দীর্ঘদিন ট্রাম্পের টার্গেটে ছিলেন, অবশেষে হামলার শিকার ডেমোক্রেটিক প্রতিনিধি ইলহান ওমর
যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে একটি টাউন হল ইভেন্টে ডেমোক্র্যাটিক প্রতিনিধি ইলহান ওমরের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঘটনা আবারও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘ সময় ধরে করা সমালোচনা এবং বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যকে সামনে নিয়ে এসেছে।
ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার রাতে (২৭ জানুয়ারি) আইওয়াতে এক সমাবেশের পর। ওই সমাবেশে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিবাসন নিয়ে কথা বলার সময় ওমরের নাম উল্লেখ করেন। তিনি উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা অভিবাসীদের অবশ্যই দেশকে ভালোবাসা উচিত এবং যোগ করেন, 'ইলহান ওমরের মতো নয়।' তার এই মন্তব্যে দর্শকরা উল্লাসের সঙ্গে সাড়া দেন।
এর কিছুক্ষণ পরেই উত্তর মিনিয়াপোলিসে একটি কমিউনিটি ইভেন্টে অংশ নিচ্ছিলেন ওমর। তখন হঠাৎ এক ব্যক্তি মঞ্চের দিকে ছুটে এসে তার ওপর তীব্র গন্ধযুক্ত তরল স্প্রে করে। তবে, তিনি গুরুতর আহত হননি। হামলার সময় ওমর অভিবাসন আইন প্রয়োগ এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোমের পদত্যাগের দাবি নিয়ে কথা বলছিলেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল যখন সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হুমকির মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে অনেক আইনপ্রণেতা জনসভা সীমিত বা বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছেন। সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া মুসলিম নারী ওমর ২০১৮ সালে কংগ্রেসে নির্বাচিত হন এবং প্রতিনিধি পরিষদে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম দুই মুসলিম নারীর একজন। তাকে বছরের পর বছর চরম বিদ্বেষের মুখোমুখি হতে হয়।
আগে যখন হুমকির মাত্রা বেড়ে যেত, তখন তাকে ক্যাপিটল পুলিশের পক্ষ থেকে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা দেওয়া হতো। এই সুরক্ষা প্রদানের বিষয়টি হাউজ স্পিকারের বিবেচনার ওপর নির্ভর করে। তবে গত এক বছর ধরে তিনি এমন নিরাপত্তা পাচ্ছিলেন না। হামলার পর ওমর আনুষ্ঠানিকভাবে অতিরিক্ত নিরাপত্তার অনুরোধ জানান এবং হাউজ স্পিকার মাইক জনসন তা দিতে সম্মত হয়েছেন। এ তথ্য জানিয়েছে বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত সূত্র।
ওমরের প্রচারণাও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার খরচ মেটাতে তহবিল সংগ্রহের আবেদন জানিয়েছে, যা প্রায়শই তার জনসভায় থাকে। ঘটনার পরও তিনি নির্ধারিত কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন এবং পরদিন মিনিয়াপোলিসের একটি শপিং সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ওমর বলেন, তিনি ভয় পাননি এবং নিজেকে সহনশীল হিসেবে দেখেন। তিনি সংঘাতের মধ্যে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, গৃহযুদ্ধের কারণে মাত্র ৮ বছর বয়সে তিনি পরিবারের সঙ্গে সোমালিয়া থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসিত হওয়ার আগে ওমর কয়েক বছর কেনিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে কাটিয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার বক্তৃতা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ওমরের সমালোচনা করেছেন। প্রায়শই তিনি ওমরের পটভূমি ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তীব্র, ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করেছেন। সম্প্রতি এক মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি ওমরের বিষয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। ডিসেম্বরে পেনসিলভেনিয়ার এক সমাবেশে তিনি ওমরের আচরণের অভিযোগ তোলেন এবং প্রশ্ন তোলেন, কেন যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে অভিবাসী গ্রহণ করছে।
এই সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প তার 'ট্রুথ সোশ্যাল' প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, বিচার বিভাগ ওমরের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে এবং দাবি করেন, দেশে আসার পর থেকে ওমর বিপুল ব্যক্তিগত সম্পদের মালিক হয়েছেন। ওমরের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, তার স্বামী একজন ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট এবং তিনি লাখ লাখ ডলার আয় করেন। তবে প্রেসিডেন্ট যে পরিসংখ্যান উল্লেখ করেছেন, তার উৎস স্পষ্ট নয়। পূর্বে ওমরের অর্থের উৎস নিয়ে একটি তদন্ত প্রমাণের অভাবে থেমে গিয়েছিল।
নিবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমালি অভিবাসীদের সম্পর্কেও বিস্তৃত মন্তব্য করেছেন এবং অতীতে সমাবেশের ভিড়কে উসকানি দিয়ে ওমরকে তার জন্মভূমিতে ফেরত পাঠানোর স্লোগান দিতে উৎসাহিত করেছিলেন। তিনি ওমরের ব্যক্তিগত জীবন ও আইনি মর্যাদা সম্পর্কেও ভিত্তিহীন দাবি প্রচার করেছেন।
ওমর প্রকাশ্যে এসব অভিযোগের জবাব দিয়েছেন। একপর্যায়ে গুজব মোকাবিলায় তিনি তার বিবাহ এবং বিবাহবিচ্ছেদের ইতিহাসের একটি টাইমলাইন প্রকাশ করেছিলেন। অনলাইন বিভ্রান্তি বিশেষজ্ঞ নিনা জ্যানকোভিচের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ওমর সেইসব আইনপ্রণেতাদের মধ্যে অন্যতম, যাকে প্রায়শই লক্ষ্যবস্তু করা হয় এবং কয়েক বছর ধরে তিনি টানা অভিযোগ ও ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হচ্ছেন।
হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনের সব পক্ষ থেকেই প্রতিক্রিয়া এসেছে। প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ অনলাইনে বলেছেন, ওমর সম্পর্কে সাম্প্রতিক প্রকাশ্য বিবৃতিগুলো বৈরী পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। উত্তেজনা কমাতে চাইলে নেতাদের নিজেদের বক্তব্যের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েল ও মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি সম্পর্কিত অতীত মন্তব্যের কারণে ওমর উভয় দলের সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন। ২০১৯ সালে একটি মন্তব্যের জন্য তিনি ক্ষমা চেয়েছিলেন। ২০২১ সালে তিনি একটি বিবৃতি স্পষ্ট করেন, যেখানে মনে হয়েছিল তিনি মার্কিন সরকারের কর্মকাণ্ডকে জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
২০২৩ সালে আগের মন্তব্যের কারণে উদ্বেগের ভিত্তিতে হাউজ ওমরকে পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটি থেকে অপসারণের পক্ষে ভোট দেয়। সে সময় তিনি হাউজ ফ্লোরে বলেন, সিদ্ধান্ত যা-ই হোক, তিনি তার কাজ চালিয়ে যাবেন।
রিপাবলিকান প্রতিনিধি ন্যান্সি মেসও এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবে ওমরের সঙ্গে তার তীব্র মতপার্থক্য থাকলেও কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধির শারীরিক সহিংসতার শিকার হওয়া উচিত নয়।
হামলার পর ওমর অনলাইনে লিখেছেন, তিনি ভয় পাবেন না এবং তার দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবেন। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এই ঘটনা তাকে তার কাজ থেকে বিরত রাখতে পারবে না।
