বৈশ্বিক ডিজেল সংকট উল্লেখ করে ইউক্রেনকে রুশ শোধনাগারে হামলা বন্ধ করতে বললেন ট্রাম্প
বিশ্বজুড়ে তীব্র ডিজেল সংকট তৈরি হচ্ছে—এমন বাস্তবতা উল্লেখ করে রাশিয়ার জ্বালানি তেল শোধনাগার ও ডিজেল উৎপাদন-সরবরাহকারী অবকাঠামোগুলোতে হামলা বন্ধ করতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবারে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় খুচরা মূল্য রেকর্ড গড়ে প্রতি গ্যালনে ৬ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর ট্রাম্প গতকাল রোববার এই আহ্বান জানান।
ইউক্রেন গত কয়েক মাস ধরে দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস শিল্পকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে আসছে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি রপ্তানিকারক রাশিয়াকেই অভ্যন্তরীণ গ্রাহকের কাছে জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং করতে হয়েছে। এমনকি গত জুলাই মাসে ডিজেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করতে বাধ্য হয় মস্কো। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত এই জ্বালানির সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে।
তবে শুধু ইউক্রেনের হামলা একমাত্র কারণ নয়। ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ার ফলে এই বৈশ্বিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
এদিকে আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। তার আগে জ্বালানির এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মার্কনীদের পকেটের ওপর অনেকটাই চাপ তৈরি করেছে।
এমতাবস্থায়, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলাপের পর তিনি জেলেনস্কির সঙ্গেও কথা বলেছেন কি না—এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প ইউক্রেনকে রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলা বন্ধ করার এই তাগিদ দেন।
নিজ মালিকানাধীন ডুনবেগ গলফ ক্লাবে আয়োজিত 'আইরিশ ওপেন' টুর্নামেন্টের ফাঁকে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, "মি. জেলেনস্কিকে একটি কাজ করতে হবে। রাশিয়ার ডিজেল উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দেওয়া বন্ধ করতে হবে তাঁকে।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা এ নিয়ে মি. জেলেনস্কির সঙ্গে কথা বলেছি। আঘাত হানার মতো আরও প্রচুর লক্ষ্যবস্তু রয়েছে। ডিজেল (উৎপাদন) কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাবেন না, কারণ এটি গোটা বিশ্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।"
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) গত শুক্রবারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে গত আগস্টে ডিজেল ও গ্যাস-অয়েলের নিট রপ্তানি— গেল ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের পরিমাণের "এক-চতুর্থাংশের সামান্য বেশি" পর্যায়ে নেমে এসেছে।
সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, "ইউক্রেনের জোরালো হামলার পর রাশিয়ার শোধনাগার ব্যবস্থার বিপর্যয় এবং সেখান থেকে পরিশোধিত পণ্য রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া—এই ঘাটতিকে আরও বহুমুখী ও জটিল করে তুলেছে।" আইইএ উল্লেখ করে, গত ফেব্রুয়ারিতেও বিশ্বের মোট সামুদ্রিক জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় ৪৫ শতাংশই আসত উপসাগরীয় অঞ্চল ও রাশিয়া থেকে।
তবে কিয়েভের বক্তব্য হলো, রাশিয়ার তেল খাত কেবল মস্কোর অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখছে না, বরং চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ সামরিক বাহিনীকে সরাসরি অর্থ জোগাচ্ছে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং জেট-চালিত ড্রোনের সাহায্যে আকাশপথে হামলা জোরদার করেছে রাশিয়া। শীতকাল আসন্ন হওয়ার মুখে দেশটির বিদ্যুৎ গ্রিডগুলোকে লক্ষ্য করে এসব হামলা চালাচ্ছে মস্কো, যা ইউক্রেনীয়দের মনোবল ভেঙে দেওয়ার একটি পরিকল্পনা বলে দেশটির কর্মকর্তারা মনে করছেন।
গত শনিবার রাত থেকে রোববার ভোর পর্যন্ত রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই একে অপরের ওপর বড় আকারের ড্রোন হামলা চালিয়েছে, এতে বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিকও হতাহত হয়েছেন।
রাশিয়ার তাতারস্তান অঞ্চলের একটি তেল ও শিল্প কেন্দ্রের কাছে ইউক্রেনীয় ড্রোনের আঘাতে ২ জন নিহত এবং ১৪ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অপরদিকে, ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে রুশ ড্রোনগুলো কৃষ্ণসাগরের কৌশলগত ওডেসা বন্দরে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছে এবং পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে একটি চেকপয়েন্টে অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়েছে।
তাতারস্তানের আঞ্চলিক প্রধান রুস্তম মিন্নিখানভের দপ্তর জানায়, নিজনেকামস্ক শহরে একটি ড্রোন– পার্কিংয়ে রাখা একটি গাড়ির পাশের গাছে আছড়ে পড়লে দুই রুশ বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান। গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার ও বেশ কিছু শিল্প কারখানার জন্য বিখ্যাত নিজনেকামস্ক শহর। শহরের মেয়র রাদমির বেলিয়ায়েভ জানিয়েছেন, হামলায় একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে আগুন ধরে যায়।
ইউক্রেন ক্রিমিয়ার কাছে রাশিয়ার ক্রাসনোদার অঞ্চলের স্ল্যাভিয়ানস্ক-অন-কুবানের একটি প্রধান তেল শোধনাগারেও সফল ড্রোন হামলার দাবি করেছে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইইউ) জানিয়েছে, তাদের ড্রোনগুলো রোববার রাতে ওই শোধনাগারের মূল তেল প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট এবং ট্যাংক ফার্মে আঘাত করেছে।
ক্রাসনোদারের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই হামলায় ৩ জন আহত হন এবং একটি তেলের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রোববার জানিয়েছে, রাতভর তারা ইউক্রেনের ৩৮৯টি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের ওডেসা শহরে রাশিয়ার রাতভর হামলায় কমপক্ষে ৯ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সেখানকার সামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা সেরহি লিসাক। ওডেসা বন্দরটি কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের মূল বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় প্রতিনিয়ত রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখোমুখি হচ্ছে। কিয়েভের অভিযোগ, মস্কো তাদের পণ্য রপ্তানির পথ পুরোপুরি বন্ধ করার চেষ্টা করছে।
এ ছাড়া শনিবার ওডেসার একটি বহুতল আবাসিক ভবনে রুশ ড্রোন হামলায় ২ জন নিহত এবং ২৬ জন আহত হন বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানান।
