মাদুরোর মুক্তির দাবি নিয়েই ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন দেলসি রদ্রিগেজ
যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজত থেকে নিকোলাস মাদুরোর মুক্তির দাবির মধ্য দিয়েই ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন দেলসি রদ্রিগেজ। দেশটির পার্লামেন্টের এক বিশেষ অধিবেশনে তিনি এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০১৮ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে আছেন ৫৬ বছর বয়সী দেলসি রদ্রিগেজ। গত শনিবার রাতে এক অভিযানে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে যায় মার্কিন বাহিনী। রদ্রিগেজ এই ঘটনাকে 'বেদনাদায়ক' উল্লেখ করে একে সরাসরি 'অপহরণ' বলে অভিহিত করেছেন।
রদ্রিগেজ যখন শপথ নিচ্ছেন, তার ঠিক দুই ঘণ্টা আগে মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদের চারটি অভিযোগে মাদুরোকে নিউইয়র্কের আদালতে তোলা হলে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মাদুরো জোর দিয়ে বলেন, তিনি এখনো ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট।
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র 'সুনির্দিষ্ট আইনি অভিযান' চালিয়েই মাদুরোকে ধরেছে। তিনি মাদুরোকে 'ফেরারি আসামি' হিসেবে অভিহিত করেন।
মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসবাদ, কোকেন পাচার, মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক বিস্ফোরক রাখা এবং এসব সংগ্রহের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে।
সোমবার বিকেলে ম্যানহাটনের আদালতে শুনানি চলাকালে এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শুনানির একপর্যায়ে আদালতের গ্যালারি থেকে এক ব্যক্তি স্প্যানিশ ভাষায় মাদুরোকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে ওঠেন। তিনি বলছিলেন, মাদুরোকে তার কৃতকর্মের 'প্রায়শ্চিত্ত' করতে হবে।
জবাবে মাদুরো ঘুরে দাঁড়িয়ে বলেন, তিনি একজন 'অপহৃত প্রেসিডেন্ট' এবং 'যুদ্ধবন্দী'।
এর আগে ৩০ মিনিটের ওই শুনানিতে মাদুরো বলেন, 'আমি এখনো আমার দেশের প্রেসিডেন্ট।' তখন ৯২ বছর বয়সী বিচারক আলভিন হেলারস্টেইন মাদুরোকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, 'এসব কথা বলার জন্য উপযুক্ত সময় ও স্থান পাওয়া যাবে।'
শুনানি শেষে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে হাতকড়া পরিয়ে আদালতের পেছনের দরজা দিয়ে বের করে নেওয়া হয়।
শনিবারের ওই অভিযানে দেড় শতাধিক যুদ্ধবিমান ও দুই শতাধিক মার্কিন সেনা অংশ নেয়। হামলার কয়েক ঘণ্টা পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভেনেজুয়েলায় একটি 'নিরাপদ, যথাযথ ও ন্যায়সংগত' ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই দেশটি 'চালাবে'।
সোমবার মার্কিন কংগ্রেসের ক্যাপিটল হিলে এ নিয়ে আড়াই ঘণ্টার এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট মাইনরিটি লিডার চাক শুমার ভেনেজুয়েলা নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনা 'অস্পষ্ট' এবং 'আকাশকুসুম কল্পনার' ওপর ভিত্তি করে সাজানো।
শুমার শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, 'ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশেও যে যুক্তরাষ্ট্র একই কাজ করবে না, এমন কোনো নিশ্চয়তা আমি পাইনি।'
তিনি সতর্ক করে বলেন, যখনই যুক্তরাষ্ট্র কোথাও সরকার পরিবর্তন বা তথাকথিত 'রাষ্ট্র পুনর্গঠন' করতে গেছে, দিন শেষে তা যুক্তরাষ্ট্রের নিজের জন্যই ক্ষতি বয়ে এনেছে।
এদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় ঢুকবে। তারা সেখানকার অবকাঠামো ঠিক করবে এবং দেশটির জন্য 'অর্থ উপার্জন শুরু করবে'।
তবে ট্রাম্প যা-ই বলুক না কেন, ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ এখনো মাদুরোর মিত্রদের হাতেই রয়েছে। বিষয়টি ভালোভাবে নিচ্ছেন না ট্রাম্প। মার্কিন সাময়িকী দ্য আটলান্টিক-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভেনেজুয়েলার নতুন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে রীতিমতো হুমকি দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প বলেছেন, রদ্রিগেজ যদি 'সঠিক কাজ' না করেন, তবে তাকে মাদুরোর চেয়েও 'চড়া মূল্য' দিতে হবে।
হুমকির মুখেও আলোচনার পথ খোলা রেখেছেন রদ্রিগেজ। এক ক্যাবিনেট বৈঠকে তিনি বলেন, 'আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে যৌথ উন্নয়নের স্বার্থে আমরা যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে আমাদের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানাই।'
রদ্রিগেজের শপথ অনুষ্ঠানের সময় পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে হাজারো মানুষ জড়ো হন। তারা মাদুরো, তার স্ত্রী এবং নতুন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের প্রতি সমর্থন জানান।
শপথ নিয়ে রদ্রিগেজ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে বলেন, 'অবৈধ সামরিক আগ্রাসনের' কারণে তিনি ব্যথিত। তবে দেশের মানুষের শান্তি, মানসিক স্বস্তি এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিজ্ঞা করেন তিনি।
অধিবেশনে মাদুরোর ছেলে নিকোলাস মাদুরো গুয়েরাও বক্তব্য দেন। তিনি রদ্রিগেজের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন জানান এবং দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, তার বাবা-মা অবশ্যই ভেনেজুয়েলায় 'ফিরে আসবেন'।
এদিকে নিউইয়র্কের আদালতে মাদুরোর মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী ১৭ মার্চ।
