যুদ্ধে রাশিয়ার সঙ্গে জনবল ঘাটতি কমাতে কিলার রোবট মোতায়েন করছে ইউক্রেন
পূর্ব দনেৎস্কে ইউক্রেনীয় ঘাঁটির দিকে একদল রুশ সেনারা এগিয়ে যাওয়ার পথে এক অনাকাঙ্ক্ষিত শত্রুর মুখে পড়েন। এটি ছিল মারণাস্ত্রযুক্ত এক যুদ্ধ রোবট।
রুশ সেনারা গাছপালার আড়ালে অবস্থান নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রোবটটি চারপাশের শুকনো ঘাসে আগুন লাগিয়ে পুরো এলাকা জ্বালিয়ে দেয়। ইউক্রেনের ৯৩তম ব্রিগেডের প্রধান প্রকৌশলী 'ম্যাজিশিয়ান' (ছদ্মনাম) জানান, এরপর আগুন থেকে বেঁচে যাওয়া রুশ সেনাদের কাবু করতে ইউক্রেনীয় মেশিনগান বাহিনী এগিয়ে আসে।
গত আগস্টে তথাকথিত দোব্রোপিলিয়া ফ্রন্টে মোতায়েন করা এই রোবটটি ইউক্রেনের দ্রুত প্রসারমান 'মানবহীন স্থলযান' বহরেরই একটি অংশ। রাইফেল থেকে শুরু করে রকেটচালিত গ্রেনেড লঞ্চারে সজ্জিত এই যানগুলোর উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়ানো হচ্ছে।
রাশিয়ার সেনাবাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান নেওয়া ইউক্রেনীয় সৈন্যদের শক্তি বাড়াতে চলতি বছরই যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য এমন অন্তত ৫০ হাজার রোবট তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে দেশটি।
এ লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কে এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, 'ড্রোন ছাড়া এখন আর প্রতিরক্ষার কথা ভাবাই যায় না, আর মানবহীন স্থলযান বা ইউজিভি-র ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সম্মুখসারির রসদ সরবরাহ, আহতদের উদ্ধার এবং সরাসরি যুদ্ধ অভিযান সবক্ষেত্রেই এখন দ্রুত গতিতে ইউজিভি-র ব্যবহার বাড়ছে।'
এমনকি জুলাই মাসে, কিয়েভের বাহিনী একটি দূরনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ রোবটকে চালকহীন নৌ-ড্রোন দিয়ে সমুদ্রপথে পাঠায়। ড্রোনটি ১১ কিলোমিটার (৬.৮ মাইল) পথ অতিক্রম করে দক্ষিণ ইউক্রেনের রুশ-দখলকৃত কিনবার্ন স্পিটের তীরে পৌঁছায়।
'উলি ৭.৬২' (Wolly 7.62) নামের এই স্থল-রোবটটিতে গোলাবারুদ ভর্তি মেশিনগান যুক্ত ছিল, যা দিয়ে রুশ ঘাঁটিতে অনবরত গুলি চালানো হয়। এর ফলে রুশ সেনারা উপকূলের ওই অংশ থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং কাজ শেষ করে রোবটটি নিজেই নিজেকে ধ্বংস করে ফেলে।
১২৩তম সেপারেট টেরিটোরিয়াল ডিফেন্স ব্রিগেডের 'হাউজ গবলিন' ছদ্মনামের একজন সৈনিকের তথ্যমতে, মাত্র চারজন ইউক্রেনীয় অপারেটর এ হামলাটি পরিচালনা করেন। এই অভিযানের জন্য ৮ হাজার ডলার মূল্যের রোবটটি ব্যবহারের প্রস্তাব তিনিই দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, 'আমরা ইতোমধ্যে বহু এলাকায় ড্রোন ও রোবট দিয়ে লড়াই করছি।'
'টার্মিনেটর' সিনেমা সিরিজের রোবটদের রাজত্বের কথা স্মরণ করে হেসে
তিনি আরও বলেন, 'আমরা আগেভাগেই আমাদের রোবটগুলোর সঙ্গে খুব বিনয়ী আচরণ করছি, যাতে ভবিষ্যতে ওরা আমাদের ওপর চটে না যায়!'
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানান, এই মানবহীন প্রযুক্তিগুলো তাদের সেনাবাহিনীর সাথে রাশিয়ার যে বিশাল জনবল বা সৈন্যসংখ্যার ঘাটতি রয়েছে, তা কমাতে বা পূরণ করতে সাহায্য করছে। পাশাপাশি এগুলো বিপজ্জনক রসদ সরবরাহ ও আহত সেনাদের উদ্ধারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করে সাধারণ সেনাদের নিষ্কৃতি দিচ্ছে এবং জীবন রক্ষা করছে।
ইউক্রেনের ৯ লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনীতে নতুন সদস্য নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় বাধ্যতামূলক সামরিক 'মোবিলাইজেশন'-এর প্রতি জনগণের তীব্র অনিচ্ছার কারণে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে প্রায় ২০ লাখ মানুষকে খুঁজছে পুলিশ।
ইউক্রেনের 'আনম্যানড সিস্টেমস ফোর্সেস'-এর প্রধান রবার্ট ব্রোভডি জানান, পদাতিক বাহিনীগুলোও এখন যুদ্ধ অভিযানে এই রোবট যানগুলো ব্যবহার করছে। তিনি জানান, এর মধ্যে কিছু রোবট মাইন বা বিস্ফোরক পৌঁছে দিতে এবং কিছু রোবট 'কামিকাজে' (আত্মঘাতী) হামলা চালাতে ব্যবহৃত হয়।
ব্রোভডি বলেন, 'সম্মুখ সমররেখা থেকে অন্তত ২৫ কিলোমিটার এলাকা মূলত একটি 'কিল জোন' বা মৃত্যুপুরী, যেখানে বিপুল সংখ্যক ড্রোনের উপস্থিতির কারণে হতাহতের ঝুঁকি অস্বাভাবিক মাত্রায় বেশি। তাই মানুষের বদলে ড্রোনের ব্যবহার আমাদের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমিয়ে আনছে।'
রাশিয়ার জনসংখ্যার চার ভাগের এক ভাগ এবং অপেক্ষাকৃত ছোট অর্থনীতির দেশ হওয়ায়, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে প্রতিপক্ষকে টেক্কা দেওয়া ছাড়া ইউক্রেনের সামনে তেমন কোনো উপায় নেই।
ড্রোন ও রোবট ব্যবহার করে এমন অসমান প্রযুক্তিগত কৌশলের অগ্রদূত ছিলেন মিখাইলো ফেদোরভ। তবে সামরিক বাহিনীর প্রধান কমান্ডার ওলেকসান্ডার সিরস্কির সাথে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে গত জুলাই মাসে তাকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
নতুন সামরিক বাহিনীর প্রধান কমান্ডার ৪৩ বছর বয়সী মিইখাইলো দ্রাপাতি-ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জনে ইউক্রেনের ড্রোন ও রোবোটিক্স জ্ঞানকে কাজে লাগানোর পক্ষে।
তবে রাশিয়াও থেমে নেই। তারাও ইরানি নকশার 'শাহেদ' ড্রোনগুলোর গতি ও লক্ষ্যভেদী ক্ষমতা বাড়াতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটিয়েছে। রেডিও সিগন্যাল জ্যামিং এড়াতে তারা রেডিও তরঙ্গের বদলে হালকা ফাইবার-অপটিক ক্যাবল দিয়ে নিয়ন্ত্রিত আক্রমণাত্মক ড্রোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইউক্রেনের চেয়ে এগিয়ে।
যুদ্ধের শুরুর দিকে সাঁজোয়া ট্যাংক বহর ও বিশাল সৈন্যদল মূখ্য ভূমিকা রাখলেও, পূর্ব ও দক্ষিণ ইউক্রেনের বর্তমান সম্মুখ সমররেখা অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। পুরো অঞ্চলটি এখন সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখছে ড্রোন। যেকোনো চলমান লক্ষ্যবস্তু দেখামাত্রই আক্রমণ চালাচ্ছে।
এর সাথে একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক মাত্রা যুক্ত হয়েছে, কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের সেনাবাহিনীকে যুদ্ধের এই নতুন বাস্তবতার সাথে মানিয়ে নিতে সক্ষম করতে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
ন্যাটোতে ইউক্রেনের যোগদানের পথ এখনো রুদ্ধ হলেও, ড্রোন ও রোবট ব্যবহারে ইউক্রেনের এই কৌশলগত উদ্ভাবনগুলো থেকে শিক্ষা নিতে ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রগুলো এখন মুখিয়ে আছে।
বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের সাথে ইউক্রেন ইতোমধ্যে প্রতিরক্ষা উৎপাদন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ন্যাটো জোটের বাইরে থাকা সত্ত্বেও, কিয়েভ এই সুযোগে নিজেকে পুরো ইউরোপের সামরিক নিরাপত্তাকাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে বসাতে চাইছে।
ইতোমধ্যে সৌদি আরব থেকে শুরু করে নেদারল্যান্ডসের সাথে ড্রোন সংক্রান্ত চুক্তি সম্পন্ন করেছে ইউক্রেন। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশের সাথে নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা চলছে।
গত মে মাসে মার্কিন সেনা সচিব ড্যান ড্রিসকল ইউক্রেনের ড্রোন নেটওয়ার্কের অপারেটিং সিস্টেমের প্রশংসা করে একে "একেবারেই অবিশ্বাস্য" বলে অভিহিত করেন।
মার্কিন সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সামনে তিনি বলেন, "এটি প্রতিটি ড্রোন, সেন্সর এবং শুটিং প্ল্যাটফর্মকে একটিমাত্র সমন্বিত নেটওয়ার্কে যুক্ত করে নেয়। যা আমাদের প্রযুক্তিতেও এখনো সম্ভব হয়নি।"
গত ১৩ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ঘোষণা করেন, মানুষের কোনো রকম অংশগ্রহণ ছাড়াই শুধু স্থল-রোবট ও ড্রোনের সাহায্যে ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো একটি রুশ ঘাঁটি দখল এবং তাদের সৈন্যদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছে ইউক্রেন।
টেলিগ্রামে তিনি লেখেন, 'ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে গেছে এবং ইউক্রেনই তা গড়ে তুলছে।'
২৩ জুলাই স্কাই নিউজ অস্ট্রেলিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক ভাইস চিফ অফ স্টাফ জ্যাক কিন বলেন, 'তারা যুদ্ধবিদ্যার ইতিহাসে নজিরবিহীন এক ঘটনা ঘটিয়েছে। রোবটগুলো এমন একটি রুশ ঘাঁটিতে আক্রমণ চালিয়ে তাদের হটিয়ে দিয়েছে, যেখানে রুশ সেনারা প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত ছিল—অথচ লড়াইয়ের পুরো প্রক্রিয়াটিতে ইউক্রেনের কোনো মানুষ সরাসরি অংশই নেয়নি।'
তবে ইউক্রেনের ড্রোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে স্থল-রোবটের এমন সাফল্য ও সম্ভাবনা নিয়ে একটু দেখেশুনে মন্তব্য করছে।
জেলেনস্কি যে অপারেশনের কথা উল্লেখ করেছিলেন, তাতে ব্যবহৃত রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান 'রেটেল রোবোটিক্স'-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারাস ওস্তাপচুক বলেন, 'পদাতিক বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে প্রতিস্থাপন করা মোটেও সম্ভব নয়। আমরা মূলত পদাতিক বাহিনীকে সাহায্য করার কথাই বলছি।'
তিনি আরও বলেন, রেটেল ড্রোন ১৫ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত ১৫০ কেজি গোলাবারুদ, খাবার ও অস্ত্র বহন করতে পারে, যার ফলে 'পদাতিক সেনারা কেবল নিজেদের সুরক্ষাতেই মনোযোগ দিতে পারেন।'
প্রেসিডেন্টের উল্লেখ করা ওই মানবহীন সামরিক অভিযানে যুক্ত থাকা অপর একটি প্রতিষ্ঠান 'টেনকোর'-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাকসিম ভাসিলচেঙ্কো জানান, ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রের নানা কাজে প্রতিনিয়ত রোবটের ব্যবহার বাড়িয়ে চলেছে।
তিনি আরও জানান, তাদের তৈরি একটি টেনকোর ড্রোন মাত্র একটি মিশনেই ১,৫০০টি ট্যাংক-বিধ্বংসী মাইন পুঁতেছিল।
ভাসিলচেঙ্কো বলেন, 'আমরা একটা ছোট্ট গ্যারেজ থেকে শুরু করেছিলাম। এখন সেই পরিধি গুটিকয়েক ইউনিট থেকে বেড়ে হাজার হাজারে পৌঁছেছে।'
