জমি বন্ধক দিতে বেক্সিমকোর আপত্তি, মেয়াদ ফুরানোর মুখে ঝুঁকিতে ৩,০০০ কোটি টাকার সুকুক
সম্পদ-সমর্থিত (অ্যাসেট-ব্যাকড) বন্ড হিসেবে প্রচার করা হলেও—বেক্সিমকোর ৩,০০০ কোটি টাকার গ্রিন সুকুকটি এর মূল প্রকল্পের জমি হস্তান্তর না করেই ইস্যু করা হয়েছিল। এই ত্রুটির কারণে এখন বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে এবং সুকুকের টাকা খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে বন্ডটির ট্রাস্টি ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) ১০০ একর জমি অবিলম্বে বন্ধক রাখার দাবি জানাতে বাধ্য হয়েছে।
কিন্তু আইনি জটিলতা ও গভর্ন্যান্সের সীমাবদ্ধতার অজুহাত দেখিয়ে সোলার পার্কের জমির বন্ধকি দলিল সম্পাদনে আপত্তি জানিয়েছে বেক্সিমকো। এর ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবি এখন সুকুকটির কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা এবং বন্ডটির মেয়াদ ২০৩২ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
বেক্সিমকো সোলার প্রকল্পগুলোর জমি বন্ধক রাখার দলিল সম্পাদনে আপত্তি জানানোর পর, গত ৩০ জুন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে এই প্রস্তাবগুলো তুলে ধরে আইসিবি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এসব চিঠি ও নথিপত্রের অনুলিপি দেখেছে।
বিনিয়োগকারীর স্বার্থ রক্ষায় বন্ধকি চায় ট্রাস্টি
সুকুকে সম্ভাব্য খেলাপি হওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আইসিবি মূল ভূ-সম্পত্তির ওপর জামানত বা নিরাপত্তা তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আইসিবি তিস্তা সোলার ও করতোয়া সোলার প্রকল্পের ভূমির মালিকানার নথিপত্র যাচাই করেছে। মোট ৬৫০ একর জমির মধ্যে ১২৫ একর জমির খাজনাও পরিশোধ করে আইসিবি।
বেক্সিমকোর সুকুকটিতে ২২টি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক এবং তাদের বেশ কয়েকটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান বড় অংকের বিনিয়োগ করায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পদক্ষেপ নিয়েছিল।
যাচাইকরণ প্রক্রিয়া শেষে আইসিবি 'বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক ট্রাস্ট'-এর অনুকূলে বন্ধক রাখার জন্য ১০০ একর জমি উপযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করে এবং কোম্পানির কাছে একটি মর্টগেজ ডিড বা বন্ধকির দলিল পাঠায়।
সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে আইসিবি সতর্ক করে দিয়েছে যে, বেক্সিমকো গ্রুপের আর্থিক সংকট, টেক্সটাইল ইউনিটসমূহের দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম স্থগিত থাকা, প্রত্যাশিত নগদ প্রবাহের ঘাটতি, করতোয়া সোলার প্রকল্প পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং বিকল্প অর্থায়নের সীমিত সুযোগের মতো বেশ কয়েকটি কারণে, ডিসেম্বর ২০২৬-এ নির্ধারিত বেক্সিমকো লিমিটেডের সুকুকের ফাইনাল রিডেম্পশন বা অর্থ পরিশোধকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে ইস্যু করা পাঁচ বছর মেয়াদী এই ইসলামিক বন্ডটি পুঁজিবাজার থেকে ৩,০০০ কোটি টাকা তুলেছিল। বন্ডটিতে বিনিয়োগকারীর বড় অংশই হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী– ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
বর্তমানে বকেয়া থাকা ২,৮০৯ কোটি টাকার মধ্যে প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ ৯৭.৭২ শতাংশ, আর ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের অংশ মাত্র ২.২২৮ শতাংশ।
আইনি জটিলতার অজুহাত বেক্সিমকোর
বেক্সিমকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান কায়সার চৌধুরী স্বাক্ষরিত আইসিবি-কে পাঠানো ২০ মে-র এক চিঠিতে যুক্তি দেওয়া হয়, সুকুক পরিচালনাকারী বিদ্যমান ট্রাস্ট ডিডে বন্ধকের মাধ্যমে অতিরিক্ত জামানত বা নিরাপত্তা তৈরির কোনো বিধান নেই। কোম্পানিটি জানায়, সুকুকের কাঠামো তৈরির সময় এই ধরনের ব্যবস্থা বিবেচনা বা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
বেক্সিমকো আরও বলে যে, প্রকল্পের জমিতে যেকোনো ধরনের বন্ধক রাখতে হলে ট্রাস্ট ডিডে সংশোধন, আইনি ভেটিং, শরিয়াহ বোর্ডের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্পোরেট বোর্ডের সম্মতি প্রয়োজন। কোম্পানিটি এ যুক্তিও দাঁড় করায় যে, বেক্সিমকোর পর্ষদ গঠন সংক্রান্ত রিট পিটিশন বিচারাধীন থাকায় বর্তমানে পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক অনুষ্ঠান করা সম্ভব হচ্ছে না।
কোম্পানিটি আরও উল্লেখ করেছে যে, যেকোনো বন্ধকি ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত রেজিস্ট্রেশন খরচ আইসিবিকে বহন করতে হবে এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছে প্রাপ্য অর্থ থেকে তা কাটা যাবে না।
সুকুকের মেয়াদ ছয় বছরের বাড়ানোর আবেদন আইসিবির
বিএসইসি-কে দেওয়া পৃথক এক চিঠিতে আইসিবি সুকুকের চূড়ান্ত পরিশোধের সময়সীমা ২০৩২ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন জানায়। বেক্সিমকোর চলমান আর্থিক সংকট এবং কয়েকটি টেক্সটাইল ইউনিট বন্ধ থাকায়—বন্ড পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে যুক্তি দেয় সংস্থাটি।
বেক্সিমকো গ্রুপকে দেওয়া ঋণ আদায়ের বিষয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের পর—ডেপুটি গভর্নর মোহাম্মদ কবীর আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই প্রস্তাবটি করা হয়।
কমিটি সুকুকের মেয়াদ ২০৩২ সাল পর্যন্ত বাড়ানো, মেয়াদের কাঠামোয় পরিবর্তন আনা, স্পেশাল পারপাস ভেহিকলের (এসপিভি) অনুকূলে সোলার পার্কগুলোর স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রাখা, প্রকল্পগুলোর অর্ধ-বার্ষিক আর্থিক বিবরণী প্রকাশ করা, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে করতোয়া সোলার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা এবং সিঙ্কিং ফান্ডের অর্থ সরকারি সুকুক ইন্সট্রুমেন্টে বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করার সুপারিশ করে।
বিনিয়োগকারীরা কেন শেয়ার রূপান্তরে অনাগ্রহী
সুকুকটির কাঠামো অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীদের প্রতি বছর তাদের ধারণ করা সুকুকের অন্তত ২০ শতাংশ বেক্সিমকোর শেয়ারে রূপান্তর (কনভার্ট) করার কথা ছিল। তবে তিন বছরে প্রত্যাশিত ৬০ শতাংশ রূপান্তরের জায়গায় পুঞ্জীভূত রূপান্তর মাত্র ৬.৩৭ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৯০.৭৫ কোটি টাকা শেয়ারে রূপান্তরিত হয়েছিল; তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে কার্যত আর কোনো কনভার্সন ঘটেনি।
আইসিবির মতে, সুকুক রূপান্তর মূল্য এবং বেক্সিমকোর শেয়ারের বাজারমূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধানের কারণেই বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হয়েছেন। যদিও এই বন্ড বার্ষিক ২৫ শতাংশ ছাড়ে শেয়ার রূপান্তরের সুযোগ দেয়, তবে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা সম্পর্কিত উদ্বেগ এবং অর্ধ-বার্ষিক নিশ্চিত মুনাফার (সুদ আয়ের) সুযোগ থাকায়- প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা মূলত বন্ড ধরে রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন।
আইসিবি জানায়, ২০২৫ সালে মাত্র ৩৫০টি সুকুক ইউনিট ৪২০টি শেয়ারে রূপান্তরিত হয়েছে; যেখানে চাঙ্গা পুঁজিবাজারের সময়ে ২০২২ সালে ১.৭ কোটি ইউনিট শেয়ারে রূপান্তর করা হয়েছিল।
সুকুকটি বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের অর্ধ-বার্ষিক ভিত্তিতে বার্ষিক ৯ শতাংশ মুনাফা (সুদ) পরিশোধ করে আসছে। এ পর্যন্ত কোনো মুনাফা পরিশোধে খেলাপি হওয়ার ঘটনা ঘটেনি।
রূপান্তরে প্রধান বাধা ছিল 'ফ্লোর প্রাইস'-এর ফাঁদ; ২০২৫ সালের জন্য শেয়ার রূপান্তর মূল্য ৮২.৫৮ টাকা নির্ধারিত হলেও, বিনিয়োগকারীরা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন যে ১১০.১০ টাকার ফ্লোর প্রাইসে আটকে থাকা শেয়ারটির দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখা হয়েছিল।
তাদের সেই আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয় ২০২৬ সালের ৮ জুন, যখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফ্লোর প্রাইস তুলে নেয়। এর ফলে শেয়ারটিতে ধস নামে এবং এর দর ৭৪ শতাংশ কমে ২৬.১০ টাকায় নেমে আসে। সুকুকের বড় অংশ ধরে রাখা একটি ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, যখন বাজারদর ২৬ টাকার কাছাকাছি থাকে, তখন ৮২.৫৮ টাকায় একটি ঋণ ইউনিটকে শেয়ারে রূপান্তর করা যে কোনো বিনিয়োগকারীর জন্য তাৎক্ষণিক ও বিশাল মূলধন ক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
সুকুকের অর্থ ব্যবহারের চিত্র
আইসিবির তথ্য অনুযায়ী, বেক্সিমকো তিস্তা সোলার প্রকল্পে ১,৮৮৫.৮৩ কোটি টাকা, করতোয়া সোলার পার্কে ৩০৮.৩১ কোটি টাকা এবং তাদের টেক্সটাইল বিভাগের পরিবেশবান্ধব সম্প্রসারণে ৮০৫.৮৬ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিল।
তবে বাস্তবে কোম্পানিটি তিস্তা সোলারে ২,১৫৫ কোটি টাকা, করতোয়া সোলারে মাত্র ৩৯ কোটি টাকা এবং টেক্সটাইল সম্প্রসারণ কার্যক্রমে ৮০৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। তিস্তা সোলার প্রকল্প আর টেক্সটাইল ইউনিট সম্প্রসারণের কাজ শেষ হলেও, করতোয়া সোলার প্রকল্পের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে।
আইসিবি আরও জানায়, ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সুকুকহোল্ডারদের ১৩০১.৫২ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে আইসিবি। এরমধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ১,৭৮০ কোটি টাকা, অর্ধ-বার্ষিক সুদ পরিশোধে বেক্সিমকো থেকে পেয়েছে ৩৬৩ কোটি টাকা। বিনিয়োগকারীদের পাওনা মিটিয়ে এবং পরিচালন ব্যয় পরিশোধের পর আইসিবি তিস্তা সোলাকে ৩৬৫ কোটি টাকা হস্তান্তর করেছে এবং ফান্ডে ৫০৯ কোটি টাকা রেখে দিয়েছে।
