উত্তর কোরিয়ার দুই সৈন্যকে দক্ষিণ কোরিয়া পাঠাল ইউক্রেন
ইউক্রেন সীমান্ত থেকে আটক করা দুই উত্তর কোরীয় সেনাকে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হস্তান্তর করেছে কিইভ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া এক ভাষণে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বুধবার এ তথ্য জানান।
জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের এ সম্মেলনে জেলেনস্কি বলেন, 'সম্প্রতি আমরা দুই উত্তর কোরীয় বন্দিকে রিপাবলিক অব কোরিয়া (দক্ষিণ কোরিয়া)-র কাছে হস্তান্তর করেছি।'
উত্তর কোরীয় সেনাদের বন্দি করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জেলেনস্কি বলেন, 'এই সেনাদের জীবন্ত বন্দি করা মোটেও সহজ কাজ নয়। তাদের মধ্যে একজন যখন বুঝতে পারেন যে তিনি বন্দি হতে যাচ্ছেন, তখন আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করেছিলেন। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়ার পর তিনি নিজেই যেন চরম বিস্ময় প্রকাশ করেন।' তবে তাদের হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পর্কিত আর কোনো বিস্তারিত তথ্য তিনি দেননি।
গত বছরের জানুয়ারিতে রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চল থেকে এই দুই উত্তর কোরীয় সেনাকে বন্দি করে ইউক্রেনীয় বাহিনী। ২০২৪ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সরাসরি যুক্ত হওয়ার পর এই প্রথম দেশটির কোনো সেনাকে জীবিত অবস্থায় আটক করা সক্ষম হয়।
সেনাদের আটক করার সময় জেলেনস্কি জানান, রাশিয়ার হাতে বন্দি থাকা ইউক্রেনীয় সেনাদের মুক্ত করার বিনিময়ে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের কাছে এদের ফেরত দেওয়া যেতে পারে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইউক্রেনকে অনুরোধ করে, উত্তর কোরিয়ায় ফিরিয়ে নেওয়া হলে এই সেনাদের মারাত্মক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। তাই সার্বিক ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে যেন তাদের দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠানো হয়।
এর পাশাপাশি দক্ষিণ কোরীয় সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশ পায় যে, আটক দুই সেনা নিজেরাই দক্ষিণ কোরিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। দক্ষিণ কোরিয়ার বিরোধী দলীয় আইনপ্রণেতা ইউ ইয়ং-ওয়ান বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানান, আটক ওই দুই উত্তর কোরীয় সেনা গত সপ্তাহান্তে ইউক্রেন ত্যাগ করেন। এরপর একটি তৃতীয় দেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিট নিয়ে তিন থেকে চার দিন আগে তারা দক্ষিণ কোরিয়ায় পৌঁছেছেন বলে ইয়োনহাপ বার্তা সংস্থা উল্লেখ করেছে।
ইউ ইয়ং-ওয়ানকে উদ্ধৃত করে খবরে বলা হয়, 'তাদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানা না গেলেও, আমি বিশ্বাস করি আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের পূর্ণ নিরাপত্তায় রেখেছে।'
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সেনা ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে এই মুহূর্তে বিষয়টি নিশ্চিত করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। দেশটির একীকরণ মন্ত্রণালয়ও (ইউনিফিকেশন মিনিস্ট্রি) এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
উল্লেখ্য, রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করা উত্তর কোরীয় যুদ্ধবন্দিদের মস্কো বা পিয়ংইয়ংয়ে যেকোনো ধরণের প্রত্যাবাসনের বিরোধিতা করে গত জুনে দক্ষিণ কোরিয়া ঘোষণা দিয়েছিল যে, তারা এ ধরণের সমস্ত উত্তর কোরীয় সেনাকে আশ্রয় প্রদান করবে।
বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করতে সেনা পাঠানোর জন্য উত্তর কোরিয়ার তীব্র সমালোচনাও করেন। জেলেনস্কি আরও বলেন, 'এটি এক চরম উন্মাদনা। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কোরীয়রা কেন নিজেদের জীবন দেবে? কিম জং উন এদের মুদ্রার মতো ব্যবহার করছেন—আর বিনিময়ে তিনি স্বার্থ হাসিল করছেন।'
ইউক্রেন ও দক্ষিণ কোরিয়ার তথ্য প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধে সহায়তার উদ্দেশ্যে উত্তর কোরিয়া প্রায় ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার সেনা পাঠিয়েছে। এদের সিংহভাগকেই রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছিল, যেখানে ইউক্রেনীয় বাহিনীর আকস্মিক অনুপ্রবেশ ও হামলা প্রতিহত করতে রুশ বাহিনীকে সাহায্য করেছিল তারা।
ইউক্রেনীয় ও স্বাধীন বিভিন্ন সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, সেনা পাঠানোর পাশাপাশি উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে লাখ লাখ কামানের গোলা ও মর্টার শট, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, দূরপাল্লার কামান এবং একাধিক রকেট লাঞ্চার ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে।
