উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে প্রথম সড়ক সেতু চালু
রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সংযোগকারী প্রথম সড়ক সেতুর উদ্বোধন করা হয়েছে, যা তুমান নদীর সীমান্ত পেরিয়ে দুই দেশের মধ্যে সহজে পণ্য ও যাত্রী বহনের পথ সুগম করেছে।
পিয়ংইয়ংয়ের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সেতুটি কর্মী বিনিময়, পর্যটন এবং বাণিজ্যের কাজে ব্যবহার হবে। তবে ইউক্রেনীয় গবেষণা সংস্থা 'ট্রুথ হাউন্ডস' জানিয়েছে, সেতুটির মূল উদ্দেশ্য হলো ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তা করার জন্য একটি গোপন সামরিক লজিস্টিক করিডোর গড়ে তোলা।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় এই সেতুটি চালু হলো। এর আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন অঙ্গীকার করেছিলেন, যেকোনো এক দেশ "আগ্রাসনের" শিকার হলে তারা একে অপরকে সাহায্য করবেন।
রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্তিন এই সেতুটিকে "বন্ধুত্বের এক নতুন প্রতীক" হিসেবে বর্ণনা করেছেন, অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী পাক থাই সং এটিকে একটি "ঐতিহাসিক ঘটনা" বলে অভিহিত করেছেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাস জানিয়েছে, এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩০০টি যানবাহন এবং ২ হাজার ৩২৩ জন মানুষ যাতায়াত করতে পারবে।
চলতি বছরের মে মাসে বিবিসির এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, এই এক কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি নতুন সংযোগ সড়ক, সীমান্ত চেকপয়েন্ট, সহায়ক অবকাঠামো এবং পার্কিং সুবিধা নির্মাণ করা হয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বিমান ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু থাকলেও এতদিন একমাত্র সড়ক পথ হিসেবে একটি সাময়িক ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল—যেখানে বিশেষ ব্যবস্থায় রেল সেতুর ওপর কাঠের তক্তা বসিয়ে গাড়ি চলাচলের সুযোগ দেওয়া হতো।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া সরকার জানিয়েছে সেতুটি প্রাথমিকভাবে পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হবে, এবং চলতি বছরের শেষভাগে এটি যাত্রী চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। মিশুস্তিন জানান, 'এই সেতুটি বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতার আরও উন্নয়নে এক শক্তিশালী গতি আনবে।' উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে তিনি মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যকার সম্পর্ককে "অভূতপূর্ব এক উচ্চতায়" পৌঁছেছে বলে বর্ণনা করেন।
তবে এর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব হতে পারে রাশিয়ায় অস্ত্র রফতানি বৃদ্ধি পাওয়া। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার গবেষকদের ধারণা, উত্তর কোরিয়া ইতোমধ্যে জাহাজের মাধ্যমে ৭ থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও কামানের গোলা পাঠিয়েছে। এছাড়া আনুমানিক ১১,০০০ উত্তর কোরীয় সৈন্য রাশিয়ার ভূখণ্ডে ইউক্রেনীয়দের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে লড়াই করছে।
ট্রুথ হাউন্ডস অতি সম্প্রতি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ২০২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তির আলোকেই এই সেতুটি তৈরি—যা উত্তর কোরিয়ার সামরিক সদস্য, নির্মাণ শ্রমিক এবং ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের সরাসরি রাশিয়ায় স্থানান্তরের কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। এটি বিপরীত অভিমুখে রাশিয়ান প্রযুক্তি ও সম্পদের প্রবাহকেও সহজতর করবে।
২০২৪ সালে পুতিনের উত্তর কোরিয়া সফরের সময় সেতুটি নির্মাণের চুক্তি হয়। ২৪ বছরের মধ্যে এটিই ছিল সেখানে তার প্রথম সফর, যার ফলশ্রুতিতে সেই ঐতিহাসিক অংশীদারিত্ব চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এরপর ২০২৫ সালে সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং কিছু বিলম্বের পর এটি সম্পূর্ণ হতে ৪৯৫ দিন সময় লাগে।
২০২৪ সালে অনুমতি পাওয়ার পর থেকেই রাশিয়ান পর্যটকরা সীমিত পরিসরে উত্তর কোরিয়ায় যাওয়া শুরু করেছেন। উত্তর কোরিয়া অন্যান্য দেশের পর্যটকদের প্রবেশ আটকে রাখলেও, রাশিয়ানদের রাজধানী পিয়ংইয়ং এবং ওনসান-কালমার সমুদ্র সৈকত রিসোর্টগুলোতে আতিথেয়তা প্রদান করছে।
এই সড়ক পথটি উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের রাশিয়ায় পরিবহনেও ব্যবহৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে রাশিয়ার নির্মাণ সাইট এবং কাঠ কাটার ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ১০ হাজার উত্তর কোরীয় নাগরিক কর্মরত রয়েছেন। যদিও জাতিসংঘ উত্তর কোরিয়ার শ্রমিক ব্যবহারে অন্যান্য দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তবুও অনেকে স্টুডেন্ট ভিসার আড়ালে রাশিয়ায় প্রবেশ করছেন।
ভাবুক প্রতিষ্ঠান 'সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ'-এর ভিক্টর চা চলতি বছরের মে মাসে বিবিসি ভেরিফাইকে বলেন, 'নির্মাণকাজের এই দ্রুত গতি দুই পক্ষের মধ্যে বাণিজ্য কার্যক্রমের পরিমাণেরই প্রতিফলন।'
তিনি আরও বলেন, 'পুতিনের ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য উত্তর কোরিয়ার সৈন্য, অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং শ্রমিক সরবরাহের কারণেই মূলত এই গতি ত্বরান্বিত হয়েছে।এটি বলা ভুল হবে না যে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে উত্তর কোরিয়ার সাথে তার প্রতিবেশী দুটি দেশের যে সংযোগগুলো ছিল, তার মধ্যে এই সংযোগটি সবচেয়ে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে ছিল।'
