ইরানকে ঠেকাতে ট্রাম্পের গোপন অস্ত্র হতে পারে পারস্য উপসাগরের ছোট্ট এক দ্বীপ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ যতই গড়াচ্ছে, সবার নজর এখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশটির উপকূলীয় ছোট্ট একটি দ্বীপের দিকে।
এই দ্বীপটির নাম 'খার্গ দ্বীপ'। এর মোট আয়তন মাত্র ৭.৭ বর্গমাইল। এটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিপিং রুট হরমুজ প্রণালির উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত।
আকারে ছোট হলেও এটি ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল। দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯৪ শতাংশই হয় এই দ্বীপ থেকে, যার বড় অংশই যায় চীনে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপটি দখলের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারের চেয়েও ছোট এই দ্বীপটি হাতছাড়া হলে ইরানের অর্থনীতি থমকে যাবে এবং আগামী কয়েক বছরের জন্য দেশটিতে এক ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়বে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের ইউরোপ অফিসের জলবায়ু, শক্তি এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক গবেষক পেত্রাস কাটিনাস দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, 'এই দ্বীপটি দখল করলে ইরানের তেলের 'লাইফলাইন' কাটা পড়বে, যা বর্তমান সরকারের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
তিনি আরও বলেন, 'অবশ্যই, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় তারা এমনিতেই তেল বিক্রি করতে পারছে না। তবে ভবিষ্যতের কথা ভাবলে, দ্বীপটি দখলে থাকলে তা আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়তি সুবিধা দেবে। সামরিক অভিযান শেষে ইরানে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, এই সুবিধা কাজে লাগবে।'
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) প্রধান এই জলপথের 'পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ' নেওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
এর ফলে বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, পরিস্থিতি এমন চলতে থাকলে বিশ্বজুড়ে ভয়ংকর অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে।
সোমবার তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, পরে অবশ্য তা কিছুটা কমেছে। তবে আইআরজিসি হুমকি দিয়েছে যে সংঘাত বাড়লে তেলের দাম ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ট্রাম্পের এই অভিযানের আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের জন্য লেখা এক নিবন্ধে পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা মাইকেল রুবিন লিখেছিলেন, 'তিনি (ট্রাম্প) যদি খার্গ ধ্বংস না করে দখল করেন, তবে শুধু এই বিষয়টিই নিশ্চিত করবেন না যে বর্তমান সরকার আর কখনোই তাদের আমলা ও সেনাদের বেতন দিতে পারবে না।'
তিনি আরও লেখেন, 'বরং, ভবিষ্যতে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর নতুন সরকার যাতে নিজেদের পুনর্গঠনের খরচ মেটাতে পারে, সেটাও এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।'
তিনি বলেন, 'আইআরজিসি হয়তো ব্যালিস্টিক মিসাইল দিয়ে খার্গ দ্বীপকে লক্ষ্যবস্তু বানাবে। কিন্তু সেটা হবে তাদের নিজেদের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করার শামিল। ট্রাম্প যে শুধু কড়া জবাব দেবেন তা-ই নয়, এ ধরনের পদক্ষেপে ইরানের তেল রপ্তানি মাসের পর মাস বন্ধ হয়ে যাবে এবং আবার বেতন আটকে যাবে।'
অন্যান্য বিশ্লেষকরাও মনে করেন, এই দ্বীপটিকে দর কষাকষির বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ ইরানের সরকারি বাজেটের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে তেল রপ্তানি থেকে।
তবে এই দ্বীপ দখল করতে গেলে মার্কিন ও ইসরায়েলি সেনারা ইরানি বাহিনীর হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তেল বিশ্লেষক তামাস ভার্গ সিএনবিসিকে বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রটি দখলের সিদ্ধান্ত নেন, তবে তা ইরানি সরকারের জন্য এক বিশাল ধাক্কা হবে। কারণ এর মাধ্যমে তাদের রাজস্বের একটি প্রধান উৎস বন্ধ হয়ে যাবে।'
তিনি আরও বলেন, 'এমন একটি পদক্ষেপ এ বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপের কথাই মনে করিয়ে দেয়, যখন যুক্তরাষ্ট্র কার্যত দেশটির তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল।'
এর আগে ১৯৮৪ সালেও সাদ্দাম হোসেন এই দ্বীপে হামলা চালিয়েছিলেন, যা ইরান-ইরাক যুদ্ধে 'তেল ট্যাঙ্কার যুদ্ধ'র জন্ম দিয়েছিল।
তবে ট্রাম্পের নজরে খার্গ দ্বীপ এই প্রথম পড়ল না। প্রায় ৪০ বছর আগে 'দ্য গার্ডিয়ান'-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই দ্বীপটি নিয়ে এক কথায় মন্তব্য করেছিলেন।
১৯৮৮ সালে নিজের লেখা বই 'দ্য আর্ট অব দ্য ডিল'-এর প্রচারণায় এসে তিনি ইরান সম্পর্কে বলেছিলেন, 'তারা মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমাদের হারিয়ে দিচ্ছে, আমাদের বোকা বানাচ্ছে। আমাদের কোনো লোক বা জাহাজে একটি গুলি লাগলেই আমি খার্গ দ্বীপে হামলা চালাব। আমি ভেতরে ঢুকে ওটা দখল করে নেব।'
