যুদ্ধ বন্ধে আবুধাবিতে প্রথমবারের মতো ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বসেছেন ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রতিনিধিরা। শুক্রবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে এ বৈঠক শুরু হয়। ২০২২ সালে মস্কোর পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর এই প্রথম ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বসল তিন দেশ।
ক্রেমলিনের সহযোগী ইউরি উশাকভ নিশ্চিত করেছেন, আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত 'নিরাপত্তা বিষয়ক ত্রিপক্ষীয় ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম বৈঠকে' ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাশিয়াও যোগ দিয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির আগেই দেওয়া বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বৈঠক করেন। এরপরই এই ত্রিপক্ষীয় আলোচনা শুরু হয়। ওই বৈঠককে ক্রেমলিনের সহযোগী উশাকভ 'বিষয়বস্তুভিত্তিক, গঠনমূলক এবং বেশ খোলামেলা ও গোপনীয়' বলে বর্ণনা করেছেন।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, 'আঞ্চলিক সমস্যার সমাধান ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি মীমাংসার আশা করা উচিত নয়।' তিনি আরও যোগ করেন, কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো না পর্যন্ত রাশিয়া 'রণক্ষেত্রে' নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাবে, যেখানে বর্তমানে রুশ সশস্ত্র বাহিনী সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সাম্প্রতিক প্রচেষ্টাগুলো এখন পর্যন্ত লড়াই থামাতে ব্যর্থ হয়েছে। আলোচনার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মস্কোর দাবি—রাশিয়া যে ভূখণ্ডগুলো নিজেদের বলে দাবি করছে, সেগুলো ইউক্রেনকে ছেড়ে দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক আইনে সার্বভৌম ইউক্রেনের অংশ হিসেবে স্বীকৃত ভূখণ্ডের প্রায় ২০ শতাংশ বর্তমানে রাশিয়ার দখলে রয়েছে। এর মধ্যে লুহানৎস্ক অঞ্চলের প্রায় পুরোটা এবং দোনেৎস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত।
মস্কো দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, ইউক্রেনকে এই চারটি অঞ্চলের পুরোটা তাদের হাতে তুলে দিতে হবে। রাশিয়া এসব অঞ্চল নিজেদের সঙ্গে যুক্ত (অ্যানেক্স) করার ঘোষণা দিলেও এখনো সেগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ শুক্রবার জানিয়েছেন, 'প্রয়োজন হলে' শনিবারও বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। তিনি আরও জানান, অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিভ আলাদাভাবে উইটকফের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করবেন।
আবুধাবির এই ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে রাশিয়ার প্রতিনিধি দলে কেবল দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাই রয়েছেন। দলের নেতৃত্বে আছেন মেইন ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টরেটের প্রধান অ্যাডমিরাল ইগর ওলেগোভিচ কোস্তিউকভ। অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির প্রধান আলোচক রুস্তেম উমেরভ। দলে আরও রয়েছেন প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের উপপ্রধান এবং চিফ অব জেনারেল স্টাফ আন্দ্রি ভনাতভ। হোয়াইট হাউস এখনো এ বৈঠক নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
পুতিন ও উইটকফের বৈঠক শুরু হওয়ার কয়েক মিনিট পরই রাশিয়া জানায়, তাদের দূরপাল্লার বোমারু বিমান বৃহস্পতিবার বাল্টিক সাগরের ওপর দিয়ে পাঁচ ঘণ্টার নির্ধারিত টহল পরিচালনা করেছে। কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে এটিকে শক্তি প্রদর্শনের কৌশল হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
'সমস্যা এখন একটিই'
মস্কোর উদ্দেশে রওনা হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে উইটকফ বলেছিলেন, আলোচনা এখন 'একটিমাত্র বিষয়ে এসে ঠেকেছে'। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, হয়তো সমঝোতা খুব কাছেই।
বৃহস্পতিবার দাভোসে একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, 'আমার মনে হয় আমরা সমস্যাটিকে একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে নিয়ে আসতে পেরেছি এবং আমরা সেটির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছি। এর অর্থ হলো, এর সমাধান সম্ভব।'
পরে একজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা সিএনএনকে নিশ্চিত করেছেন, উইটকফ যে অমীমাংসিত বিষয়টির কথা উল্লেখ করেছিলেন, তা ছিল ভূখণ্ডসংক্রান্ত। তবে এ বিষয়ে তিনি আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।
শুক্রবার ক্রেমলিন আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে তারা এ অবস্থানে অনড় যে, দোনবাস অঞ্চল থেকে ইউক্রেনের সরে যাওয়া একটি 'অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত'।
রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিনের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে রয়েছে ইউক্রেনের দোনবাস এলাকা—যেখানে রয়েছে উর্বর কৃষিজমি এবং গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদী। এই অঞ্চলটি হাতছাড়া হলে মধ্য ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত সমভূমি ভবিষ্যতে যেকোনো রুশ আক্রমণের মুখে অরক্ষিত হয়ে পড়বে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন একটি শান্তি চুক্তি মেনে নেওয়ার জন্য ইউক্রেনের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। তবে ব্যাপক আশঙ্কা রয়েছে, এ ধরনের কোনো সমঝোতা শেষ পর্যন্ত মস্কোর পক্ষেই যেতে পারে।
দাভোসে দেওয়া এক বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা খুবই সন্নিকটে বলে তিনি মনে করেন। জেলেনস্কি ও পুতিনের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, 'আমি বিশ্বাস করি তারা এখন এমন এক অবস্থানে আছে, যেখানে তারা এক হয়ে একটি চুক্তি সম্পন্ন করতে পারে। আর যদি তারা তা না করে, তবে তারা বোকামি করবে।'
বৃহস্পতিবার দাভোসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও এক অগ্নিঝরা ভাষণ দেন। পুতিনের যুদ্ধ থামাতে আরও জোরালো পদক্ষেপ না নেওয়ায় তিনি ইউরোপীয় নেতাদের সমালোচনা করেন। গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে ট্রাম্পের হুমকির পর ইউরোপের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে তিনি এ অবস্থানের তুলনা টানেন।
জেলেনস্কি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, পূর্বাঞ্চলের অমীমাংসিত ভূখণ্ডের বিষয়টিই হবে শান্তি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
তিনি বলেন, 'সবকিছুই আমাদের দেশের পূর্বাঞ্চল নিয়ে, সবকিছুই ওই জমি নিয়ে। এটিই সেই সমস্যা, যার সমাধান এখনো হয়নি।'
এদিকে তীব্র শীতের মধ্যে রাশিয়ার মিসাইল ও ড্রোন হামলার পর ইউক্রেনের ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহহীন অবস্থায় রয়েছেন। ইউক্রেন বর্তমানে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় সচল করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের জ্বালানিমন্ত্রী জানান, 'শত্রুপক্ষের ক্রমাগত হামলার' কারণে ২০২২ সালের শেষের পর থেকে দেশটির বিদ্যুৎ গ্রিড সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে।
