গাড়ি উৎপাদন ছেড়ে ইসরায়েলের অস্ত্র কারখানা হচ্ছে ফোক্সভাগেনের প্ল্যান্ট
জার্মান গাড়ি নির্মাতা ফোক্সভাগেনের একটি পুরোনো কারখানা গাড়ি উৎপাদন থেকে সরে গিয়ে ইসরায়েলের জন্য সামরিক সরঞ্জাম তৈরির কারখানায় রূপ নিতে যাচ্ছে। কারখানাটি ইসরায়েলের বৃহত্তম ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাতা রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের সঙ্গে যৌথভাবে এ কাজে ব্যবহার করা হবে।
উত্তর-পশ্চিম জার্মানির ওসনাব্রুকে অবস্থিত কারখানাটিতে আগামী বছর গাড়ি উৎপাদন বন্ধ হওয়ার কথা। এরপর সেখানে সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করা হবে।
ফোক্সভাগেন জানিয়েছে, কারখানাটিতে ইউরোপের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি হবে। রাফায়েলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়োয়াভ তুর্গেম্যান বলেছেন, এর লক্ষ্য হবে 'জার্মানি ও ইউরোপকে সুরক্ষা দেওয়া'।
ব্লুমবার্গ গত মাসে জানিয়েছিল, কারখানাটিতে ইসরায়েলের আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী যান, উৎক্ষেপণযন্ত্র ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী জেনারেটর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
আয়রন ডোম স্বল্পপাল্লার রকেট, কামানের গোলা, মর্টার ও ড্রোন প্রতিহত করতে তৈরি করা হয়েছে। এর কার্যকর পাল্লা প্রায় ৪৩ মাইল। এটি আকাশে আসা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে এবং জনবসতিতে আঘাত হানার আশঙ্কা থাকলে তা ধ্বংস করতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে।
জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, জার্মানির সঙ্গে চুক্তিতে আয়রন ডোমে ব্যবহৃত তামির ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হবে না। তবে এর অন্যান্য সরঞ্জাম তৈরি করা হবে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমটি আরও জানিয়েছে, এই চুক্তি রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় জার্মানির পূর্ণাঙ্গ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পথ তৈরি করতে পারে।
২০২৩ সালে জার্মানি ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে দীর্ঘপাল্লার অ্যারো-৩ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তি করে। সে সময় এটি ছিল ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি। পরে আরও ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তি করে জার্মানি।
ফোক্সভাগেনের ১২৫ বছরের পুরোনো ওসনাব্রুক কারখানাটি ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান অরেলিয়াস ক্যাপিটালের কাছে বিক্রি করা হবে। প্রতিষ্ঠানটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা নেবে। ফোক্সভাগেনের সদর দপ্তর যে জার্মান রাজ্যে, সেই লোয়ার স্যাক্সনিও মালিকানার অংশীদার হবে।
রাফায়েলকে সরাসরি মালিকানায় না রাখার সিদ্ধান্ত কাতারের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের সম্ভাব্য বিরোধিতা ঠেকানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। কাতারের এই তহবিল ফোক্সভাগেনের প্রায় ১৭ শতাংশ ভোটাধিকার নিয়ন্ত্রণ করে এবং কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে তাদের দুজন সদস্য রয়েছেন।
২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলের সঙ্গে কাতারের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হামাসের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে কাতারের রাজধানী দোহায় বিমান হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ফোক্সভাগেনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অলিভার ব্লুম বলেন, 'কারখানাটির নতুন শিল্পভিত্তিক ভবিষ্যৎ তৈরির পথে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিচ্ছি।'
ইউরোপের সবচেয়ে বড় গাড়ি নির্মাতা ফোক্সভাগেন বর্তমানে পুরোনো কারখানাগুলোর বিকল্প ব্যবহার খুঁজছে। সস্তা চীনা গাড়ির কারণে বিক্রি কমে যাওয়ায় ইউরোপে বছরে প্রায় ৫ লাখ গাড়ি কম উৎপাদন করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ফোক্সভাগেন গ্রুপের অধীনে অডি, পোর্শে, স্কোডা ও বেন্টলিসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ড রয়েছে। গত সপ্তাহে প্রতিষ্ঠানটি শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে বড় ধরনের পুনর্গঠন চুক্তি করেছে। এর আওতায় ৫০ হাজার চাকরি কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট চাকরি কমানোর সংখ্যা দাঁড়াবে ১ লাখে। পাশাপাশি গাড়ির মডেলের সংখ্যাও কমানো হবে।
অলিভার ব্লুম জানিয়েছেন, জার্মানির আরও চারটি কারখানার ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবা হচ্ছে। তবে সরাসরি কারখানা বন্ধের বিরোধিতা করছেন শ্রমিকেরা।
ওসনাব্রুক কারখানায় প্রায় ২ হাজার ৩০০ মানুষ কাজ করেন। ২০২৭ সালে টি-রক ক্যাব্রিওলেটের উৎপাদন বন্ধ হলে সেখানে ফোক্সভাগেনের সর্বশেষ গাড়ি মডেলটির উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে কারখানাটিকে অন্য কোনো শিল্পকাজে ব্যবহারের জন্য কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ বাড়ছে।
ব্লুম এর আগে জানিয়েছিলেন, যেসব কারখানায় নতুন গাড়ি উৎপাদন সম্ভব নয়, সেগুলোর জন্য বিনিয়োগকারী, শিল্প অংশীদার ও বিকল্প ব্যবহারের সুযোগ খুঁজবে ফোক্সভাগেন।
