যুদ্ধের মধ্যেই নতুন কৌশল রপ্তের সামর্থ্য দেখিয়েছে ইরানের সেনাবাহিনী, বলছেন মার্কিন কর্মকর্তারা
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের চলমান যৌথ বোমা হামলার মুখে ইরানের সেনাবাহিনী তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা। যদিও একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দাবি করছে যে, যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রই করছে।
যুদ্ধ শুরুর পর গত ১১ দিনে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে, বা আরও সুস্পষ্টভাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও রাডার অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
তারা বলছেন, ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা এমন হোটেলগুলোতেও হামলা চালিয়েছে যেখানে মার্কিন সেনারা অবস্থান করতেন। ইরবিল শহরের একটি বিলাসবহুল হোটেলে ড্রোনের ঝাঁক ব্যবহার করে হামলা চালায় ইরাকের একটি মিলিশিয়া গোষ্ঠী। এতে বোঝা যায়, ওই অঞ্চলের হোটেলগুলোতে পেন্টাগন মার্কিন সেনাদের রাখছে—এ তথ্য ইরানের জানা ছিল বলে জানান এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা।
তিনি এবং আরও দুই কর্মকর্তা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ইরান সম্ভবত মেনে নিয়েছে যে সরাসরি সামরিক শক্তির দিক থেকে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না। তবে তারা যদি টানা হামলার মধ্যেও টিকে থাকতে পারে, তাহলে তেহরানের সরকার এটিকে নিজেদের বিজয় হিসেবে দাবি করতে পারবে।
কর্মকর্তারা আরও বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনী এখন যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল জায়গাগুলোকে লক্ষ্য করছে—বিশেষ করে অত্র অঞ্চলে মোতায়েন মার্কিন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম রক্ষায় ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত সাতজন মার্কিন সেনা নিহত এবং ১৪০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পেন্টাগন। আহতদের মধ্যে ১০৮ জন আবার দায়িত্বে ফিরেছেন।
ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানে প্রায় ১,৩০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের হামলায় অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন।
গত বছর ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয় দেশই তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের বড় ক্ষতির মুখে পড়ে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ১০০ থেকে ২৫০টি থাড সিস্টেমের ইন্টারসেপ্টর মিসাইল ব্যবহার করেছিল—যা পেন্টাগনের এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের মোট মজুদের প্রায় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ। একই সময় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৮০টি এসএম-৩ ইন্টারসেপ্টর মিসাইল ব্যবহার করে, যা তাদের মোট মজুদের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ।
জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ, ভালি আর. নাসর বলেন, বলেন, "১২ দিনের যুদ্ধ থেকে তারা খুব দ্রুত শিক্ষা নিয়ে তা বাস্তবায়ন করেছে—এটা সত্যিই বিস্ময়কর।" তিনি বলেন, "তারা (ইরানিরা) বুঝেছে যে আমাদের দুর্বলতা হলো প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা—যেমন থাড ও প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর মিসাইল-নির্ভরতা।"
নাসরের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এসব প্রতিরক্ষা মজুদ ক্ষয় করে দেওয়ার পরও—ইরানের হাতে এখনও কিছু (ক্ষেপণাস্ত্র) উৎক্ষেপণ সক্ষমতা থাকতে পারে, যা দিয়ে তারা মার্কিন সেনা, সামরিক সরঞ্জাম ও মিত্র দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন স্বীকার করেন, ইরানের সেনাবাহিনী তাদের কৌশল বদলেছে।
তিনি বলেন, "শত্রুর সঙ্গে প্রথম সংঘর্ষের পর কোনো পরিকল্পনাই অপরিবর্তিত থাকে না। তারা যেমন নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে, আমরাও তেমনি মানিয়ে নিচ্ছি।"
তবে ইরান ঠিক কীভাবে কৌশল বদলেছে তা নির্দিষ্ট করে বলতে চাননি তিনি। "আমাদের অপারেশনাল নিরাপত্তার কারণেই ইরানিদের কোনটা (কৌশল) কাজে দিচ্ছে— তা আমি তাদের বলতে চাই না," বলেন জেনারেল কেইন।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে ইরান প্রতিশোধমূলক হামলার আগে সাধারণত আগাম সতর্কতা দিত এবং অনেক সময় কেবল প্রতীকী প্রতিক্রিয়া দেখাত। গত বছর ট্রাম্পের নির্দেশে মার্কিন বি-২ স্পিরিট বোমারু বিমান তিনটি ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর ইরান কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়, যেটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটি। সে সময় হামলার আগেই লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়েছিল তেহরান।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান আল-উদেইদ ঘাঁটির একটি আগাম সতর্কতা রাডার ব্যবস্থায় হামলা চালিয়ে উন্নত রাডার ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে ইতঃপূর্বে জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদন।
মার্কিন সামরিক যোগাযোগ অবকাঠামোর বেশিরভাগই অত্যন্ত গোপন হওয়ায়, ঠিক কোন সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে লক্ষ্যবস্তুগুলোর ধরন দেখে মনে হচ্ছে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক যোগাযোগ ও সমন্বয় ক্ষমতা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করছে।
ইরান ক্যাম্প আরিফজান ঘাঁটির তিনটি রাডার ডোমেও হামলা চালিয়েছে, এই ঘাঁটিতেও মার্কিন সেনারা অবস্থান করেন।
সেখান থেকে প্রায় ৫০ মাইল উত্তর-পূর্বে আলী আল সালেম বিমানঘাঁটিতে স্যাটেলাইট যোগাযোগ অবকাঠামোর পাশের অন্তত ছয়টি ভবন বা স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। হামলার পর তোলা ছবিতে এমনটাই দেখা গেছে।
পেন্টাগনের একটি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের বাহরাইনে অবস্থিত সদর দপ্তরে একটি হামলার ক্ষয়ক্ষতি প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস বা প্রতিনিধি পরিষদকে জানানো হয়েছে।
অতীতে ইরান তাদের ড্রোন হামলার বেশিরভাগই ইসরায়েলের দিকে পরিচালিত করত। কিন্তু এবার তারা সস্তা একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন হাজার হাজার সংখ্যায় নিক্ষেপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও সামরিক সম্পদের দিকে—যার মধ্যে রয়েছে কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক ও বাহরাইনের মতো দেশ।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্বীকার করেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের এত তীব্র প্রতিক্রিয়া পেন্টাগন আগে থেকে পুরোপুরি অনুমান করতে পারেনি। তবে তিনি দাবি করেন, ইরানের কৌশল উল্টো ফল দিচ্ছে।
তিনি বলেন, "ঠিক এভাবেই তারা প্রতিক্রিয়া দেখাবে—এটা আমরা নিশ্চিতভাবে বলিনি, তবে সম্ভাবনা ছিল। আমি মনে করি, এটি ছিল (ইরানি) শাসকগোষ্ঠীর মরিয়া দশারই বহিঃপ্রকাশ।"
হেগসেথ আরও বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোকে দ্রুত লক্ষ্যবস্তু করা ইরানি শাসকগোষ্ঠীর বড় ভুল ছিল এবং এতে তারা নিজেদের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে ফেলেছে।
জেনারেল কেইন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র বিমান হামলার কারণে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তিনি বলেন, "আমাদের হামলার ফলে ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সংখ্যা কমাতে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি।"
তার মতে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরুতে যে মাত্রায় ছিল—তার তুলনায় এখন প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। একইভাবে একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোনের ব্যবহার অপারেশন শুরুর পর থেকে ৮৩ শতাংশ কমেছে।
তবে ইরানের হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। দুইজন সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পেন্টাগনের আশঙ্কা রয়েছে যে ইরানের সব মিসাইল উৎক্ষেপণ ঘাঁটি সম্পর্কে তাদের কাছে স্পষ্ট তথ্য নেই। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য ইরান অনেক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রেখেছে।
গত সপ্তাহে ক্যাপিটল হিলে আইনপ্রণেতাদের দেওয়া গোপন ব্রিফিংয়ে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের এখনও প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা অক্ষত রয়েছে। তবে বিমান হামলার মাধ্যমে প্রতিদিনই সেই সক্ষমতা কমিয়ে আনা হচ্ছে।
ভালি নাসর বলেন, "যদি প্রশ্ন করা হয় শত্রুপক্ষ কী ভাবছে—তাহলে সম্ভবত প্রথম দফার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছিল দরজা খোলার মতো পদক্ষেপ। এরপর আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র, এমনকি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করা হতে পারে।"
মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের শুরুতেই দেশের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পরও ইরান প্রতিদিন দেখিয়ে দিচ্ছে যে তাদের যুদ্ধক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
তাদের মতে, ইরান নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়া কোনো রাষ্ট্রের মতো আচরণ করছে না।
