মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার মুখে আরও কঠোর হয়ে উঠছে ইরান
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের পাঠানো যুদ্ধবিরতির দুটি বার্তা প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান।
কারণ দেশটির নেতারা মনে করছেন যুদ্ধ তাদের অনুকূলে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজনৈতিক চাপের মুখে আছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ট্রাম্প যদি একতরফাভাবে ঘোষণা করেন যে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ জিতেছে, তবুও তাতে সংঘাতের অবসান হবে না। এর অর্থ, যুক্তরাষ্ট্র হামলা বন্ধের আগ্রহ দেখালেও ইরান সংঘাত চালিয়ে যেতে পারে বা হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে।
ইরানের মতে, যতক্ষণ না ট্রাম্পকে দেখানো যায় যে এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক খরচ এত বেশি যে তা পুনরাবৃত্তি করা অর্থহীন, ততক্ষণ এই সংঘাতের অবসান হবে না। তাই তারা এমন একটি স্থায়ী চুক্তির দাবি করছে যাতে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে ইরানে হামলা না করার অঙ্গীকার দেয়।
উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেন, 'যুদ্ধবিরতি বা যুদ্ধ থামাতে হলে ইরানের বিরুদ্ধে আর আগ্রাসী পদক্ষেপ নেওয়া হবে না তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। তা না হলে কয়েক মাস পর আবার হামলা হলে এমন যুদ্ধবিরতির কোনো মানে থাকবে না।'
১১ দিন আগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় ইরানের সরকার মূলত নিজেদের টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল। তবে এখন তাদের অবস্থান আরও কঠোর হয়ে উঠেছে।
তবে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেওয়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খতিয়ে দেখছে, যুদ্ধটি কি গত বছরের জুনের মতো হঠাৎ থেমে যেতে পারে, নাকি এমন কোনো চুক্তির মাধ্যমে শেষ হবে যাতে শর্তসাপেক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হতে পারে।
তবে ধারণা করা হচ্ছে ইরানি নেতৃত্বের সামগ্রিক মনোভাব যুদ্ধে অনড় থাকা এবং এই পর্যায়ে কোনো সমঝোতায় না যাওয়া।
বুধবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তাদের ওপর তীব্র কূটনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। ৮০টির বেশি দেশ বাহরাইনের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি প্রস্তাব আনতে যাচ্ছে, যেখানে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলার নিন্দা জানানো হবে, তবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সমালোচনা থাকবে না।
এছাড়া রাশিয়া যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে আলাদা একটি প্রস্তাব আনতে পারে।
পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, 'আমরা মোটেই যুদ্ধবিরতি চাইছি না। শত্রু যেন জানে, তারা যা করবে তার উপযুক্ত ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেওয়া হবে। আমরা চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত আদায়ে আপসহীন ভাবে লড়ছি।'
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জোর দিয়ে বলেছে, তারা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং প্রায় ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়।
আইআরজিসি বলেছে, 'যুদ্ধের শুরুতে আমরা ঘোষণা করেছি এবং আবারও বলছি—ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে জড়িত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো জাহাজের হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার অধিকার নেই। যদি সন্দেহ থাকে, কাছে এসে দেখুন।'
আইআরজিসি আরও বলেছে, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করবে, তাদের জাহাজকে প্রণালি দিয়ে যেতে দেওয়া হবে।
এমনকি তুলনামূলকভাবে কম কঠোর অবস্থানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও দৃঢ় সুরে বলেছেন, 'ধ্বংসকারী শক্তিগুলো এসেছে এবং চলে গেছে। ইরান এখনও রয়েছে।'
ইরানি কূটনীতিকরা বলছেন, এর আগে দুই দফা কূটনৈতিক আলোচনা মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলার কারণে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, এখন কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর বাস্তব ভিত্তি নেই।
অন্যদিকে সোমবার রাতে সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরে বিজয় ঘোষণার সম্ভাবনার কথা বলেন।
সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ও পারমাণবিক কর্মসূচিতে যথেষ্ট ক্ষতি করা হয়েছে, তাই হামলা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নাও থাকতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ বিজয় ঘোষণা করেননি।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো অ্যালেক্স ভাটানকা বলেন, 'ইরানের সরকার মনে করছে তারা এই যুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে এবং এতে তাদের বৈধতাও বাড়তে পারে। কারণ অন্যথায় তারা দেশের জন্য এক ধরনের বিপর্যয় হয়ে উঠেছিল।'
তিনি বলেন, ইসরায়েলের কিছু জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ফলে তেহরানের আকাশে কালো ধোঁয়ার মেঘ ছড়িয়ে পড়ে। এতে ইরানি জনগণ ক্ষুব্ধ হয়েছে এবং এতে জনমতের পরিবর্তন ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন, '২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বোঝা গেছে ইরানি জনমতে পরিবর্তন এসেছে। দেশটির জনগণ এটিকে সরকারবিরোধী যুদ্ধের ধারণা থেকে পরিবর্তিত হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে দেখা শুরু করেছে।'
তবে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের এমিল হোকায়েম বলেছেন, ইরান নিজেই বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছে।
তিনি বলেন, 'সরকার এখনও টিকে আছে, কিন্তু বড় ধরনের সম্পদ সংকটে পড়েছে।'
তিনি আরও বলেন, তাদের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে তার নিজের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাবে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ যদি তার সঙ্গে বাণিজ্য করতে না চায় এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের সম্পদ ফ্রিজ করার ভাবছে, তা যতি সত্যিই করে- তাহলে লড়াই করার জোগান আসবে কোথা থেকে?
