যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা করলে ন্যাটোর অস্তিত্ব থাকবে না: ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী
যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা করে, তবে সামরিক জোট ন্যাটোর ইতি ঘটবে বলে জানিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার কথা বলায় এ প্রতিক্রিয়া জানান তিনি।
গত সোমবার ডেনমার্কের সম্প্রচারমাধ্যম টিভি টু-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র যদি ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশের ওপর সামরিক হামলা চালায়, তবে সেখানেই সবকিছুর সমাপ্তি ঘটবে। অর্থাৎ, ন্যাটো এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমরা যে নিরাপত্তা পেয়ে আসছি, তার কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না।'
গত শনিবার রাতে ভেনেজুয়েলার কারাকাসে অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে মার্কিন বাহিনী। আকস্মিক এই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে বিস্ময় ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডে এই উদ্বেগ বেশি। কারণ, আর্কটিক অঞ্চলের খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই দ্বীপটি ডেনমার্কের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং ন্যাটোর অংশ।
ভেনেজুয়েলা অভিযানের পরপরই ট্রাম্প কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এর জবাবে ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী এবং গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস ফ্রেডেরিক নিয়েলসেন ট্রাম্পের মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন।
তারা সতর্ক করে বলেন, এমন কিছু ঘটলে তা বিপর্যয় ডেকে আনবে। ইউরোপের অন্য নেতারাও এ বিষয়ে ডেনমার্কের পাশে দাঁড়িয়ে সংহতি প্রকাশ করেছেন।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব চাইছিলেন ট্রাম্প। এমনকি এ জন্য প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করেননি।
তবে গত রোববার সাংবাদিকদের উদ্দেশে ট্রাম্পের বলা একটি কথায় সেই আতঙ্ক আরও বেড়েছে। তিনি বলেছেন, '২০ দিন পর আমরা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কথা বলব।'
তার এই সময়সীমা বেঁধে দেওয়া থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে, হয়তো অদূর ভবিষ্যতেই গ্রিনল্যান্ডে বড় কোনো হস্তক্ষেপ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডেরিকসেনও বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহকে 'হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই'। ট্রাম্প যখন কিছু বলেন, তা গুরুত্বের সঙ্গেই দেখা উচিত। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, 'আমরা এবং গ্রিনল্যান্ড এভাবে হুমকির মুখে থাকব, এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।'
এদিকে সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস ফ্রেডেরিক নিয়েলসেন বলেন, গ্রিনল্যান্ডকে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে মেলানো ঠিক হবে না। তিনি জনগণকে শান্ত ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
নিয়েলসেন বলেন, 'এমন নয় যে রাতারাতি কেউ আমাদের দেশ দখল করে নেবে। আমরা এখনো ভালো সহযোগিতার ওপরই জোর দিচ্ছি।' তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি এমন নয় যে যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই গ্রিনল্যান্ড জয় করে নিতে পারবে।
টিভি টু-এর রাজনৈতিক সাংবাদিক আস্ক রোস্ট্রাপ মনে করেন, পরিস্থিতির গুরুত্ব এখন অনেক বেড়েছে। তিনি বলেন, আগে হলে হয়তো ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দখলের চিন্তাকে সরাসরি উড়িয়ে দিতেন। কিন্তু এখন ট্রাম্পের হুমকি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রধানমন্ত্রী নিজেও এই আশঙ্কার বিষয়টি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এদিকে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা জোরদারে ডেনমার্কের নেওয়া উদ্যোগ নিয়ে রীতিমতো উপহাস করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কটাক্ষ করে তিনি বলেছেন, আর্কটিক অঞ্চলে ডেনমার্কের অস্ত্রভান্ডারে কেবল 'আরেকটি কুকুরচালিত স্লেজ গাড়ি' যুক্ত হয়েছে।
গত রোববার ফ্লোরিডা থেকে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, 'কৌশলগতভাবে জায়গাটি (গ্রিনল্যান্ড) এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিনল্যান্ডের চারপাশ রাশিয়া ও চীনের জাহাজে ছেয়ে গেছে।'
যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, 'জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার। কারণ, ডেনমার্কের পক্ষে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।'
তবে ট্রাম্পের এই দাবির সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ডেনিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ উলরিক প্রাম গ্যাড গত বছর এক প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, 'আর্কটিক সাগরে রাশিয়া ও চীনের জাহাজ অবশ্যই আছে। তবে সেগুলো গ্রিনল্যান্ড থেকে এত দূরে যে খালি চোখ তো দূরের কথা, বাইনোকুলার দিয়েও তা দেখা সম্ভব নয়।'
এদিকে, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে ক্ষোভ উসকে দিয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা ও পডকাস্টার কেটি মিলার। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি গ্রিনল্যান্ডের একটি মানচিত্র পোস্ট করেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার রঙে রাঙানো। আর ক্যাপশনে লেখা—'সুন' (শিগগিরই) ।
অবশ্য গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নতুন নয়। দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পেন্টাগনের 'পিটুফিক স্পেস বেস' রয়েছে। ১৯৫১ সালে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সই হওয়া প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় দুর্গম এই এলাকায় ঘাঁটিটি তৈরি করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর জন্য ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং মহাকাশ নজরদারির কাজ এখান থেকেই পরিচালনা করা হয়।
মূল ভূখণ্ড ডেনমার্কের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক অংশীদারত্ব রয়েছে। ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনে। এমনকি গত বছরই ডেনিশ পার্লামেন্টে একটি বিল পাস হয়েছে, যার মাধ্যমে ডেনমার্কের মাটিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
জো বাইডেন প্রশাসনের সময় ২০২৩ সালে করা একটি চুক্তির আওতায় মার্কিন সেনারা ডেনমার্কের বিমানঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ পেত। নতুন আইনে সেই সুযোগ আরও বাড়ানো হয়েছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ডেনমার্ক কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজেদের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়েছে।
