বছরের পর বছর ধরে কর ফাঁকি: প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার গোপন সম্পদ শনাক্ত
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা কর ফাঁকির চর্চা এখন তদন্তের আওতায় আসতে শুরু করেছে। গত এক বছরে ৩,১০০–এর বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার গোপন সম্পদ ও আয় শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ ট্যাক্স ইন্টেলিজেন্স।
কর্মকর্তারা বলছেন, এর বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনামলের সুবিধাভোগীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ফলে আরও বিস্তৃত তদন্ত শুরুর আগেই—যাদের ফাঁকি উদ্ঘাটন হচ্ছে, তাদের অনেকে গোপনে এসে দেনদরবার করে করের টাকা পরিশোধে তৎপর হয়ে উঠেছেন।
এই প্রবণতা নিশ্চিত করে আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের কমিশনার মো. আবদুর রাকিব গতকাল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড–কে বলেন, গত এক বছরে গোপন সম্পদ ও আয় শনাক্ত হওয়ার পর ২১৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কর ফাঁকির দায়ে মোট ৩৮০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে।
তিনি বলেন, "আমরা এপর্যন্ত যে পরিমাণ লুকিয়ে রাখা সম্পদ ও আয়ের সন্ধান করেছি, তার পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। এসব আয় থেকে সরকারের প্রকৃত ট্যাক্স ও জরিমানার অর্থ আদায় করা সম্ভব হলে তার পরিমাণ প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকা হবে।"
"এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমপক্ষে ৩,১০০" – জানিয়ে তিনি বলেন, "তদন্ত চলমান রয়েছে। এ সংখ্যা আরো বাড়বে।"
ট্যাক্স ইন্টেলিজেন্স অফিস ছাড়াও এনবিআরের আওতাধীন সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) এবং কাস্টমস ইন্টেলিজেন্স এন্ড ইনভেস্টিগেশন ইউনিটও—কিছু বড় ও আলোচিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি এবং অর্থপচার তদন্ত করছে। এসব তদন্তেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কর ফাঁকির প্রমাণ পাওয়া গেছে – যা আলোচ্য সম্পদের বাইরে।
ট্যাক্স ইন্টেলিজেন্স অফিসের সূত্রগুলো জানিয়েছে, আয় ও সম্পদ গোপন করায় অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি বাণিজ্যিক গ্রুপ এবং এগুলোর পরিচালকরাও রয়েছেন।
ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকায় বিভিন্ন কোম্পানির পরিচালক ছাড়াও ট্রাভেল এজেন্সি, ফার্ম ও ব্যবসায়ীরা রয়েছেন। এছাড়া পদ্মা সেতুসহ মেগা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকা সরকারি ও বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, এবং শেয়ারবাজার কারসাজির সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিও রয়েছেন।
এ তালিকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাজনৈতিক ব্যক্তি রয়েছেন, যারা গত আওয়ামী লীগ সরকারের সকরারের সময়ে অবৈধ অর্থ উপার্জন করেছেন বলে আলোচনা রয়েছে।
এছাড়া সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা রয়েছেন, যেখানে বাদ যাননি খোদ আয়কর ও কাস্টমস বিভাগে কাজ করা কর্মকর্তা–কর্মচারীরাও।
শনাক্তদের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডার, পুলিশ, বিচার বিভাগ, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর, পাসপোর্ট অফিস, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও আছেন।
এছাড়া ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিকও বাদ যাননি সম্পদের গোপনের এ তালিকা থেকে।
মো. আবদুর রাকিব বলেন, সরকারি বিভিন্ন সংস্থার বর্তমান ও সাবেক অন্তত ২০০ জন ইঞ্জিনিয়ার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের গোপন করা সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ২৫ জনের বেশি দায় স্বীকার করে দাবি করা করের টাকা গোপনে পরিশোধ করে গেছেন।
কেবল এসব ব্যক্তি নন, এ তালিকায় আরও রয়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা ব্যক্তিদের নির্ভরশীল পরিবারের সদস্য যেমন বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী ও শ্বশুর-শাশুড়িও।
অবশ্য ট্যাক্স ইন্টেলিজেন্স অফিস সম্পদ গোপন করায় অভিযুক্ত, বা ইতিমধ্যে দায় স্বীকার করে ট্যাক্স পরিশোধ করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করতে রাজি হয়নি।
কর্মকর্তারা জানান, তাদের অনুসন্ধানে একটি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১,২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত করফাঁকির তথ্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। এছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠান ফাঁকি দেওয়া আয়ের উপর অর্থ পরিশোধ করেছে, তার মধ্যে একটির সর্বোচ্চ ৫০ কোটি টাকাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, যেসব ব্যক্তির সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে, তা মূলত জমি, অ্যাপার্টমেন্ট ও গাড়িতে বিনিয়োগ করা ছিল।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ডাকভবনে অবস্থিত ট্যাক্স ইন্টেলিজেন্স এর অফিসে সরেজমিন গিয়ে কর ফাঁকিতে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি আইনজীবীদের ব্যাপক আনাগোনাও দেখা যায়।
সংস্থাটি বলছে, তাদের তদন্ত কার্যক্রম চলমান এবং আগামী দিনগুলোতে, অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনের পর পরবর্তী সরকারের সমর্থন পেলে আরো বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের গোপন করা সম্পদ ও আয় উন্মোচন করা সম্ভব হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) –এর আওতাধীন আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট (আইটিআইআইইউ) সূত্র জানিয়েছে, যাদের ফাঁকি উদ্ঘাটন হচ্ছে, তাদের উল্লেখযোগ্য অংশই গোপনে এসে দেনদরবার করে ট্যাক্সের টাকা পরিশোধ করে যাচ্ছেন, জানাজানি হওয়ার ভয়ে।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, সন্ধান পাওয়া এসব সম্পদের বেশিরভাগই অবৈধ। কর বিভাগের বাইরে অন্যান্য বিভাগ বা সংস্থা তদন্ত করলে এসব সম্পদের উৎস খুঁজে বের করা সম্ভব। যার দায়ে পুরো সম্পদ বাজেয়াপ্ত হওয়ার পাশাপাশি সর্বোচ্চ ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হওয়ার মতো শাস্তিও হতে পারে।
গোপন সম্পদের ওপর কর কীভাবে নির্ধারণ হয়
বাংলাদেশের বিদ্যমান আয়কর আইনের কোনো সম্পদ থেকে যদি আয় না হয়, তাহলে আয়কর হওয়ার বিধান নেই। কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যদি লুকানো সম্পদের সন্ধান পাওয়া যায়, যা ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তার ট্যাক্স ফাইলে প্রদর্শন করেনি – তাহলে সেটি আয় হিসেবে গণ্য করা হয়। এবং যে বছরের সম্পদ লুকানো হয়েছে, ওই বছরের আয়কর হার অনুযায়ী তার আয়কর হিসাব করা হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যক্তির বিভিন্ন হারে আয়কর রয়েছে, যার সর্বোচ্চ হার ৩০ শতাংশ। তবে দুই বছর আগপর্যন্ত এই হার ছিল ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। সাধারণত যাদের গোপন সম্পদ উদ্ঘাটন হচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ হারই কার্যকর হয়। এর সঙ্গে জরিমানাও যুক্ত হয়।
আইন অনুযায়ী, এক বছর আগে লুকানো সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেলে—প্রযোজ্য করের উপর ১০ শতাংশ জরিমানা দিতে হয়, দুই বছর আগের হলে ২০ শতাংশ। এভাবে যত বছর পেছনের সম্পদ পাওয়া যাবে, তার উপর ১০ শতাংশ করে জরিমানা বাড়তে থাকে, এবং সর্বোচ্চ জরিমানা হয় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত।
ধরা যাক, কোনও ব্যক্তি ছয় বছর আগের অর্জন করা পাঁচ কোটি টাকার সম্পদ ট্যাক্স ফাইলে দেখাননি। তাহলে ওই বছর যদি কর হার ২৫ শতাংশ হয় এবং প্রযোজ্য করের উপর ৫০ শতাংশ জরিমানা হয়; তাহলে তার কর হবে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং জরিমানা হবে সাড়ে ৬২ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে তাকে দিতে হবে ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকার সামান্য বেশি।
সন্ধান পাওয়া সম্পদ কি বৈধ ছিল?
এনবিআর কর্মকর্তারা মনে করছেন, যেসব সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে, তা অবৈধ উপায়ে অর্জিত। কিন্তু আয়কর আইন অনুযায়ী কর কর্তৃপক্ষ কেবল কর আদায়ের বিষয়টি দেখে—সম্পদ বৈধ না অবৈধভাবে অর্জিত, তা নির্ধারণ তাদের এখতিয়ারভুক্ত নয়।
এই দায়িত্ব দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-সহ সরকারের অন্যান্য সংস্থার।
ফলে যে ৩,১০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে; সেগুলো কীভাবে অর্জিত হয়েছে, তা খুঁজে বের করার দায়িত্ব দুদকসহ অন্যান্য সংস্থার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুদক যদি এসব বিষয়ে খোঁজ নেয়, তাহলে সম্পদ অবৈধ উপায়ে অর্জিত হয়েছে কি-না — তা বের করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত সরকারের সময়ে যে দুর্নীতির বিস্তার হয়েছিল, এর ফলে সরকারি ও বেসরকারি খাতের লোকজন বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছে। এসব সম্পদের বড় অংশই দেশের বাইরে চলে গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদেনও সম্পদ পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ১৫ বছরে দেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নিজেই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তার অফিসে নিম্নপদে (পিয়নের) কাজ করা এক ব্যক্তি ৪০০ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।
অবশ্য এসব অর্থের সবই যে অবৈধ উপায়ে অর্জিত হয়েছে, তা-ও নয়। অনেকে হয়তো নিজের জমি বিক্রি করেছেন বা বৈধভাবে আয় করলেও সেটি ট্যাক্স ফাইলে দেখাননি—কর বিভাগের হয়রানি এড়াতে। এমন সম্পদ বা অর্থের সন্ধান পাওয়া গেলে তার ওপরও কর প্রযোজ্য হয়।
এনবিআরের সাবেক সদস্য ড. সৈয়দ মো. আমিনুল করিম টিবিএস–কে বলেন, "করজালের মধ্যে ঢুকলেই বিপদ – এমন আশঙ্কায় অনেকে বৈধ অর্থও ট্যাক্স ফাইলে দেখান না।"
"কিন্তু যারা অবৈধ অর্থ আয় করছেন, তারা অত্যন্ত চতুর। তাদের সম্পদ দেশে-বিদেশে এমনভাবে লুকানো, যা খুঁজে বের করা কঠিন" –যোগ করেন তিনি।
তদন্তে নামা উচিত দুদকের: টিআইবি
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)–এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান টিবিএস–কে বলেন, "যেসব অবৈধ সম্পদ উদ্ধার হয়েছে, তার উল্লেখযোগ্য অংশই অবৈধ উপায়ে অর্জিত বলে ধারণা করা যায়। কর গোয়েন্দার উচিত হবে এসব তথ্য দুদকের হাতে দেওয়া, যাতে বিস্তারিত তদন্ত করে তা বের করা যায়।"
তিনি বলেন, "যদি অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ হয়ে থাকে, কিন্তু কেবল কর দিয়ে পার পেয়ে যায়, তাহলে তা হবে 'গুরু পাপে লঘু দণ্ড'। তদন্ত করে অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পেলে দেশে প্রযোগ্য আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া উচিত।"
দুদক আইন অনুযায়ী, অবৈধ সম্পদ অর্জন করলে ওই সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। যদিও বাংলাদেশে এ ধরণের শাস্তির নজির খুবই বিরল।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, এসব সম্পদ অবৈধভাবে অর্জনে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যারাই সহায়তা করেছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা উচিত।
