হরমুজ, ইউরেনিয়াম, ইরানের জব্দ সম্পদ: ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে প্রস্তাবিত চুক্তিতে যা আছে
কয়েক সপ্তাহের সংঘাত শেষে চলমান যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী চুক্তিতে রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। সব অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে একটি 'সমঝোতা স্মারক' তৈরির বিষয়ে দুই পক্ষ আলোচনা করছে। যদিও আজই কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হচ্ছে না, তবে এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করবে।
তবে এই সমঝোতা স্মারকের ভেতরে ঠিক কী কী শর্ত থাকছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো, চুক্তি সই হওয়ার পরপরই লড়াই পুরোপুরি বন্ধ করা। এটি উভয় পক্ষের জন্যই স্বস্তির খবর হতে পারে; কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বছরের শেষে মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন এবং ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এই বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ট্রাম্প যে সমঝোতা স্মারকটি চূড়ান্ত করতে যাচ্ছেন, তাতে পর্যায়ক্রমে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এরপর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল ইস্যুগুলো সমাধানের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা শুরু হবে।
প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রোববার সিএনএন-কে বলেছেন, এই প্রাথমিক চুক্তি অনুযায়ী চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য উভয় পক্ষ '৬০ দিন সময় পাবে'।
ওই কর্মকর্তার মতে, এই সম্ভাব্য চুক্তির মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা হবে যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। ইরান তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত ত্যাগের প্রতিশ্রুতি দেবে, যাকে ট্রাম্প প্রায়ই 'পারমাণবিক ধুলো' বলে অভিহিত করেন।
এই মজুত ঠিক কীভাবে ধ্বংস বা সরিয়ে ফেলা হবে, তা আলোচনার পরবর্তী ধাপে নির্ধারিত হবে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, 'চুক্তির কাঠামোটি এমনভাবে তৈরি যে—ইরান যদি শর্ত পূরণ না করে, তবে তারা কিছুই পাবে না। অর্থাৎ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর না করলে কোনো আর্থিক সুবিধাও মিলবে না। হরমুজ প্রণালি যেভাবে খুলবে, নৌ-অবরোধও সেই অনুপাতে শিথিল করা হবে। এটি হবে অত্যন্ত কঠোরভাবে শর্ত যাচাইয়ের একটি প্রক্রিয়া।'
তবে ইরান সরকার এই সমঝোতা স্মারকের বিষয়ে কতটা একমত হবে, তা নিয়ে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম সন্দেহ প্রকাশ করেছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম রোববার জানিয়েছে, সমঝোতা স্মারকের একটি বা দুটি ধারা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
চুক্তির বিষয়ে অনেকটা ঐকমত্য হয়েছে জানানোর পর ট্রাম্প রোববার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো তাড়াহুড়ো করে চুক্তিতে পৌঁছাবে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, তিনি যদি কোনো চুক্তিতে পৌঁছান, তবে তা সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলের চুক্তির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হবে। তার মতে, এটি হবে ওবামার চুক্তির ঠিক বিপরীত, যদিও চুক্তিটির বিস্তারিত এখনো কেউ দেখেনি বা জানে না।
রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, 'আমি যদি ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি করি, তবে তা হবে অত্যন্ত সঠিক ও যথাযথ একটি চুক্তি; ওবামার চুক্তির মতো নয়।'
তিনি দাবি করেন, ওবামার করা চুক্তিটি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একটি পরিষ্কার ও উন্মুক্ত পথ করে দিয়েছিল।
হরমুজ প্রণালি
শনিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকের অধীনে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।
তবে ইরানের বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম (কয়েকটি আইআরজিসি ঘনিষ্ঠ) রোববার জানিয়েছে, এই জলপথটি শেষ পর্যন্ত ইরানের তদারকিতেই থাকবে।
তেহরান আগামী ৩০ দিনের মধ্যে জাহাজ চলাচলের পরিমাণ যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। একই সময়ে তাদের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে।
কিন্তু রোববার ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, 'একটি চুক্তি চূড়ান্ত হওয়া এবং সই হওয়ার আগে এই অবরোধ পুরোপুরি বহাল থাকবে।' তিনি মূলত প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকের চেয়ে একটি চূড়ান্ত চুক্তির ওপরই বেশি জোর দিচ্ছেন।
ইরানি গণমাধ্যমগুলো বলছে, নৌ-চলাচল পুনরায় শুরু হওয়া মানে এই নয় যে তেহরান এই কৌশলগত জলপথের ওপর তার যুদ্ধের সময়কার দাবিগুলো ছেড়ে দিচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে ইরান ইঙ্গিত দিচ্ছে, তারা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিলেও যাতায়াতের ওপর যুদ্ধের আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়।
সিএনএন-কে এক ইরানি সূত্র রোববার জানিয়েছে, 'প্রণালিটি ইতিমধ্যে খোলা আছে, তবে নিরাপদ যাতায়াতের জন্য সংশ্লিষ্ট ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা বাধ্যতামূলক।'
এর আগে শনিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, 'হরমুজ প্রণালির সঙ্গে আমেরিকার কোনো সম্পর্ক নেই। এটি আমাদের এবং ওমানসহ অন্য উপকূলীয় দেশগুলোর মধ্যকার নিজস্ব বিষয়।'
সংঘাত চলাকালীন ইরান বারবার দাবি করেছে, এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর টোল আরোপ করার অধিকার তাদের রয়েছে।
ইউরেনিয়াম মজুত ও সমৃদ্ধকরণ
সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সম্ভাব্য চুক্তির কথা চলছে, তাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে তেহরানের অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির মতে, ইরান তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করার বিষয়ে আলোচনায় বসতে এবং নতুন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখতে সম্মত হবে।
তবে ইরানি কর্মকর্তারা শুরু থেকেই জোর দিয়ে বলছেন, যুদ্ধ শেষ করার সমঝোতা স্মারকটি সই হওয়ার পরেই কেবল ইউরেনিয়াম নিয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গত শনিবার বলেন, 'এই পর্যায়ে পারমাণবিক কোনো বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে না।'
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফারস নিউজ রোববার এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, 'পারমাণবিক মজুত হস্তান্তর করা, যন্ত্রপাতি সরিয়ে ফেলা, স্থাপনা বন্ধ করা কিংবা পারমাণবিক বোমা তৈরি না করার বিষয়ে এই চুক্তিতে ইরান কোনো অঙ্গীকার করেনি।'
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবারই দাবি করে আসছেন, ইরানকে তাদের কাছে থাকা ৯০০ পাউন্ডের বেশি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত যেভাবেই হোক হস্তান্তর করতে হবে। ধারণা করা হয়, গত বছরের মার্কিন হামলার পর এই মজুতের বড় একটি অংশ মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।
প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে বিস্তারিত কোনো শর্ত থাকার সম্ভাবনা নেই। তাই একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যকার এই বিশাল মতপার্থক্য দূর করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকেই এই হামলার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখলে সেটি তার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।
ইরানের জব্দ করা সম্পদ
ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই বিদেশের ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবিলম্বে সচল করার দাবি জানিয়েছে তেহরান।
ইসমাইল বাঘাই বলেন, 'পুরো প্রক্রিয়ার শুরুতেই জব্দ করা সম্পদ ছাড়ের বিষয়টি স্পষ্ট করতে হবে।'
আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম এক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, প্রথম ধাপেই সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ ছাড় না দিলে এবং বাকি অর্থ সচল করার সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা না পেলে কোনো চুক্তি হবে না।
তবে মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সিএনএন-কে জানিয়েছেন, ইরানি সম্পদ তখনই ছাড়া হবে যখন হরমুজ প্রণালি পুনরায় যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত হবে।
বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে থাকা এই অর্থ কীভাবে ফেরত দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র।
নিষেধাজ্ঞা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের আরোপ করা অসংখ্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি কার্যত পঙ্গু হয়ে আছে।
বাঘাই গত শনিবার বলেন, 'খসড়া প্রস্তাবে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি স্পষ্টভাবে থাকলেও, এই অল্প সময়ের মধ্যে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে না।'
তিনি ইঙ্গিত দেন, সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হওয়ার পর বিস্তারিত আলোচনা হবে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি পারমাণবিক ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
ইরানের হিসাব অনুযায়ী, কেবল তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে সরকার প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় করতে পারবে।
মার্কিন এক কর্মকর্তা সিএনএন-কে স্পষ্ট করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু না করা পর্যন্ত ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে না।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র
সংঘাত চলাকালীন মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন, ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করতে হবে। ট্রাম্পও বলেছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অত্যন্ত দ্রুত ও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
তবে সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের ইস্যুটি নিয়ে আগের মতো জোরালো কথা হচ্ছে না, যদিও ইসরায়েল ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলো একে বড় ধরণের ঝুঁকি হিসেবেই দেখছে।
লেবানন
লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে চলা সংঘাত এই চুক্তির আওতায় আসবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাসনিম নিউজ রোববার জানিয়েছে, সমঝোতা স্মারকের খসড়ায় 'লেবাননসহ সকল রণাঙ্গনে যুদ্ধ বন্ধের' কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে জানিয়েছেন যে লেবাননসহ সব ধরণের হুমকির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের 'সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার অধিকারে' তার সমর্থন রয়েছে।
শনিবার সন্ধ্যায় ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে নেতানিয়াহু এই বিষয়টি জোর দিয়ে বলেন এবং ট্রাম্পও তাতে সম্মতি দেন।
শেষ পর্যন্ত ইরান একটি 'ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ' চুক্তির জন্য প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। ইরানি সূত্রের মতে, তাদের জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যেন স্থায়ীভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটে।
