ট্রাম্প প্রশাসনের নিশানায় কিউবা: হুমকি ও তেল অবরোধের বার্তা
শনিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনায় যে ভূকম্পন লাতিন আমেরিকা ও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে কিউবায়।
অভিযানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই—হাভানার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানোর আগেই—দ্বীপ রাষ্ট্রটিজুড়ে ফোনকল ও বার্তায় ছড়িয়ে পড়ে খবর, মাদুরোকে পাহারা দিতে গিয়ে কিউবার অভিজাত নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত কয়েক ডজন সদস্য নিহত হয়েছেন।
রোববার গভীর রাতে কিউবা সরকার যখন এক বিবৃতিতে জানায়, কারাকাসে তাদের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর ৩২ জন সদস্য নিহত হয়েছেন, ততক্ষণে দেশটির সামনে আরও বড় সংকট চলে আসে।
রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট করে দেন, কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের পতন শুধু মাদুরোকে অপসারণের একটি সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়, বরং সেটিই একটি লক্ষ্য ওয়াশিংটনের।
ফ্লোরিডায় ছুটি কাটিয়ে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে ট্রাম্প বলেন, "আমার মনে হয় না আমাদের আলাদা করে কিছু করতে হবে।" মাদুরো এবং ভেনেজুয়েলা থেকে পাওয়া তেল সরবরাহ না থাকলে, তাঁর ভাষায়, "কিউবাকে দেখে মনে হচ্ছে, তারা পতনের দ্বারপ্রান্তে।"
রুবিও আরও একধাপ এগিয়ে ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সেই পতন ত্বরান্বিত করতেও প্রস্তুত। রোববার এনবিসির 'মিট দ্য প্রেস' অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, "আমরা ভবিষ্যতে কী পদক্ষেপ নেব, সে বিষয়ে এখনই বলব না।" তবে যোগ করেন, "আমি যদি হাভানায় থাকতাম এবং সরকারে থাকতাম, তাহলে অবশ্যই উদ্বিগ্ন হতাম।"
এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিকেন্দ্রিক নির্বাসিত কিউবান জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক প্রতিধ্বনি তোলে—যাদের মধ্যে কিউবাকে কমিউনিস্ট শাসন মুক্ত করার প্রচেষ্টা কয়েক দশক ধরে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। শনিবার দক্ষিণ ফ্লোরিডায় কিউবান নির্বাসিতরা—কেউ লাল ট্রাম্প টুপি পরে, কেউ কিউবার পতাকা গায়ে জড়িয়ে—লিটল হাভানা থেকে শুরু করে ডোরাল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যাপনে অংশ নেন। ডোরাল শহরটি 'ডোরালেজুয়েলা' নামেও পরিচিত, সেখানে ভেনেজুয়েলানদের সংখ্যা বেশি। স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ভেনেজুয়েলা নিয়ে ব্যাপকভাবে সংবাদ প্রচার করে, আর তারা বক্তব্য নেয় কিউবান-আমেরিকান নেতাদের, যাঁদের বেশির ভাগই রিপাবলিকান।
মিয়ামি-ডেইড কাউন্টির করসংগ্রাহক দারিয়েল ফের্নান্দেজ বলেন, ভেনেজুয়েলা, নিকারাগুয়া ও লাতিন অঞ্চলের অন্যান্য বামপন্থী সরকারের সমস্যার 'মূল' হলো কিউবা। তাঁর ভাষায়, "এখন সময় এসেছে… ক্যাস্ত্রোর কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক ঘাতক শাসনকেও জবাবদিহির আওতায় আনার এবং কিউবান জনগণকে অবশেষে মুক্ত করার।"
তবে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ছাড়া কিউবা সরকারের পতন হবে কি না—এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার বিশেষজ্ঞরা ততটা নিশ্চিত নন।
মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক এবং কিউবান স্টাডিজ প্রোগ্রামের পরিচালক মাইকেল জে. বুস্তামান্তে বলেন, "ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে অর্থনৈতিক কষ্ট বাড়বে—এতে কিউবা সরকার আপনা থেকেই ভেঙে পড়বে কি না, সে বিষয়ে আমি খুবই সন্দিহান।"
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে কিউবা দীর্ঘদিন ধরে ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নির্ভরশীল। এর বিনিময়ে তারা কারাকাসের বামপন্থী মিত্রদের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতার ভিত্তিতে সেখানে নিরাপত্তা ও চিকিৎসা কর্মী পাঠিয়ে এসেছে।
বুস্তামান্তে বলেন, "আমি ভুলও প্রমাণিত হতে পারি, তবে কিউবা এর আগেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে এবং টিকে গেছে।" তিনি ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বৈদেশিক সহায়তা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার 'বিশেষ সময়কাল'-এর উদাহরণ দেন।
বাইডেন প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক টিমে পশ্চিম গোলার্ধবিষয়ক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হুয়ান গঞ্জালেস বলেন, "তেল সরবরাহ বন্ধ হলে কিউবার মানবিক পরিস্থিতির ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়বে।" দেশটি ইতিমধ্যেই নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও খাদ্যসংকটে ভুগছে। তবে তিনি বলেন, "আমি মনে করি না শাসকগোষ্ঠী সহজে হাল ছেড়ে দেবে।"
ওবামা প্রশাসনের সময় কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের ফলে পর্যটন বাড়া ও সীমিত আকারে ব্যক্তিমালিকানা ও বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়া ছাড়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর কিউবার অর্থনীতি আর কখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং এমনকি সমর্থকদের চোখেও অকার্যকর হয়ে পড়া কিউবান কমিউনিস্ট পার্টির দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে দেশটি বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার দিকে এগিয়েছে।
মাদুরোর পতনের পর সৃষ্ট অনিশ্চয়তার মধ্যেও কেউ কেউ সম্ভাবনা দেখছেন। হাভানায় নিজের বাসা থেকে ফোনে কথা বলা অবসরপ্রাপ্ত কিউবান কূটনীতিক কার্লোস আলজুগারাই বলেন, "নিশ্চয়ই হুমকি বেড়েছে, যা খুবই খারাপ।"
তবে তাঁর মতে, রাশিয়া ও অন্যান্য মিত্র দেশ সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারে, "আর হয়তো সরকার শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি উন্মুক্ত করবে এবং অর্থনীতিবিদরা বহুদিন ধরে যা বলে আসছেন—যা তারা এত দিন প্রত্যাখ্যান করেছে—তা বাস্তবায়ন করবে।"
২০০০-এর দশকের শুরুতে মাদুরোর পূর্বসূরি হুগো চাভেজের আমলে ভেনেজুয়েলার সহায়তা কিউবাকে 'বিশেষ সময়কাল' থেকে বেরিয়ে আসতে এবং কয়েক দশকের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপ সামলাতে সাহায্য করেছিল। এরপর হাভানা ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যু, কোভিড মহামারি, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ওবামা-যুগের সীমিত উন্মুক্ততা বাতিল এবং ২০২১ সালের তীব্র গণবিক্ষোভের ধাক্কাও সামলাতে পেরেছে।
তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের আরও আক্রমণাত্মক প্রশাসন কিউবার নেতৃত্বের জন্য একেবারেই নতুন ধরনের হুমকি তৈরি করেছে।
বছরের পর বছর ধরে কিউবার সরকারি অর্থনীতিবিদরা অর্থনৈতিক সংস্কারের পরামর্শ দিয়ে আসছেন এবং চীন, ভিয়েতনাম ও রাশিয়ার মিত্ররাও তা বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে।
২০০৬ সালে অসুস্থ ভাই ফিদেলের কাছ থেকে ক্ষমতা নেওয়ার পর রাউল কাস্ত্রো ২০১০ সালে পার্লামেন্টে দেওয়া দীর্ঘ ভাষণে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, "আমরা বিপ্লবের জীবন নিয়ে খেলছি। হয় আমরা পরিস্থিতি সংশোধন করব, নতুবা অতল গহ্বরের কিনার ধরে হাঁটতে হাঁটতে সময় ফুরিয়ে যাবে এবং আমরা ডুবে যাব।"
তবে বেসরকারি খাতের ভূমিকা বাড়ানো ও রাষ্ট্রীয় মালিকানা কমানোর তাঁর পরিকল্পনাগুলো পরস্পরবিরোধী এবং অপ্রতুল বাস্তবায়নের কারণে কিউবার কাঠামোগত সমস্যার খুব কমই সমাধান করতে পেরেছে। বাজারদরে পণ্য বিক্রির অনুমতি না দেওয়া, মুদ্রা সংস্কার প্রত্যাখ্যান, লোকসানি পর্যটন খাতে বড় সরকারি বিনিয়োগ এবং সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত জিএইএসএ নামের বৃহৎ কংগ্লোমারেটের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা—এসব কারণে সংস্কারের উদ্যোগ বারবার বাধার মুখে পড়েছে।
প্রতিদিন প্রায় এক লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহের সময় ভেনেজুয়েলা কিউবার নিজস্ব জ্বালানি চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পরিশোধিত তেল বিদেশে বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ করে দিত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে নিজস্ব অব্যবস্থাপনার কারণে গত বছর সেই সরবরাহ নেমে আসে দৈনিক প্রায় ৩০ হাজার ব্যারেলে।
এই কাটছাঁট, সেইসঙ্গে কিউবার পুরোনো শোধনাগার, নাজুক অবকাঠামো ও মাঝেমধ্যে ঘূর্ণিঝড়—সব মিলিয়ে গত বছর দ্বীপটিজুড়ে অন্তত পাঁচবার বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে।
আলজুগারাই বলেন, "তাদের বুঝতে হবে, তারা আর বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে পারে না।" রাশিয়া ও মেক্সিকো কিছু তেল সরবরাহ করেছে, তবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউম শিগগিরই হাভানাকে সহায়তা বন্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি চাপে পড়তে পারেন। কিউবার ঋণের বড় অংশই এখন চীনের, কিন্তু বেইজিং এখন পর্যন্ত সহায়তার তেমন আগ্রহ দেখায়নি।
আলজুগারাই বলেন, "কাগজে-কলমে (কিউবায়) সংস্কার অনুমোদিত হয়েছে। সমস্যা হলো—তারা তা বাস্তবায়ন করে না।" তাঁর মতে, মূল বিষয় হলো বাজার অর্থনীতির উন্মুক্ত করা, বেসরকারি খাত সম্প্রসারণের সুযোগ দেওয়া এবং উৎপাদনহীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ বা বিক্রি করা। "তাদের এটা করতেই হবে, এবং দ্রুত করতে হবে। তারা ইতিমধ্যে অনেক সময় নষ্ট করেছে" – বলেন তিনি।
অধিকাংশ কিউবা-পর্যবেক্ষকই মনে করেন না যে, প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল দিয়াজ-কানেল ও বর্তমান ক্ষমতাকাঠামোর অধীনে প্রকৃত সংস্কার হবে।
বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তা গঞ্জালেস বলেন, "শাসনব্যবস্থার ভেতরে সংস্কারপন্থীরা আছেন। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি আছে, কিন্তু তা বাস্তবায়নের মতো ক্ষমতা বা প্রভাব নেই।"
তিনি আরও বলেন, ধরুন তারা তা করতেও পারলেন, তবুও তা রুবিও ও কিউবান-আমেরিকান আইনপ্রণেতা ও প্রভাবশালী মহলের জন্য যথেষ্ট হবে না। "তারা বড় ধরনের পরিবর্তন চাইবে।"
কিন্তু, ২০২১ সালের বিক্ষোভের পর গ্রেপ্তারের কারণে কিউবার ভেতরের বিরোধী আন্দোলন ছিন্নভিন্ন ও নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছে।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটির লাতিন আমেরিকাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম লিওগ্রান্দে বলেন, "যাঁরা বিরোধী নেতা হতে চান, তাঁরা এখন হয় মিয়ামিতে, নয়তো মাদ্রিদে, নতুবা কারাগারে।" তাঁর মতে, ভেনেজুয়েলার মতো করে কয়েকজন ব্যক্তিকে সরিয়ে দিলেই কিউবার বহুস্তরীয়, সমাজের গভীরে প্রোথিত দলীয় ও সামরিক ক্ষমতাকাঠামো ভেঙে পড়বে—এমনটা সম্ভাবনা খুবই কম।"
কিউবান জনগণের মনোভাব সম্পর্কে আলজুগারাই বলেন, "আমি মনে করি না, কিউবার জনগণ এতটাই মরিয়া যে তারা মার্কিন হস্তক্ষেপ বা মিয়ামির কিছু কিউবান এসে ক্ষমতা দখল করাকে স্বাগত জানাবে।" তাঁর ভাষায়, "মানুষ চায় কিউবান সরকার বদলাক—কিন্তু কিউবার শর্তে, বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো পরিবর্তন নয়।"
