‘ডনরো ডকট্রিন’: ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের আগ্রাসনের নেপথ্যে কি চীনকে হটানোর ব্লু-প্রিন্ট?
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে কারাকাসের সুরক্ষিত প্রাসাদ থেকে নাটকীয়ভাবে তুলে নিয়ে নিউইয়র্কের কারাগারে বন্দী করেছে মার্কিন বাহিনী। এ ঘটনার পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নতুন পররাষ্ট্রনীতির কথা উল্লেখ করেছেন— 'ডনরো ডকট্রিন'। মূলত ১৮২৩ সালের ঐতিহাসিক 'মনরো ডকট্রিন'-এর সঙ্গে নিজের নাম 'ডোনাল্ড' জুড়ে দিয়ে ট্রাম্প এই অভিনব নীতিটি সামনে এনেছেন।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর নামানুসারে এই নীতির প্রবর্তন হয়। তখন তিনি বলেছিলেন, ইউরোপীয় দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘাত বা বিদ্যমান উপনিবেশে যুক্তরাষ্ট্র নাক গলাবে না। কিন্তু আমেরিকা মহাদেশে নতুন করে উপনিবেশ স্থাপন বা স্বাধীন দেশগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যেকোনো চেষ্টাকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের 'শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ' মনে করবে।
শুরুতে এটি একটি রক্ষণাত্মক নীতি হলেও ১৯০৪ সালে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট একে আরও আগ্রাসী রূপ দেন, যা 'রুজভেল্ট করোলারি' নামে পরিচিত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এই অঞ্চলের 'পুলিশ' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ল্যাটিন আমেরিকায় নিজেদের ক্ষমতা সুসংহত করতে এই নীতি ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপ, অভ্যুত্থান এবং একনায়কতন্ত্রকে সমর্থন দিয়ে আসছে।
তবে বারাক ওবামার আমলে এই নীতির অবসান ঘোষণা করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে ওবামার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছিলেন, মনরো ডকট্রিনের যুগ শেষ। কিন্তু সেই ঘোষণা বেশিদিন টেকেনি।
ঐতিহাসিক এই পররাষ্ট্রনীতিকেই নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন মোড়কে উপস্থাপন করেছেন ট্রাম্প। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদুরোকে অপসারণ বা ভেনেজুয়েলার তেল দখল ট্রাম্পের একমাত্র লক্ষ্য নয়। এই আগ্রাসী নীতির মূল টার্গেট আসলে বেইজিং। ল্যাটিন আমেরিকা থেকে চীনের প্রভাব চিরতরে মুছে ফেলার এক দীর্ঘমেয়াদি 'ব্লু-প্রিন্ট' হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে এই ডনরো ডকট্রিন।
'ডনরো ডকট্রিন'র জন্ম
'ডনরো ডকট্রিন' শব্দটি ট্রাম্পের নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত নয়। এর শেকড় রয়েছে মার্কিন ডানপন্থী গণমাধ্যমে। গত বছরের জানুয়ারিতে যখন ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড কেনার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন, তখন নিউ ইয়র্ক পোস্ট তাদের প্রচ্ছদে প্রথমবারের মতো এই শব্দটি ব্যবহার করে। এরপর ফিনানশিয়াল টাইমস কিংবা ফক্স নিউজের মতো ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমগুলোতে শব্দটি বারবার উচ্চারিত হতে থাকে।
শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প সেই শব্দটিকেই লুফে নিলেন। তিনি দম্ভের সঙ্গে বললেন, 'মনরো ডকট্রিন একটি বড় বিষয়, কিন্তু আমরা এটাকে অনেক দূর ছাপিয়ে গেছি। এখন তারা এটাকে বলছে "ডনরো ডকট্রিন"।'
এই নতুন নীতির সারকথা হলো—পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য হবে নিরঙ্কুশ। ঘরের কাছে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা যদি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য হুমকি হয়, তবে সেখানে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের অধিকার ওয়াশিংটনের রয়েছে। ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন, কলম্বিয়া ও কিউবাকে হুমকি এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের আকাঙ্ক্ষা—সবই এই ডকট্রিনের অংশ।
টার্গেট কি মাদুরো নাকি বেইজিং
মাদুরো ও তার স্ত্রীকে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়েছে এবং তাদেরকে 'আমেরিকান বিচারের মুখোমুখি' করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ট্রাম্প প্রশাসন বহুদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, মাদুরো সরকার যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও গ্যাং সদস্য পাঠাচ্ছে। এ নিয়ে ভেনেজুয়েলার ওপর নানারকম চাপ প্রয়োগের পর মার্কিন এই অভিযানের ঘটনা ঘটল।
তবে কি আসলেই মাদকের জন্যই মাদুরোকে তার দেশ থেকে তুলে নিয়ে আসলেন ট্রাম্প?
বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদুরো নয়, ট্রাম্পের এই আগ্রাসী মনোভাবের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে 'গ্রেট পাওয়ার কম্পিটিশন' বা চীনের সঙ্গে পরাশক্তির লড়াই। গত কয়েক দশকে ল্যাটিন আমেরিকায় চীন এক বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। 'বেল্ট অ্যান্ড রোড' ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে বেইজিং সেখানে অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং বাণিজ্যে বিশাল বিনিয়োগ করেছে।
ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলা ও বলিভিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে গড়ে তুলেছে কৌশলগত সম্পর্ক।
যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, তাদের 'ব্যাকইয়ার্ড' বা পেছনের উঠানে চীনের এই উপস্থিতি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্রগুলোতে চীনের বড় বিনিয়োগ ছিল। মাদুরোকে সরিয়ে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, 'আমরা ভেনেজুয়েলা চালাব এবং তাদের তেল থেকে আমেরিকা লাভবান হবে।' এর মাধ্যমে তিনি বেইজিংকে স্পষ্ট বার্তা দিলেন যে, তেলের এই উৎসে তাদের প্রবেশাধিকার বন্ধ।
সাংহাইয়ের ফুদান ইউনিভার্সিটির আমেরিকান স্টাডিজের উপ-পরিচালক ঝাও মিংহাও সতর্ক করে বলেছেন, 'তৃতীয় দেশগুলোতে—বিশেষ করে পশ্চিম গোলার্ধে, যা ট্রাম্পের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা আরও জটিল ও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটন তৃতীয় দেশগুলোতে চীনের ওপর চাপ আরও বাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি কেবল বাণিজ্য বা অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতেও গড়াবে। এর ফলে চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড' উদ্যোগের আওতায় অবকাঠামোগত সহযোগিতাসহ বেইজিংয়ের আর্থিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ল্যাটিন আমেরিকায় 'চিলিং ইফেক্ট'
মাদুরোর পরিণতি দেখে ল্যাটিন আমেরিকার অন্য দেশগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যে একটি 'চিলিং ইফেক্ট' বা ভীতির সঞ্চার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপে অনেক দেশই এখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হচ্ছে।
বলিভিয়ার নতুন প্রশাসন ইতিমধ্যে চীনের সঙ্গে করা লিথিয়াম চুক্তি পর্যালোচনার ঘোষণা দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। আর্জেন্টিনায় প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলি চীনের অর্থায়নে পরিচালিত মহাকাশ ও টেলিযোগাযোগ প্রকল্পগুলো স্থগিত করার বিনিময়ে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্যাকেজ নিশ্চিত করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ছোট ও মাঝারি অর্থনীতির দেশগুলো এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। একদিকে চীনের বিশাল বিনিয়োগ ও সস্তা ঋণ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের হুমকি। এই উভয় সংকটে পড়ে অনেক দেশই বেইজিংয়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ওয়াশিংটনের ছাতার নিচে আসতে বাধ্য হতে পারে।
বেইজিং ফরেন স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির ইউরোপীয় স্টাডিজের প্রধান কুই হংজিয়ান সতর্ক করে বলেন, মাদুরোকে আটক করার ঘটনাটি যদি ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে একটি 'সতর্কবার্তা' হয়, তবে তা পুরো ল্যাটিন আমেরিকাজুড়ে একটি ভীতির পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, 'এমন পরিস্থিতিতে এই অঞ্চলে চীন কীভাবে তার বিনিয়োগ টিকিয়ে রাখবে এবং বিগত বছরগুলোতে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক বজায় রাখবে, তা বেইজিংয়ের জন্য প্রধান চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
একসময়ের হস্তক্ষেপ-বিরোধী ট্রাম্প এখন তার অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। শুরুতে তার যেসব মন্তব্যকে নিছক কৌতুক বা পাগলামি বলে মনে হতো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এবং কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগের ফলে সেগুলো এখন ভীতিকর হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের সব কথা আক্ষরিক অর্থে না নিলেও, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার সময় এসেছে।
আগে যুক্তরাষ্ট্র 'গণতন্ত্র' বা 'মানবাধিকার' রক্ষার দোহাই দিয়ে হস্তক্ষেপ করত। কিন্তু 'ডনরো ডকট্রিন'-এ সেই রাখঢাক নেই। এটি নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ, যেখানে জাতীয় স্বার্থ ও সম্পদের দখলই শেষ কথা। চীনের 'সাপ্লাই চেইন' ভেঙে দেওয়া এবং বিরল খনিজ ও তেলের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই ট্রাম্পের এই নতুন খেলার মূল লক্ষ্য।
আর্জেন্টিনার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব রোজারিও-র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এস্তেবান অ্যাক্টিস বলেন, ট্রাম্পের 'ডনরো ডকট্রিন' মূলত রাজনৈতিক শিষ্টাচার বা পলিটিক্যাল কারেক্টনেস বর্জন করারই নামান্তর। তিনি বলেন, 'ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের নীতিতে বিশ্বাসী এবং তিনি তা লুকিয়ে রাখতে চান না।'
অধ্যাপক অ্যাক্টিসের মতে, কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের এভাবে প্রকাশ্যে মনরো ডকট্রিনকে সমর্থন করা বিরল ঘটনা। স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র এই নীতি মেনে চললেও তা ছিল অনেকটা অঘোষিত। কিন্তু ট্রাম্প এটি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে করছেন।
তিনি আরও বলেন, 'বিশ্বে খাদ্য, খনিজ বা তেলের অভাব নেই। সমস্যা হলো সেগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ। চীন যেমন বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও মনে করে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে পশ্চিম গোলার্ধের ওপর তাদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।'
ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে আটক করা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি নতুন যুগের সূচনা। ডনরো ডকট্রিনের মাধ্যমে ট্রাম্প বুঝিয়ে দিলেন, ল্যাটিন আমেরিকাকে তিনি পুনরায় ওয়াশিংটনের কলোনি হিসেবেই দেখতে চান। যেখানে সার্বভৌমত্বের কোনো স্থান নেই, আছে শুধু 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতি। চীনের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা, আর ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর জন্য এটি এক কঠিন পরীক্ষার সময়। বিশ্ব দেখছে স্নায়ুযুদ্ধের এক নতুন কুরুক্ষেত্র, যেখানে অস্ত্রের চেয়েও বড় অস্ত্র হয়ে উঠছে খনিজ সম্পদ ও ভূ-রাজনীতি।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়
- তথ্যসূত্র: বুয়েনস আইরেস হেরাল্ড, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, গার্ডিয়ান, সিএনএন
