সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে গ্রাহকরা আমানত তুলছেন সহজে, জরুরি প্রয়োজনে আগেও টাকা পাচ্ছেন কেউ কেউ
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (৭ সেপ্টেম্বর) থেকে ১ সেপ্টেম্বর আবেদন করা গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে। আমানতের টাকা ফেরত পাওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকের পক্ষ থেকে ফুলেল শুভেচছা ও মিষ্টিমুখ করানো হচ্ছে।
সোমবার সকালে রাজধানীর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কয়েকটি শাখা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী শাখাগুলোতে অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনের বিষয়টি বিবেচনা করে কিছু গ্রাহককে নির্ধারিত সময়ের আগেও টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীনে থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কাকরাইল শাখার ব্যবস্থাপক রহিম খান টিবিএসকে বলেন, 'প্রত্যেক গ্রাহককে ফুল ও মিষ্টিমুখ করানো হয়েছে।' তিনি জানান, তাদের শাখায় ওই দিনে ১১ জন গ্রাহকের টাকা তোলার কথা ছিল, যারা গত ১ সেপ্টেম্বর আবেদন করেছিলেন। তবে তাদের মধ্যে মাত্র একজন টাকা তুলতে এসেছেন এবং বাকি ১০ জনকে ব্যাংক থেকেই ফোন দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে শান্তিনগরের বাসিন্দা মিথিলা নামের এক নারীকে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতেও দেখা গেছে।
অন্যদিকে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীনে থাকা এক্সিম ব্যাংকের পল্টন শাখায় গিয়ে গ্রাহকদের কোনো ভিড় লক্ষ করা যায়নি। শাখাটির সেকেন্ড অফিসার জয়নুল আবেদিন বলেন, 'আমাদের আজকের দিনে ১৭ জন গ্রাহকের আবেদন ছিল টাকা তোলার, মাত্র দুজন টাকা তুলেছেন।' তিনি জানান, যে দুজন এসেছেন তাদের পুরো টাকাই পরিশোধ করে দেওয়া হয়েছে।
নয়াপল্টন শাখায় (সাবেক গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক) টাকা তুলতে এসেছিলেন শারমিন জাহান। তিনি গত ৩ সেপ্টেম্বর টাকা ফেরতের জন্য আবেদন করেছিলেন। তবে সন্তান অসুস্থ হওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে তার ২০ হাজার টাকা প্রয়োজন হয়। শারমিন জাহান বলেন, 'আমি গত ৩ সেপ্টেম্বর টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন করেছি। নিয়ম অনুযায়ী আরও দুই দিন পর আমার টাকা পাওয়ার কথা। কিন্তু আমার বাচ্চা অসুস্থ হওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে ২০ হাজার টাকা প্রয়োজন ছিল। বিষয়টি শাখা ব্যবস্থাপককে জানালে তিনি আমাকে ২০ হাজার টাকা উত্তোলনের অনুমতি দেন। ব্যাংকে এসেই জরুরি টাকাটা পেয়ে গেছি। এজন্য ভালো লেগেছে।'
আরেক গ্রাহক দিদার টাকা উত্তোলনের জন্য শাখায় এলেও তাঁকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়। তিনি বলেন, এর আগে কয়েকবার টাকা তুলতে এসে ফেরত যেতে হয়েছে। এবার এসেও জানতে পেরেছেন, তিনি ৩ সেপ্টেম্বর আবেদন করায় আরও দুই দিন পর টাকা তুলতে পারবেন। দিদার বলেন, 'যারা ১ সেপ্টেম্বর আবেদন করেছেন, আজ মূলত তারাই টাকা পাচ্ছেন। আমার আবেদন ৩ সেপ্টেম্বরের। তাই আরও দুই দিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে আজ অন্য গ্রাহকদের টাকা তুলতে দেখে আশ্বস্ত হয়েছে। আশা করছি নির্ধারিত সময়েই আমার টাকাও পাব।'
খেলাপি ঋণ আছে কি না, যাচাই হচ্ছে
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, ১ সেপ্টেম্বর আবেদন করা গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার আগে তাদের ঋণসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। একীভূত পাঁচ ব্যাংকের কোনো ব্যাংকে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের খেলাপি ঋণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে একটি নির্দিষ্ট অ্যাপ ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'গ্রাহকের এনআইডি নম্বরের মাধ্যমে সিস্টেমে যাচাই করা হচ্ছে তার কোনো খেলাপি ঋণ আছে কি না। যদি কোনো গ্রাহক খেলাপি হন বা ঋণের তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। এরপর নিয়ম অনুযায়ী তার টাকা উত্তোলনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।'
অপর এক কর্মকর্তা বলেন, 'কোনো গ্রাহকের খেলাপি ঋণ না থাকলে তিনি নিয়ম অনুযায়ী টাকা তুলতে পারবেন। এ কার্যক্রম বাংলাদেশ ব্যাংক তদারকি করছে।'
গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হয়ে ব্যাংকে আমানত রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকটির দায়িত্ব এখন সরকার নিয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক পুরো কার্যক্রম তদারকি করছে। ফলে আমানতকারীদের অর্থ নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।
জরুরি প্রয়োজন হলে বিশেষ বিবেচনা
নয়াপল্টন শাখার ব্যবস্থাপক (সাবেক গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক) সাইফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, 'গ্রাহকদের চাহিদার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে টাকা উত্তোলনে বড় ধরনের কোনো সংকট হবে না।'
তিনি বলেন, 'আমরা সবসময় গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। গ্রাহকদের আবেদনের ভিত্তিতে আমরা অর্থের চাহিদা জানিয়েছি এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সার্বক্ষণিক বিষয়টি তদারকি করছে।'
তিনি আরও বলেন, '১ সেপ্টেম্বর যারা আবেদন করেছেন, আজ তাদের টাকা দেওয়া হচ্ছে। ২ বা ৩ সেপ্টেম্বর যারা আবেদন করেছেন, তাদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আরও এক-দুই দিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে কারও পরিবারের সদস্য অসুস্থ হওয়া বা অন্য কোনো জরুরি প্রয়োজন থাকলে আমরা বিষয়টি বিবেচনা করে যতটা সম্ভব দ্রুত টাকা দেওয়ার চেষ্টা করছি।'
বিজয়নগর শাখার (সাবেক ইউনিয়ন ব্যাংক) ব্যবস্থাপক চৌধুরী এস এম আতিকুর রহমান হায়দারও জানান, গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি বলেন, 'বড় অঙ্কের আমানতকারী চাইলে টাকা রেখে দিতে পারেন। আবার প্রয়োজন হলে টাকা উত্তোলন বা আরটিজিএসের মাধ্যমে স্থানান্তরের ব্যবস্থাও রয়েছে।'
তবে তিনিও জানান, টাকা ছাড়ের আগে পাঁচ ব্যাংকের কোথাও সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের খেলাপি ঋণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
৬ দিনে ৭৫ হাজার আবেদন
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে টাকা ফেরতের আবেদন নেওয়া শুরু হয়। ছয় দিনে ৭৫ হাজার গ্রাহক আবেদন করেছেন। এসব আবেদনের বিপরীতে গ্রাহকদের চাহিদার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংক সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড় করে। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে সোমবার থেকে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও কার্যক্রম বাস্তবে শুরু হয়েছে আজ থেকে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হয়েছে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে।
