সহজে মিলছে কার-লোন, বেড়েছে হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা
গাড়ি কেনার জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ করায় দেশে কার-লোনের আবেদনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। তবে এই বাড়তি চাহিদার সুবিধা প্রথাগত জ্বালানিচালিত কিংবা রিকন্ডিশন্ড গাড়ির চেয়ে বেশি পাচ্ছে হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি)।
মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা নির্দেশনা অনুসারে, বৈদ্যুতিক, হাইব্রিড ও দেশে সংযোজিত গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারছে। গাড়ির ক্রয়মূল্যের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত এই ঋণের আওতায় আসছে এবং তা পরিশোধের জন্য সর্বোচ্চ আট বছর সময় পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে প্রথাগত অকটেনচালিত গাড়ির জন্য ঋণ নেওয়ার সর্বোচ্চ সীমা আগের মতোই ৬০ লাখ টাকা রয়েছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, নীতিমালার এই পরিবর্তনে গাড়ি কেনার ঋণের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। গত দুই মাসে সিটি ব্যাংকে অটো-লোনের আবেদন বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এর ফলে মাসিক আবেদনের সংখ্যা আগের প্রায় ৪৫০টি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০০।
সিটি ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক অরূপ হায়দার বলেন, 'এই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ঋণের আবেদন। সাধারণ বা নন-হাইব্রিড গাড়ির তুলনায় এসব গাড়ির চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বেশি।'
এ সময় ব্যাংকটির মাসিক গড় অটো-লোন বিতরণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ, আর ঋণ বিতরণের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। একইসঙ্গে ঋণের গড় আকারও প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে।
অরূপ হায়দার বলেন, 'বর্তমানে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে তা মূলত সার্কুলারের পরিবর্তনের কারণেই সম্ভব হয়েছে। তবে আমাদের ধারণা, এর পূর্ণ সুফল এখনো পাওয়া বাকি; কারণ এই পরিবর্তনের মাত্র দুই থেকে তিন মাস অতিবাহিত হয়েছে।'
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকেও (এমটিবি) কার-লোনের আবেদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৬ সালের মে থেকে আগস্ট সময়ে ব্যাংকটিতে অটো-লোনের মোট ফাইল জমা ৮৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩৫টিতে, যা জানুয়ারি থেকে এপ্রিল সময়ে ছিল ১৮২টি। এতে মাসিক গড় আবেদন প্রায় ৪৬টি থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৪টি এবং ঋণ অনুমোদনের হার ৭৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৫ শতাংশ।
ব্র্যাক ব্যাংকেও এই খাতে জোরালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ব্যাংকটির গাড়ি কেনার ঋণ বিতরণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পর থেকে তাদের ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৩২ শতাংশ। তাদের অটো-লোন পোর্টফোলিওতে খেলাপি ঋণের হার ২ শতাংশের নিচে রয়েছে।
ব্র্যাক ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রিটেল ব্যাংকিং প্রধান মো. মাহীয়ুল ইসলাম বলেন, গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে 'গ্রাহকরা এখন ক্রমবর্ধমান হারে অটো-লোনকে নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।'
তিনি আরও বলেন, গাড়ি কেনার জন্য গ্রাহকরা এখন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিচ্ছেন, যদিও ব্যাংক সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকটি তাদের ঋণ সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং গাড়ির ডিলারদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব আরও সম্প্রসারিত করেছে।
এমটিবির একজন কর্মকর্তা জানান, নতুন ৮০:২০ ঋণ-ইক্যুইটি সুবিধা এবং দেশের বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির যৌথ প্রভাবেই এই প্রবৃদ্ধিতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি গ্রাহকদের বেশি জ্বালানি খরচ হওয়া গাড়ি পরিহার করে সাশ্রয়ী গাড়ির দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করছে।
এমটিবির ঋণ আবেদনের সিংহভাগই এখন হাইব্রিড ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড ইলেকট্রিক গাড়ির (পিএইচইভি) দখলে। অন্যদিকে চার্জিং সুবিধার স্বল্পতা ও বাজারে খুব বেশি মডেল না থাকায় আবেদনে ইভির হিস্যা এখনও কম হলেও স্থিতিশীল রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে বেশি সুফল পাচ্ছে হাইব্রিড গাড়ি
ঋণ নীতিমালার পরিবর্তনের তাৎক্ষণিক সুফল সবচেয়ে বেশি পাচ্ছে হাইব্রিড গাড়ি।
দেশের বাজারে আগে থেকেই এসব গাড়ির শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠিত বাজার রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য যে পাবলিক চার্জিং অবকাঠামোর প্রয়োজন হয়—যা দেশে এখনও সীমিত—তার ওপর নির্ভর না করেই হাইব্রিড গাড়ি তুলনামূলক কম খরচে চালানো যায়।
জাপানি গাড়ি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মোটরস বে-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ খান বলেন, সংশোধিত অর্থায়ন নীতিমালার ফলে গ্রাহকরা আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন, যা হাইব্রিড গাড়ির বিক্রি বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
প্রতিষ্ঠিত বাজার, কম পরিচালন ব্যয় ও ব্যবহার সুবিধাজনক হওয়ায় হাইব্রিড গাড়ি পূর্ণাঙ্গ বৈদ্যুতিক গাড়ির তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কারণ দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টি এখনও প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে।
ইভিতে আগ্রহ বাড়লেও ব্যবহারের গতি এখনও ধীর
বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রেও অর্থায়নে বড় ধরনের প্রণোদনা এসেছে। ক্রেতারা এখন সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন; ব্যাংকগুলো গাড়ির ক্রয়মূল্যের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থায়ন করছে।
রানার অটোমোবাইলস ও বিওয়াইডি বাংলাদেশের পরিচালক আমিদ সাকিফ খান জানান, ঋণের সর্বোচ্চ সীমা ও অর্থায়নের অনুপাত বাড়ানোর ফলে গ্রাহকদের আগ্রহ এবং ঋণ-সংক্রান্ত খোঁজখবর নেওয়া বেড়েছে।
তবে বিক্রির ওপর এর সামগ্রিক প্রভাব এখনই পুরোপুরি মূল্যায়ন করা কিছুটা আগেভাগে হয়ে যাবে বলে তিনি মনে করেন। কারণ গাড়ি কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় নিয়ে ভাবতে হয়।
রানার অটোমোবাইলস ও বিওয়াইডি বাংলাদেশ সুনির্দিষ্ট বিক্রির পরিসংখ্যান প্রকাশ না করলেও অটোমোবাইল বিষয়ক ডিজিটাল প্রকাশনা প্ল্যাটফর্ম অটো রেবেলিয়নের তথ্যানুযায়ী, দেশের সড়কে এখন ১ হাজার ৬০০টির বেশি বিওয়াইডি গাড়ি চলছে; চলতি বছরের জুনেও এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার।
সাকিফ বলেন, অর্থায়নের অনুপাত বৃদ্ধি ক্রেতাদের এককালীন বা প্রাথমিক খরচের চাপ অনেকটাই কমিয়ে দেয়। তবে ইভি কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণ কেবল একটি ফ্যাক্টর মাত্র। এর পাশাপাশি একবার চার্জে গাড়ি কত দূর যাবে, চার্জিং সুবিধা কতটা সহজলভ্য, বিক্রয়োত্তর সেবা, নির্ভরযোগ্যতা ও গাড়ি ব্যবহারের দীর্ঘমেয়াদি সামগ্রিক খরচের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেন ক্রেতারা।
তিনি জানান, চার্জিং অবকাঠামো সম্প্রসারণ, সার্ভিসিং সক্ষমতা বৃদ্ধি ও গ্রাহক সচেতনতা তৈরিসহ সার্বিক ইভি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে কাজ করছে রানার।
কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি
নতুন হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি ক্রেতাদের ক্রমবর্ধমান ঝোঁক রিকন্ডিশন্ড গাড়ির বাজারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি আবদুল হক বলেন, সহজ অর্থায়ন সুবিধা সামগ্রিকভাবে গাড়ি বিক্রি বাড়াতে সহায়তা করছে ঠিকই, তবে এর সুফল মূলত নতুন গাড়ি—বিশেষত হাইব্রিড ও ইভি ক্রেতারাই বেশি পাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, নতুন গাড়িগুলো বিভিন্ন রাজস্ব সুবিধাও পাচ্ছে, যা রিকন্ডিশন্ড গাড়ির জন্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে ক্রমাগত প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করছে। 'নতুন গাড়িই এ সুবিধা বেশি পাচ্ছে,' বলেন তিনি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ১৯ হাজার ৯৬৮টি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৩৩৭টি ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ২১ হাজার ৫১৯টি।
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, আমদানিকৃত রিকন্ডিশন্ড গাড়ির প্রায় ৮০ শতাংশ শেষপর্যন্ত বিক্রি হয়। সে হিসাবে গত অর্থবছরে আমদানি করা গাড়ির মধ্যে আনুমানিক ১৬ হাজার গাড়ি বিক্রি হয়েছে।
আবদুল হক বলেন, দেশে সংযোজিত নতুন গাড়ি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য বাড়তি ঋণ সুবিধা ও অনুকূল কর কাঠামোর যৌথ প্রভাবে বাজারে অসম প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
