমিউনিস্ট শাসনের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই এই মামলা হলো। কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল এই অভিযোগকে 'আইনি ভিত্তিহীন একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত' বলে আখ্যা দিয়েছেন।
মিয়ামির ফ্রিডম টাওয়ারে দেওয়া এক বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ ঘোষণা করেন যে বিমান ধ্বংসের পাশাপাশি আরমান্দো আলেহান্দ্রে জুনিয়র, কার্লোস আলবার্তো কস্তা, মারিও ম্যানুয়েল দে লা পেনা এবং পাবলো মোরালেসের মৃত্যুর ঘটনায় কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যার চারটি পৃথক অভিযোগ আনা হবে।
ব্লাঞ্চ বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নাগরিকদের কখনো ভোলে না, আর ভবিষ্যতেও ভুলবে না।'
যুক্তরাষ্ট্রের আদালতেই এই অভিযোগগুলোর ওপর যুক্তি-তর্ক হবে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও হতে পারে। খুনের প্রতিটি অভিযোগের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে কিউবার ওপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা এবং তেল সরবরাহে অবরোধ আরোপ করেছে। এর ফলে দেশটিতে ব্যাপক ব্ল্যাকআউট (বিদ্যুৎ–বিপর্যয়) এবং খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটির লাতিন আমেরিকান রাজনীতি বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম লিওগ্র্যান্ড বলেন, 'আমার মনে হয়, আমেরিকার কৌশল হলো ধীরে ধীরে চাপ বাড়ানো, যাতে কিউবা সরকার একপর্যায়ে হার মেনে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হয়।'
কিউবার জনগণের প্রতি রুবিওর বার্তা
বুধবার কিউবার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দেশটির জনগণের উদ্দেশে একটি বার্তা দেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র ও একটি পরিবর্তিত কিউবার মধ্যে এক নতুন সম্পর্কের প্রস্তাব দিচ্ছেন।'
রুবিও দেশটির নাগরিকদের বলেন, কিউবার সামরিক বাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত 'গ্যাসা' নামের একটি করপোরেশনই মূলত তাদের ব্ল্যাকআউট ও খাদ্যসংকটের জন্য দায়ী। বন্দর থেকে শুরু করে পেট্রলপাম্প এবং পাঁচতারা হোটেল—কিউবার অর্থনীতির সবচেয়ে লাভজনক খাতগুলো মূলত এই গ্যাসা-র মালিকানাধীন বা তাদের দ্বারা পরিচালিত।
অন্যদিকে কিউবার প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-ক্যানেল যুক্তরাষ্ট্রকে মিথ্যাবাদী এবং কিউবার জনগণের ওপর 'সামষ্টিক শাস্তি' চাপিয়ে দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেন।
তিনি আরও বলেন, বিমান ভূপাতিত করার ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তথ্য বিকৃত করছে। তার দাবি, ওই ঘটনায় কিউবা নিজেদের জলসীমার মধ্যে বৈধ আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছিল।
কাস্ত্রোকে কি ধরে আনবে যুক্তরাষ্ট্র?
কাস্ত্রোকে কি বিচারের মুখোমুখি করতে যুক্তরাষ্ট্রে আনা হতে পারে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ব্লাঞ্চ বলেন, কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র কাস্ত্রোকে ধরে আনার চেষ্টা করবে কি না, তা তিনি নিশ্চিত করেননি। তিনি বলেন, 'আমরা আশা করছি যে, তিনি নিজের ইচ্ছায় হোক বা অন্য কোনো উপায়ে হোক, এখানে উপস্থিত হবেন।'
বিশেষজ্ঞ লিওগ্র্যান্ড মনে করেন, কিউবানরা যদি আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি না হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র কাস্ত্রোকে ধরে আনতে পারে।
বিচার বিভাগ নিকোলাস মাদুরোকে অভিযুক্ত করার পর গত জানুয়ারি মাসে মার্কিন সামরিক বাহিনী এক অভিযান চালিয়ে ভেনিজুয়েলার এই সাবেক প্রেসিডেন্টকে যুক্তরাষ্ট্রে ধরে নিয়ে আসে।
এই ঘটনাটি ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভেনিজুয়েলার সম্পর্ককে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। তবে লিওগ্র্যান্ড সতর্ক করে বলেছেন, কিউবার ক্ষেত্রে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ কাস্ত্রো প্রায় এক দশক আগেই রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন।
অবশ্য ব্লাঞ্চ জানিয়েছেন, তিনি কাস্ত্রো এবং মাদুরোর মামলার মধ্যে 'কোনো তুলনা করবেন না'।
৯৪ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রো, যিনি প্রয়াত কিউবান নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর ভাই, এখনো দেশটিতে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তাকে কিউবান বিপ্লবের একজন নেতা হিসেবে এখনো সম্মান করা হয়।
বুধবারের এই মামলার রাজনৈতিক দিক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, 'কিউবান-আমেরিকানদের সঙ্গে আমার খুবই ভালো সম্পর্ক। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা তাদের সাহায্য করতে চাই।'
মিয়ামিতে মার্কিন অ্যাটর্নি অফিসে প্রসিকিউটর হিসেবে কাজ করা আইনজীবী লিন্ডসে লাজোপলোস ফ্রিডম্যান বিবিসিকে বলেন, 'যদি কাস্ত্রো এই মামলায় উপস্থিত হন, তবে অন্য যেকোনো আসামির মতো তাকেও সমান আইনি অধিকার দেওয়া হবে, যার মধ্যে জুরি ট্রায়াল অন্তর্ভুক্ত থাকবে।'
ফ্রিডম্যান আরও বলেন, 'কেউই আশা করছে না যে এই মামলাটি সাধারণ কোনো পথে এগোবে... তবে অভিযোগটি অত্যন্ত জোরালো এবং এর পেছনে উল্লেখযোগ্য প্রমাণও রয়েছে।'
বিনা যুদ্ধে হার মানবে না কিউবা
মিয়ামির যে সেন্টারে মার্কিন কর্মকর্তারা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মামলার কথা ঘোষণা করেন, সেটি কিউবান-আমেরিকানদের দিয়ে পূর্ণ ছিল। এদের বেশির ভাগই কিউবার প্রবাসী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি, যারা কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকে কিউবা সরকারের বিরোধিতা করে আসছে।
ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই জানান, তারা এই খবরে অত্যন্ত আনন্দিত। ইসেলা ফিতেরে নামের এক নারী বলেন, '৬৭ বছর ধরে চলা এই খুনি রেজিমের বিচারের সময় এসেছে। রাউল কাস্ত্রো শুধু চারজন ব্যক্তিকেই হত্যা করেননি, বছরের পর বছর ধরে তিনি অসংখ্য মানুষকে খুন করেছেন।' তিনি আরও বলেন, ন্যায়বিচারের জন্য কখনো দেরি হয় না এবং এই পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে কৃতজ্ঞ।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের আন্তর্জাতিক বিষয় সম্পর্কিত ফেলো রোক্সানা ভিজিল বলেন, 'ব্লাঞ্চের ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ট্রাম্প প্রশাসন কি মাদুরোর মতোই এই অভিযোগকেও সামরিক অভিযান চালানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে কি না?'
ভিজিল বলেন, 'কিউবার রেজিম বিনা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করবে বলে মনে হয় না। আর কিউবা সরকারের সঙ্গে কোনো সমঝোতা বা কাজ করার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী কিউবানদের পক্ষে মেনে নেওয়াটাও খুব কঠিন হবে।'
রাউল কাস্ত্রোর নাতি রাউল গিলেরমো রদ্রিগেজ কাস্ত্রোসহ কিউবান এবং মার্কিন প্রতিনিধিরা গত কয়েক মাসে আলোচনার টেবিলে বসেছেন। তবে সাবেক কিউবান প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযোগ এই আলোচনার পথকে সহজ করবে বলে মনে হয় না।
উল্টো কিউবা মার্কিন চাপের বিরুদ্ধে তাদের 'নো সারেন্ডার, নো কনসেশন' (কোনো আত্মসমর্পণ নয়, কোনো ছাড় নয়) অবস্থানে আরও অটল থাকার কথা জানিয়েছে। কিউবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে 'মিথ্যা অভিযোগ' বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
