সুর পাল্টে ব্রিটিশ সেনাদের প্রশংসা করলেন ট্রাম্প, বললেন 'তারা সর্বকালের সেরা যোদ্ধা'
আফগানিস্তান যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর তীব্র সমালোচনার মুখে সুর পাল্টেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন মিত্ররা যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইন বা সম্মুখসারিতে ছিল না—এমন দাবি করে তোপের মুখে পড়ার পর এবার তিনি ব্রিটিশ সেনাদের 'সর্বকালের অন্যতম সেরা যোদ্ধা' হিসেবে প্রশংসা করেছেন।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ন্যাটো সেনাদের ভূমিকা ছোট করে দেখিয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনে সামরিক জোটটি পাশে থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে মিত্রদের ক্ষুব্ধ করেছিলেন ট্রাম্প। আন্তর্জাতিক মিত্ররা ট্রাম্পের ওই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার একে 'অপদমনী এবং ন্যাক্কারজনক' বলে অভিহিত করেন।
শনিবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ ব্রিটিশ সেনাদের প্রশংসা করে পোস্ট দেন।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ন্যাটো সেনাদের নিয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, 'আমাদের কখনই তাদের প্রয়োজন ছিল না। আমরা তাদের কাছে আসলে কিছুই চাইনি। তারা বলবে তারা আফগানিস্তানে কিছু সেনা পাঠিয়েছিল... এবং তারা তা করেছিল, কিন্তু তারা কিছুটা পেছনে ছিল, ফ্রন্ট লাইন বা সম্মুখসারি থেকে কিছুটা দূরে ছিল।'
তার এই মন্তব্যের পর আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালন করা সেনাদের পরিবার, প্রবীণ যোদ্ধা এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ওয়েস্টমিনিস্টার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের রাজনীতিকরা ট্রাম্পকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান।
প্রিন্স হ্যারি বলেন, সেনাদের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন, নাইন-ইলেভেনের হামলার পর ন্যাটোর সামষ্টিক নিরাপত্তা ধারাটি (আর্টিকেল ৫) একবারই কার্যকর করা হয়েছিল।
২০০১ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে তালেবানদের হটাতে হামলা চালায়। ২০২১ সালে সেনা প্রত্যাহারের আগপর্যন্ত ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি জোট সেনা নিহত হন, যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আমেরিকান (২,৪৬১)। যুক্তরাষ্ট্রের পর ব্রিটেনই এই সংঘাতে সবচেয়ে বেশি সেনা (৪৫৭) হারিয়েছে।
শনিবার ডাউনিং স্ট্রিটের এক মুখপাত্র জানান, প্রধানমন্ত্রী এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট আফগানিস্তান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর পাশাপাশি ব্রিটেনের সম্পৃক্ততা নিয়ে কথা বলেছেন। মুখপাত্র বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী সাহসী এবং বীর ব্রিটিশ ও আমেরিকান সেনাদের কথা তুলে ধরেন যারা আফগানিস্তানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন, যাদের অনেকেই আর বাড়ি ফেরেননি। আমরা তাদের আত্মত্যাগ কখনই ভুলব না।'
ফোনালাপের পরপরই ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে নতুন মন্তব্য পোস্ট করেন। সেখানে আগের মন্তব্যের জন্য সরাসরি ক্ষমা না চাইলেও তিনি সুর নরম করেন। ট্রাম্প লেখেন, 'যুক্তরাজ্যের মহান এবং অত্যন্ত সাহসী সেনারা সর্বদা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকবে। আফগানিস্তানে ৪৫৭ জন মারা গেছেন, অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন এবং তারা ছিলেন সর্বকালের সেরা যোদ্ধাদের অন্যতম।'
তিনি আরও লেখেন, 'এটি এমন এক বন্ধন যা কখনই ভাঙার নয়। যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনী, তাদের বিশাল হৃদয়ের কারণে, কারো চেয়ে কম নয় (যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া)। আমরা তোমাদের সবাইকে ভালোবাসি এবং সর্বদা বাসব!'
কনজারভেটিভ নেত্রী কেমি ব্যাডেনক বলেন, ট্রাম্প আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো মিত্রদের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের লড়াইয়ের ভূমিকা স্বীকার করায় তিনি আনন্দিত। তিনি বলেন, 'এটি (সেনাদের ভূমিকা) নিয়ে প্রথমেই প্রশ্ন তোলা উচিত ছিল না।'
শুক্রবার ডিউক অব সাসেক্স (প্রিন্স হ্যারি) এক বিবৃতিতে বলেন, 'আমি সেখানে দায়িত্ব পালন করেছি। সেখানে আমার আজীবনের বন্ধু তৈরি হয়েছে। এবং আমি সেখানে বন্ধুদের হারিয়েছি।'
তিনি বলেন, '২০০১ সালে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এবং একমাত্র ন্যাটো অনুচ্ছেদ ৫ কার্যকর করেছিল। এর অর্থ ছিল, আমাদের যৌথ নিরাপত্তার স্বার্থে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াতে প্রতিটি মিত্র দেশ বাধ্য ছিল। মিত্ররা সেই ডাকে সাড়া দিয়েছিল। হাজারো জীবন চিরতরে বদলে গেছে। মা-বাবারা তাদের ছেলে-মেয়েদের দাফন করেছেন। শিশুরা বাবা-মা হারিয়েছে। পরিবারগুলো সেই মূল্য বয়ে বেড়াচ্ছে। এই আত্মত্যাগগুলো সত্যতার সাথে এবং শ্রদ্ধার সাথে বলা উচিত, কারণ আমরা সবাই কূটনীতি ও শান্তির রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ ও অনুগত।'
আফগানিস্তানে নিহত ৪৫৭ ব্রিটিশ সেনার অধিকাংশই হেলমান্দে নিহত হন, যা ছিল তুমুল লড়াইয়ের স্থান। আরও শত শত সেনা আহত হন এবং অঙ্গহানি ঘটে। তাদেরই একজন কর্পোরাল অ্যান্ডি রিড, যিনি একটি আইইডিতে পা দিয়ে দুই পা এবং ডান হাত হারান। তিনি বিবিসি ব্রেকফাস্টকে বলেন, 'শারীরিক বা মানসিকভাবে ওই সংঘাতের কথা মনে করে আমাদের কোনো দিনই ব্যথামুক্ত কাটে না। যদি তারা (মার্কিন সেনারা) ফ্রন্ট লাইনে থাকে এবং আমি তাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকি, তবে স্পষ্টতই আমরাও ফ্রন্ট লাইনে ছিলাম।'
ব্রিটেনের কেমি ব্যাডেনক, স্যার এড ডেভি এবং নাইজেল ফারাজের মতো নেতাদের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশের মন্ত্রীরাও ট্রাম্পের মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন।
কানাডার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেভিড জে ম্যাকগুইন্টি বলেন, 'কানাডিয়ান নারী ও পুরুষরা শুরু থেকেই সেখানে ছিলেন, বাধ্য হয়ে নয় বরং এটি সঠিক কাজ ছিল বলেই তারা তা করেছিলেন।'
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হার্বার্ট রেমন্ড ম্যাকমাস্টার বিবিসিকে বলেন, 'আমি মনে করি এটি তাদের জন্য অপমানজনক যারা আমাদের পাশে থেকে লড়াই করেছেন।'
শনিবারের পোস্টে ট্রাম্প অন্য ন্যাটো মিত্রদের কথা উল্লেখ করেননি। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেন, ট্রাম্পের প্রথম বক্তব্যে তার সরকার 'হতবাক' হয়েছে। তিনি এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লেখেন, 'আমাদের জাতি যে মূল্য দিয়েছে তা বিতর্কের ঊর্ধ্বে: ৫৩ জন ইতালীয় সেনা নিহত এবং ৭০০-এর বেশি আহত হয়েছেন। এই কারণে, আফগানিস্তানে ন্যাটো দেশগুলোর অবদানকে ছোট করে দেখানো মন্তব্যগুলো গ্রহণযোগ্য নয়, বিশেষ করে যখন তা একটি মিত্র দেশ থেকে আসে।'
