দেশের বিভিন্ন স্থানে ইভি চার্জিং স্টেশন, ব্যাটারি রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট গড়ার পরিকল্পনা সরকারের
চলতি অর্থবছরের বাজেটে বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) উৎপাদন ও আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়ার পর এবার ২০৩০ সালের মধ্যে বৈদ্যুতিক বাস, মোটরসাইকেল ও তিন চাকার যানবাহনের জন্য চার্জিং স্টেশন স্থাপন এবং ইভির ব্যবহৃত ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ও নিরাপদ নিষ্পত্তির জন্য একটি প্ল্যান্ট গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এ লক্ষ্যে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) আর্থিক সহায়তায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ 'বাংলাদেশ এনাবলিং ইলেকট্রিক ভেহিকলস অ্যাডপশন ইন দ্য ফ্রেমওয়ার্ক অব সাসটেইনেবল এনার্জি-বেইজড ট্রান্সপোর্টেশন' শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটির আওতায় বৈদ্যুতিক বাস, মোটরসাইকেল ও তিন চাকার যানবাহনের জন্য চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি দেশে ও বিদেশে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে এ খাতের জন্য দক্ষ জনবলও তৈরি করা হবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) অনুদান হিসেবে দেবে ২৩ কোটি টাকা।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, গত ২৮ জুন বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির অনুমোদনের পর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) কাছে পাঠানো হবে।
বিআরটিসি ডিপোতে চার্জিং স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা
খসড়া প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ডিপোগুলোতে ৩০০ থেকে ৫০০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সুপারফাস্ট চার্জিং সুবিধাযুক্ত চারটি বৈদ্যুতিক বাস চার্জিং স্টেশন স্থাপন করা হবে। প্রতিটি স্টেশনে একসঙ্গে ২০টি বাস চার্জ দেওয়া যাবে।
বাস চার্জিং স্টেশন স্থাপনের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিআরটিসির জোয়ার সাহারা, মিরপুর, গাবতলী, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী ডিপোকে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সরকার মানিকগঞ্জের উথলী, কেরানীগঞ্জের একুরিয়া এবং চট্টগ্রামের বিআরটিসি ডিপোতে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল ও তিন চাকার যানবাহনের জন্য তিনটি সৌরবিদ্যুৎ-সমন্বিত (সোলার-হাইব্রিড) চার্জিং স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। এসব স্টেশন জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ—উভয় উৎস ব্যবহার করে পরিচালিত হবে।
দুই ও তিন চাকার যানবাহনের জন্য প্রতিটি চার্জিং স্টেশনের সক্ষমতা হবে ৮০ কিলোওয়াট। এর মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ আসবে সৌরশক্তি থেকে।
এ ছাড়া বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহৃত ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ও নিরাপদ উপায়ে নিষ্পত্তির জন্য গাজীপুরে বিআরটিসির একটি ডিপোতে ব্যাটারি রিসাইক্লিং ও ডিসপোজাল প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে।
বৈদ্যুতিক গণপরিবহন সম্প্রসারণে জোর
পরিবহন খাতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে সরকারের প্রচেষ্টা জোরদারের অংশ হিসেবেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি ১০০টি বৈদ্যুতিক বাস কেনা এবং ২৫টি চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে বিআরটিসি। এর বাইরে সরকারি অর্থায়নে সংস্থাটির জন্য ৫০ আসনের ১২টি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক বাস কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবিত 'বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট'-এর আওতায় আরও ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস কেনার পরিকল্পনা করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থাটি। প্রকল্পটির খসড়া উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী, এ জন্য বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে ৩০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।
বিশ্বজুড়ে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশও পরিবহন খাতে ইভির প্রসারে উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটের আওতায় সরকারি অর্থে যেসব জিপ বা গাড়ি কেনা হবে, সেগুলো বাধ্যতামূলকভাবে বৈদ্যুতিক হতে হবে বলে চলতি মাসে জারি করা অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
সীমিত চার্জিং অবকাঠামো
খসড়া প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ বৈদ্যুতিক দুই ও তিন চাকার যানবাহন রয়েছে। এর পাশাপাশি কয়েক হাজার প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি আছে, যেগুলোর বেশির ভাগই বাসাবাড়ি ও গ্যারেজে চার্জ দেওয়া হয়।
বর্তমানে দেশে আংশিক সৌরবিদ্যুৎচালিত মাত্র ১৪টি বৈদ্যুতিক যানবাহন চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে। এগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতা ২৪২ কিলোওয়াট। তবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য এসব চার্জিং সুবিধা উপযোগী নয় বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবহন খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড দেশের বিভিন্ন স্থানে আটটি সৌরবিদ্যুৎচালিত চার্জিং স্টেশন স্থাপন করেছে। প্রতিটি স্টেশন ৩০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং একসঙ্গে সর্বোচ্চ ২০টি যানবাহন চার্জ করতে পারে।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ১ হাজার ২০০টি বাণিজ্যিক চার্জিং স্টেশন স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও বাস্তবায়ন নির্দেশিকা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (স্রেডা)।
স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৩২টি বাণিজ্যিক চার্জিং স্টেশনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে বর্তমানে মাত্র নয়টি স্টেশন চালু রয়েছে।
বেসরকারি খাতের আগ্রহ বাড়ছে
জাতীয় বাজেটে বৈদ্যুতিক যানবাহনবান্ধব নীতি গ্রহণের পর এ খাতে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর আগ্রহও বাড়ছে। বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদন ও চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এ খাতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, নাসির গ্রুপ, আকিজ মোটরস, রানার অটোমোবাইলস, প্রাণ-আরএফএল, ওয়ালটন গ্রুপ, টিএমএসএস, প্রগ্রেস মোটরস, সেনা হোটেল (র্যাডিসন ব্লু), কাজী এলপিজি, গুডলাক ফিলিং স্টেশন এবং ঈশা খাঁ গ্রুপ।
