হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ‘টোল’ দিতে হবে না, তবে ‘ফি’ দিতে হবে: ইরান
রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে এবং এটি 'স্থায়ীভাবে টোলমুক্ত' থাকবে। তবে সোমবার ইরানের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে তারা নির্দিষ্ট কিছু 'সেবার' বিনিময়ে ফি আদায় করতে চায়।
এই নিয়ম যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলে আগের তুলনায় বাড়তি খরচ ও জটিলতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক জলপথ ব্যবস্থাপনায় একটি বিপজ্জনক নজিরও স্থাপন করতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, 'ইরান ট্রানজিট টোল আরোপ করতে চায় না; তবে প্রদত্ত সেবার বিনিময়ে ফি নেওয়া হবে।'
তবে কী ধরনের সেবা দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট নয়। ইরানের কিছু কর্মকর্তার ধারণা, পরিবেশগত সুরক্ষার খরচ হিসেবে এই ফি নির্ধারণ করা হতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। টোল হলো পারাপারের জন্য আদায়কৃত অর্থ। আর ফি হলো নির্দিষ্ট সেবার বিনিময় মূল্য, যেমন বন্দরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক অর্থে টোল বসানো আন্তর্জাতিক আইনে গ্রহণযোগ্য নয়, বিশেষ করে এমন একটি প্রাকৃতিক জলপথে যা দীর্ঘদিন ধরে উন্মুক্ত। তবে সেবার নাম দিয়ে ফি আরোপ করলেও তা বৈধ হয়ে যায় না।
নৌ-আইন বিশেষজ্ঞ জেমস আর. হোমস বলেন, 'আন্তর্জাতিক আইনে কোনো উপকূলীয় রাষ্ট্রের জন্য প্রাকৃতিক জলপথে চলাচলের জন্য অর্থ আদায়ের কোনো বিধান নেই, আপনি এটিকে টোল বলুন বা ফি—যাই বলুন না কেন।'
তিনি উদাহরণ হিসেবে মালাক্কা প্রণালি ও তাইওয়ান প্রণালি-এর কথা উল্লেখ করে বলেন, এসব পথে এমন কোনো ফি নেই।
তবে তিনি আরও বলেন, কৃত্রিম জলপথ যেমন পানামা খাল বা সুয়েজ খাল-এ সেবার বিনিময়ে অর্থ আদায় করা হয়, কারণ সেখানে অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে ফি নেওয়ার ধারণাটি প্রথম সামনে আসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে সামরিক হামলার পর, যার জবাবে ইরান আঞ্চলিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়।
এরপর মার্চে ইরান জানায়, তারা এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ফি আরোপ করবে। মে মাসে তারা 'পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি' গঠন করে, যা নিরাপদ চলাচলের অনুমতি ব্যবস্থাপনা করবে বলে জানানো হয়।
ইরান ও প্রতিবেশী দেশ ওমান মে মাসে একটি সম্ভাব্য পেমেন্ট সিস্টেম নিয়েও আলোচনা করে, যা মূলত সেবার বিনিময়ে ফি ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে গঠিত হতে পারে।
বিশ্ব নেতাদের মধ্যে এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেন, 'আমরা আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা করি এবং চেষ্টা করব যেন এই জলপথে কোনো টোল আরোপ না হয়।'
অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সম্ভাব্য টোলের ধারণার সমালোচনা করেছেন। তবে তিনি একসময় এমনও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এই প্রণালি থেকে অর্থ আদায় করতে পারে বা রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়ও থাকতে পারে।
মে মাসে তিনি আবার স্পষ্টভাবে বলেন, 'আমরা চাই এটি ফ্রি থাকুক, কোনো টোল চাই না।'
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত মাসে এ ধরনের ফি আরোপের ধারণা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, 'এটি হতে পারে না। এটি গ্রহণযোগ্য নয়। এমন হলে কোনো কূটনৈতিক সমঝোতাই সম্ভব হবে না।'
