ইরানের জলসীমার কাছে মার্কিন ‘নৌবহর’: হামলা হলে পরিণতি ভয়াবহ হবে, হুঁশিয়ারি তেহরানের
যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক হামলা চালায়, তাহলে তার 'গুরুতর পরিণতি' হবে—ক্রমাগত এ বিষয়ে সতর্ক করে চলছে ইরান। এদিকে, প্রাণঘাতী বিক্ষোভের জেরে দেশজুড়ে ইন্টারনেটের দীর্ঘস্থায়ী ব্ল্যাকআউটের মধ্যেই আরও অনেককে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
রোববার রাজধানী তেহরানের কেন্দ্রীয় এলাকার এঙ্গেলাব (বিপ্লব) স্কয়ারে একটি বিশাল বিলবোর্ড উন্মোচন করে তেহরান সিটি করপোরেশন। ইরানি জলসীমার কাছে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন সুপারক্যারিয়ার ও সহায়ক যুদ্ধবিমান মোতায়েনের প্রেক্ষাপটে এই বিলবোর্ডটিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিলবোর্ডটিতে একটি রণতরির ওপর থেকে দেখা দৃশ্য (বার্ডস-আই ভিউ) প্রদর্শিত হয়েছে, যেখানে ডেকের ওপর ধ্বংসপ্রাপ্ত যুদ্ধবিমান পড়ে আছে এবং সমুদ্রের পানিতে বয়ে চলা রক্ত মার্কিন পতাকার আকৃতি ধারণ করছে।
ফারসি এবং ইংরেজি ভাষায় লেখা একটি আনুষঙ্গিক বার্তায় বলা হয়েছে, 'তুমি যদি বাতাস বপন করো, তবে তোমাকে ঘূর্ণিঝড় কাটাতে হবে।'
সোমবার শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের মতো কোনো হামলার ক্ষেত্রে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আবারও যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার প্রস্তুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। একই সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি 'ব্যাপক এবং অনুশোচনা-জাগানিয়া জবাব' দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
একটি সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সতর্ক করে বলেন, এর ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তাহীনতা 'নিশ্চিতভাবেই সবাইকে প্রভাবিত করবে'। এমন এক সময়ে তিনি এই হুঁশিয়ারি দিলেন যখন বিভিন্ন আঞ্চলিক দেশগুলো সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে আবেদন জানাচ্ছে। উল্লেখ্য যে, গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেছিলেন, একটি মার্কিন 'বিশাল নৌবহর' পারস্য উপসাগরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, ইউরোপীয় পার্লামেন্টে একটি ভোটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-কে 'সন্ত্রাসী সংগঠন' হিসেবে তালিকাভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে। এ প্রসঙ্গে বাঘাই বলেন, তেহরান বিশ্বাস করে 'অধিকতর বিচক্ষণ ইউরোপীয় দেশগুলোর উচিত হবে সতর্ক থাকা, যাতে তারা এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপের বাইরের পক্ষগুলোর শয়তানি প্রলোভনের ফাঁদে না পড়ে।'
ইরানের তথাকথিত 'প্রতিরোধ অক্ষ'-এর (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স)-এ থাকা ইরানি শাসনব্যবস্থার অবশিষ্ট মিত্ররা—যারা গত জুনের যুদ্ধের সময় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি—তারাও এবার ইঙ্গিত দিয়েছে যে, সংঘাত শুরু হলে তারা মার্কিন ও ইসরায়েলের স্বার্থে আঘাত হানতে পারে।
ইরাকের ইরান-সমর্থিত কাতাইব হিজবুল্লাহর প্রধান আবু হোসেন আল-হামিদাউই সোমবার একটি কড়া বিবৃতিতে তিনি মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে 'সর্বাত্মক যুদ্ধের' হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। হিজবুল্লাহর নাঈম কাসেম সোমবারের এক ভাষণসহ বারবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
এদিকে, ইয়েমেনের হুথিরাও সোমবার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং এর আগে হামলার শিকার হওয়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলো দেখানো হয়েছে। এ ভিডিওর মাধ্যমে তারা ইঙ্গিত দিয়েছে, গাজায় হামলা বন্ধে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি থাকলেও এসব জাহাজ আবারও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
বিক্ষোভ-সংশ্লিষ্ট আরও গ্রেপ্তারের খবর
এদিকে, বিচার বিভাগীয় এবং গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ 'দাঙ্গাবাজদের' বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত রেখেছে। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া দেশব্যাপী বিক্ষোভের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থে কাজ করা 'সন্ত্রাসীদের' দায়ী করছে ইরান।
উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ গিলানের পুলিশ প্রধান মোহাম্মদরেজা রাহমানি রোববার এক বিবৃতিতে ৯৯ জনকে নতুন করে গ্রেপ্তারের ঘোষণা দেন।
তিনি অভিযোগ করেন, গ্রেপ্তারকৃতরা জনসাধারণের সম্পত্তি ধ্বংসের সাথে জড়িত ছিল এবং কেউ কেউ রাজপথে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্থিরতা সৃষ্টির 'নেতা' হিসেবে কাজ করেছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, অনলাইন পোস্টের মাধ্যমে মানুষকে, বিশেষ করে যুবসমাজকে বিক্ষোভে অংশ নিতে 'উসকানি দেওয়ার' অভিযোগে উত্তরাঞ্চলীয় শহর বান্দর আনজালি থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ), যারা এই বিক্ষোভের সময় পাঁচ হাজার ৮৪৮ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বলে দাবি করছে, তারা সোমবার জানিয়েছে, দেশজুড়ে অন্তত ৪১ হাজার ২৮৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তারের কোনো আনুষ্ঠানিক সংখ্যা ঘোষণা করেনি, তবে গত সপ্তাহে তারা জানিয়েছে যে বিক্ষোভে অন্তত তিন হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে দুই হাজার ৪২৭ জনকে 'নিরপরাধ' বিক্ষোভকারী বা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
আল জাজিরা স্বাধীনভাবে এই পরিসংখ্যানগুলো যাচাই করতে পারেনি।
সোমবার বিচার বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে এক বৈঠকে প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেন মহসেনি-এজেই তার সেই প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, বিক্ষোভ-সংক্রান্ত মামলার বিচারের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার 'দয়া' দেখানো হবে না।
তিনি ইরানের বিরুদ্ধে 'সর্বাত্মক যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক অবরোধ' চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার যে কোনো আহ্বানে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, 'কিছু মানুষ শত্রুর আগ্রাসন ও জবরদস্তি মোকাবিলার সব পথ রুদ্ধ বলে চিত্রিত করে এবং বারবার এক বিশ্বাসঘাতক শত্রুর সাথে আলোচনার পরামর্শ দেয়।'
ব্যবসায়ীদের জন্য নজরদারিভিত্তিক ইন্টারনেট সুবিধা
দেশজুড়ে ইরানিরা নজিরবিহীন এক সম্পূর্ণ ইন্টারনেট শাটডাউনের কবলে পড়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন, যা এখন প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলছে।
সীমিতসংখ্যক ব্যবহারকারী প্রক্সি এবং ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করে সংযোগ স্থাপনে সক্ষম হলেও, কর্তৃপক্ষ বাইরের বিশ্বের সাথে সংযোগ প্রদানকারী যে কোনো প্রক্সি ব্লক করা অব্যাহত রেখেছে।
আগের বিক্ষোভগুলোর মতোই, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের অনুমতি পেলেই কেবল ইন্টারনেট সংযোগ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব, কিন্তু কাউন্সিল ইরানের ৯ কোটি জনসংখ্যার এই দেশের ইন্টারনেট পুনরায় সচল করার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানায়নি।
এদিকে, রাষ্ট্র তার দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত 'স্তরভিত্তিক ইন্টারনেট' কার্যকর করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, যা কেবল সীমিতসংখ্যক অনুমোদিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ইন্টারনেট ব্যবহারের অনুমতি দেবে।
এই সপ্তাহে তেহরানে কর্তৃপক্ষ একটি ছোট অফিস স্থাপন করেছে, যেখানে ইরান চেম্বার অব কমার্সের পরিচয়পত্র থাকা ব্যবসায়ীরা সীমিত সময়ের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন।
কয়েক মিনিটের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারের অনুমতি পাওয়ার আগে তাদের একটি ফর্মে স্বাক্ষর করতে হচ্ছে, যেখানে তারা সংযোগটি কেবল 'ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে' ব্যবহারের অঙ্গীকার করছেন। একই সঙ্গে এতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, সুযোগের 'অপব্যবহার' করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই ধরনের একটি ছোট অফিস সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক সাংবাদিকদের জন্যও খোলা হয়েছে।
দেশের বাকি জনসংখ্যা কেবল একটি স্থানীয় 'ইন্ট্রানেট' ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। রাষ্ট্রের আরোপিত ইন্টারনেট বন্ধের সময় কিছু মৌলিক সেবা দেওয়ার জন্য এই নেটওয়ার্কটি তৈরি করা হলেও এর সংযোগ ধীরগতির এবং ত্রুটিপূর্ণ।
