ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যা: চ্যাটজিপিটির কাছে লাশ গুমের উপায় জানতে চেয়েছিলেন অভিযুক্ত
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যাটবট 'চ্যাটজিপিটি'র কাছে লাশ ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন। আদালতের একটি নথিতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
২৬ বছর বয়সী হিশাম আবুঘারবিহকে জামিল লিমন এবং নাহিদা বৃষ্টিকে হত্যার দায়ে 'ফার্স্ট-ডিগ্রি মার্ডার' বা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গত শুক্রবার লিমনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি অভিযুক্ত হিশামের রুমমেট ছিলেন, যিনি নিজেও ইউএসএফ-এর প্রাক্তন ছাত্র।
প্রসিকিউটরদের দাখিল করা নথিতে বলা হয়েছে, লিমন ও বৃষ্টিকে শেষবার জীবিত দেখার তিন দিন আগে, ১৩ এপ্রিল রাতে হিশাম চ্যাটজিপিটিকে প্রশ্ন করেন, 'কাউকে কালো প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে (ডাম্পস্টার) ফেলে দিলে কী হয়?' চ্যাটজিপিটি এর উত্তরে বলে যে এটি খুবই বিপজ্জনক। এর পর হিশাম পাল্টা প্রশ্ন করেন, 'তারা (তদন্তকারীরা) কীভাবে এটি খুঁজে বের করবে?'
তবে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ১৭ এপ্রিল হিশামের এক রুমমেট তাকে কিছু কার্ডবোর্ড বক্স তাদের অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের ডাস্টবিনে ফেলতে দেখেন। সেই ডাস্টবিন তল্লাশি করে পুলিশ লিমনের স্টুডেন্ট আইডি এবং তার নামের ক্রেডিট কার্ড উদ্ধার করে। সেখানে পাওয়া একটি ধুসর রঙের টি-শার্টের ডিএনএ পরীক্ষার পর লিমনের এবং একটি কিচেন ম্যাটের ডিএনএ বৃষ্টির জিনের সাথে মিলে যায়।
শুক্রবার পুলিশ টাম্পা বের ওপর অবস্থিত হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের পাশে একটি ভারী প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে লিমনের বিকৃত দেহাবশেষ উদ্ধার করে। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধারালো অস্ত্রের অসংখ্য আঘাতের কারণে লিমনের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ ধারণা করছে, নিখোঁজ বৃষ্টিও আর জীবিত নেই এবং হিশামই তার দেহ সরিয়ে ফেলেছেন।
রোববার তল্লাশিকালে কিছু মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হলেও তা এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তদন্তকারীরা জানান, হিশাম প্রথমে দাবি করেছিলেন যে তিনি ১৬ এপ্রিল লিমন ও বৃষ্টিকে ক্লিয়ারওয়াটার নামক জায়গায় নামিয়ে দিয়ে এসেছেন। কিন্তু লিমনের ফোনের লোকেশন ডেটা এবং সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হিশামের গাড়ি সেই রাতে হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজে দীর্ঘক্ষণ থেমে ছিল, যেখানে পরে লিমনের মরদেহ পাওয়া যায়।
তদন্তকারীরা আরও অভিযোগ করেছেন যে, হিশাম সেই রাতে বড় ডাস্টবিন ব্যাগ, লাইসল (পরিষ্কারক) এবং সুগন্ধি স্প্রে (ফেব্রেজ) কিনেছিলেন এবং তার অ্যাপার্টমেন্টে রক্তের দাগ পাওয়া গেছে। এছাড়া তিনি বৃষ্টির ব্যবহৃত গোলাপী রঙের ফোন কভারসহ বেশ কিছু জিনিসও ফেলে দিয়েছিলেন।
হিশামের পক্ষে লড়ছেন হিলসবোরো কাউন্টি পাবলিক ডিফেন্ডার অফিসের হোমিসাইড ব্যুরো প্রধান জেনিফার স্প্র্যাডলি। তিনি একটি ইমেইলের মাধ্যমে জানিয়েছেন যে এই বিষয়ে তাদের কোনো মন্তব্য নেই।
তদন্তকারীরা জানান, হিশামকে যখন প্রথম জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তখন তার বাঁ হাতের কনিষ্ঠা আঙুলে একটি ক্ষত দেখা যায় এবং পরে তার পায়েও জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়। তিনি দাবি করেছিলেন যে পেঁয়াজ কাটার সময় দুর্ঘটনাবশত এই জখম হয়েছে।
আদালতের রেকর্ড অনুযায়ী, হিশামের বিরুদ্ধে হত্যা ছাড়াও শারীরিক নির্যাতন, বেআইনি আটক, মৃত্যুর খবর না দেওয়া, মৃতদেহ সঠিক স্থানে না রাখা এবং আলামত নষ্ট করার অভিযোগ আনা হয়েছে। বর্তমানে তিনি জামিন ছাড়াই হিলসবোরো কাউন্টি জেলে আটক আছেন। আগামী মঙ্গলবার তার মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
নিহত জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি দুজনেই বাংলাদেশের নাগরিক। নিহতদের স্বজনরা এনবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, তারা পরষ্পরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে ছিলেন। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, যেন লিমন ও বৃষ্টির মরদেহ ইসলামি শরিয়াহ ও ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন করা হয়। তারা আরও আশা প্রকাশ করেন যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেন এই দুই শিক্ষার্থীর নামে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে।
ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ফ্লোরিডা এক বিবৃতিতে দুই শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছে।
