খুচরা বিক্রেতাদের ওপর উৎসে কর বসানোর উদ্যোগ সরকারের, লক্ষ্য অতিরিক্ত ৬,০০০ কোটি টাকার রাজস্ব
করের আওতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে এবার খুচরা ব্যবসায়ীদেরর উপর নজর দিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে পণ্য সরবরাহের পয়েন্টে ০.২০ শতাংশ নতুন উৎসে কর আরোপের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কর্মকর্তা ও খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এ প্রক্রিয়ায় বছরে অন্তত ৬,০০০ কোটি টাকার বাড়তি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, যেসব ডিলার খুচরা দোকানে পণ্য সরবরাহ করেন, তারা পণ্য বিক্রির মূল্যের ওপর ভিত্তি করে ডিস্ট্রিবিউশন বা সরবরাহ পয়েন্টে এই কর সংগ্রহ করবেন।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগে ইতিমধ্যেই অর্থমন্ত্রীর সবুজ সংকেত মিলেছে এবং আগামী জুন মাসে পেশ হতে যাওয়া বাজেট বক্তৃতায় এটি অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। প্রস্তাবিত এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো করের আওতা বাড়ানো এবং খুচরা বিক্রেতাদের কর পরিপালন (ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স) ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো।
বর্তমানে কোম্পানিগুলোকে বার্ষিক বিক্রির ওপর ন্যূনতম ১ শতাংশ টার্নওভার ট্যাক্স দিতে হয়। অন্যদিকে ডিলাররা তাদের কমিশনের ওপর ১ শতাংশ উৎসে কর এবং ০.২৫ শতাংশ টার্নওভার ট্যাক্স দিয়ে থাকেন। নতুন এই করটি বিদ্যমান করের অতিরিক্ত হিসেবে যুক্ত হবে এবং এটি মূলত খুচরা লেনদেনকে লক্ষ্য করে আরোপ করা হচ্ছে। এই কর সংগ্রহের মূল দায়িত্ব থাকবে ডিলার ও সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থার সাথে যুক্ত পক্ষগুলোর ওপর।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের সহায়তায় 'এ-চালান' (A-Challan) নামের একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে এই কর সংগ্রহ করা হবে। প্রস্তাবিত পদ্ধতি অনুযায়ী, ডিলার পর্যায়ে সংগৃহীত কর ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে। আর খুচরা বিক্রেতাদের মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে ট্র্যাক করা হবে এবং তাদের সাময়িক বা নিয়মিত এসএমএস আপডেটের মাধ্যমে জানানো হবে।
বাস্তবায়ন ও কর পরিপালন নিয়ে উদ্বেগ
টিবিএস-এর সাথে আলাপকালে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং কর বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে, প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থা ডিস্ট্রিবিউটর বা পরিবেশকদের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে এবং এর ফলে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নেসলে বাংলাদেশের লিগ্যাল অ্যান্ড কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর দেবব্রত রায় চৌধুরী বলেন, খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কর সংগ্রহ করা বড় ধরনের পরিচালনগত (অপারেশনাল) চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এছাড়া এটি ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য হয়রানির ঝুঁকি বাড়াবে, যাদের অনেকেরই কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন নেই।
তিনি বলেন, এই ধরনের কর সংগ্রহ কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে এবং পরিবেশকরা এই অতিরিক্ত দায়িত্ব বা প্রশাসনিক বোঝা সামলাতে পারবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি উল্লেখ করেন, নেসলে বাংলাদেশ একাই দেশব্যাপী প্রায় ৬ লাখ খুচরা বিক্রেতার সাথে কাজ করে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের নির্বাহীরা জানিয়েছেন, দেশব্যাপী তাদের প্রায় ২২,০০০ ডিলার রয়েছে, যারা প্রায় ১৫ লাখ খুচরা বিক্রেতার কাছে পণ্য সরবরাহ করে থাকে। তারা সতর্ক করে বলেন, ডিস্ট্রিবিউশন বা বিতরণ পর্যায়ে কর সংগ্রহের দায়িত্ব যুক্ত করা হলে তা পরিচালন ব্যয় (অপারেশনাল কস্ট) উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সরাসরি পৌঁছানো কঠিন হওয়ার কারণে সরকার হয়তো ডিস্ট্রিবিউটর বা পরিবেশকদের মাধ্যমে আদায় করতে চাইছে। তবে এর ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার (সাপ্লাই চেইন) ওপর চাপ বাড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন।
করের পরিধি বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা
কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রস্তাবিত এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আগে নথিপত্র বা হিসাবের বাইরে থাকা খুচরা ব্যবসাকে করের আওতায় এনে জাতীয় করের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হতে পারে।
আয়কর বিশেষজ্ঞ এবং এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ম্যানেজিং পার্টনার স্নেহাশিষ বড়ুয়া বলেন, পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে কর সংগ্রহ করা হলে— তা অনানুষ্ঠানিক খুচরা খাতের লেনদেনগুলোকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং কর পরিপালন (কমপ্ল্যায়েন্স) ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে সাহায্য করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, পাইকারি ক্রয়ের নথিপত্র বা ডকুমেন্টেশন উন্নত হলে তা ছোট খুচরা বিক্রেতাদের অপ্রদর্শিত আয় সামনে নিয়ে আসবে। এর ফলে কর প্রদানকারী সুপারমার্কেটগুলোর সাথে একটি ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে। এছাড়া এই ব্যবস্থাটি মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট কাঠামোর মধ্যে ডেটা ইন্টিগ্রেশন বা তথ্য সমন্বয়ের উন্নয়ন ঘটাতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন)ধারী রয়েছেন, যাদের মধ্যে মাত্র ৪৫ লাখের মতো করদাতা রিটার্ন দাখিল করেন। এই রিটার্ন দাখিলকারীদের একটি বড় অংশই 'শূন্য রিটার্ন' (কোনো করযোগ্য আয় নেই) জমা দেন বলে জানা গেছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, দেশব্যাপী প্রকৃতপক্ষে মাত্র ১৫ লাখের মতো ব্যক্তির কাছ থেকে কার্যকরভাবে কর আদায় করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) 'হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে ২০২৪' (খানা আয় ও ব্যয় জরিপ)-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ অর্থনৈতিক ইউনিট বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, অবশ্য এই সংখ্যার মধ্যে ছোট–বড় সবাই অন্তর্ভূক্ত রয়েছে।
কর আদায়ের প্রক্রিয়া ও চালুর পরিকল্পনা
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে খুচরা বিক্রেতাদের পণ্য সরবরাহকারী ডিলারদের মাধ্যমে এই কর কার্যকর করা হবে। দেশব্যাপী আনুমানিক ১ কোটি খুচরা বিক্রেতার মধ্যে, প্রথম ধাপে প্রায় ৫০ লাখ বিক্রেতাকে এর আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কোনো খুচরা বিক্রেতা যদি একাধিক কোম্পানির কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করেন, তবে প্রতিটি বিতরণ বা ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্টে প্রতি হাজার টাকার পণ্য মূল্যের বিপরীতে ২ টাকা হারে কর সংগ্রহ করা হবে।
প্রতি তিন মাস অন্তর এসএমএস আপডেটের মাধ্যমে খুচরা বিক্রেতাদের জানানো হবে, তাদের পক্ষ থেকে কত টাকা কর সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া যদি অতিরিক্ত কর কেটে নেওয়া হয়, তবে বছরের শেষে রিটার্ন দাখিল করে রিফান্ড বা ফেরত দাবি করা যাবে; তবে এর জন্য সংশ্লিষ্ট খুচরা বিক্রেতার কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকতে হবে।
পণ্যের দাম বাড়বে?
ব্যবসায়ী নেতা এবং বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই করের বোঝা যদি সরবরাহ ব্যবস্থার (সাপ্লাই চেইন) মধ্য দিয়ে স্থানান্তরিত হয়, তবে তা ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
তারা যুক্তি দেন যে, খুচরা বিক্রেতারা তাদের মুনাফার মার্জিন বা লাভ ঠিক রাখতে— এই অতিরিক্ত কর পণ্যের মূল্যের সাথে যোগ করতে পারেন। এর ফলে নিত্যব্যবহার্য ভোগ্যপণ্য (এফএমসিজি), সিমেন্ট, স্টিল, লোহাজাতীয় পণ্য, আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী এবং ওষুধসহ বিভিন্ন খাতের পণ্যের জন্য ভোক্তাদের বাড়তি খরচ গুনতে হতে পারে।
অবশ্য এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, এ কারণে পণ্যের দাম বাড়ার কারণ নেই। কেননা খুবই সামান্য কর আরোপ করা হচ্ছে এবং বছর শেষে ব্যবসায়ীর করযোগ্য আয় না হলে–সমন্বয় ও রিফান্ডের সুযোগ থাকবে। তাছাড়া এই ব্যবস্থাটি খরচ বাড়ানোর জন্য নয়, বরং কর পরিপালন (কমপ্ল্যায়েন্স) ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্যই ডিজাইন করা হয়েছে।
