মাদুরোকে তুলে নিতে যুক্তরাষ্ট্র কি আসলেই কোনও ‘গোপন অস্ত্র’ ব্যবহার করেছিল?
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটকের অভিযানে এক গোপন অস্ত্র ব্যবহারের দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এই অস্ত্রকে উল্লেখ করেছেন 'ডিসকম্বোবুলেটর' হিসেবে।
গত শনিবার প্রকাশিত নিউইয়র্ক পোস্ট-এর এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, 'ডিসকম্বোবুলেটর নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলার এখতিয়ার আমার নেই।' তবে তিনি দাবি করেন, অভিযানের সময় এই অস্ত্রটি শত্রুপক্ষের সব সরঞ্জাম অকেজো করে দিয়েছিল।
যদিও এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলছেন, প্রেসিডেন্ট সম্ভবত বেশ কয়েকটি সামরিক প্রযুক্তির সক্ষমতাকে একত্রে এই কাল্পনিক নামে অভিহিত করেছেন, যার আসলে কোনও অস্তিত্বই নেই।
এদিকে ভেনেজুয়েলায় অভিযানের সময় দেশটিকে 'অস্ত্রের গবেষণাগার' হিসেবে ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র, এমনটাই অভিযোগ করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ। তার দাবি, এই অভিযানে এমন সব উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়েছে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি।
মাদুরোকে অপহরণের সেই সামরিক অভিযানের বিস্তারিত তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি মার্কিন সেনাবাহিনী। তবে শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে বা তাদের অবকাঠামো অকেজো করে দিতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই আধুনিক প্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহার করে আসছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাদ্রিনো লোপেজ জানান, গত ১৬ জানুয়ারি কারাকাসে মার্কিন হামলায় ভেনেজুয়েলার ৪৭ জন সেনা সদস্য নিহত হন। এ ছাড়া কিউবার ৩২ জন সেনাও প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজন মাদুরোর নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন।
'অস্ত্রের গবেষণাগার' সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে লোপেজ বলেন, 'মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেই স্বীকার করেছেন যে তারা এমন অস্ত্র ব্যবহার করেছেন যা বিশ্বের আর কারও কাছে নেই। ভেনেজুয়েলার জনগণের ওপর সেই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে।'
'মাথা যেন ফেটে যাচ্ছিল'
যুক্তরাষ্ট্রের ভাণ্ডারে 'অ্যাক্টিভ ডিনায়াল সিস্টেম' বা তাপ বিকিরণকারী এক ধরনের অস্ত্র দীর্ঘ সময় ধরে রয়েছে। এটি মূলত অদৃশ্য ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গের মাধ্যমে মানুষের ত্বকে তীব্র জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে তাদের হটিয়ে দেয়। মাদুরোকে ধরার অভিযানে এটিও ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অভিযানের কয়েক দিন পর হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট ভেনেজুয়েলার এক নিরাপত্তারক্ষীর একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন। সেখানে ওই রক্ষী দাবি করেন, অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু ছুড়েছিল যা 'তীব্র শব্দতরঙ্গের' মতো মনে হচ্ছিল। তিনি লিখেছিলেন, 'হঠাৎ আমার মনে হলো মাথাটা ভেতর থেকে ফেটে যাচ্ছে। আমাদের সবার নাক দিয়ে রক্ত পড়ছিল, কেউ কেউ রক্তবমি করছিল। আমরা নড়াচড়া করার শক্তি হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম।'
৩ জানুয়ারির ওই অভিযানের সিএনএন-এর একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুরুতেই ভেনেজুয়েলার রাডার, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর ওপর একের পর এক হামলা চালানো হয়। মার্কিন জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, স্থল ও সমুদ্রের ২০টি ঘাঁটি থেকে বোমারু বিমান ও ড্রোনসহ প্রায় ১৫০টি যুদ্ধবিমান এই অভিযানে অংশ নেয়।
উপকূলীয় শহর হিগুয়েরোতে ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে 'ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন' বা আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ফোর্ট টিউনা সামরিক কমপ্লেক্সের ভেতরে মার্কিন বাহিনী যখন অবতরণ করে, তখন সেখানে ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যায়। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার থেকে ৩০ মিলিমিটার অটো-ক্যাননের মাধ্যমে এই গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। তবে ফোর্ট টুনার ঠিক কোন জায়গায় মাদুরোকে বন্দি করা হয়েছিল এবং সেই মুহূর্তে ঠিক কী ঘটেছিল, তার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বিশেষ এই অস্ত্র আসলে কী?
যুক্তরাষ্ট্র এর আগে কী ধরনের সনিক বা অকেজো করার অস্ত্র ব্যবহার করেছে—এ বিষয়ে কথা বলেছেন ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এলিজা ম্যাগনিয়ার। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পরিচিত সনিক সিস্টেম হলো 'লং রেঞ্জ অ্যাকুস্টিক ডিভাইস' বা এলআরএডি।
ম্যাগনিয়ার বলেন, 'এগুলো গতানুগতিক কোনো অস্ত্র নয়। এগুলো মূলত শক্তিশালী শব্দ প্রক্ষেপক যন্ত্র। জাহাজ থামানো, ঘাঁটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বা জনতা নিয়ন্ত্রণের কাজে এগুলো ব্যবহার করা হয়।'
এই যন্ত্রের মূল কাজ হলো উচ্চশব্দে কণ্ঠস্বর বা সংকেত পাঠিয়ে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। এর তীব্র শব্দে অস্বস্তি তৈরি হয়, যা মানুষকে কোনো নির্দেশ মানতে বা এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য করে। এলআরএডি উচ্চমাত্রায় ব্যবহার করলে কানে ব্যথা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা শ্রবণশক্তি নষ্ট হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এই প্রযুক্তি দিয়ে কোনো ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম বা যোগাযোগ ব্যবস্থা অকেজো করা সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এলআরএডি সিস্টেম শব্দকে একটি সরু তরঙ্গের মতো নির্দিষ্ট দিকে ছুড়ে দিতে পারে। এর মাত্রা কম থাকলে অনেক দূর থেকেও কথা স্পষ্ট শোনা যায়। কিন্তু মাত্রা বাড়িয়ে দিলে তা মানুষের শরীর ও মনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
বিশ্লেষক এলিজা ম্যাগনিয়ার বলেন, 'এর প্রভাব কেবল শারীরিক ও মানসিক। ইলেকট্রোম্যাগনেটিক বা তড়িৎচৌম্বকীয় সরঞ্জামের মতো এটি কোনো ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার, কম্পিউটার বা যোগাযোগব্যবস্থা অকেজো করতে পারে না।'
অন্যদিকে, অ্যাডস প্রযুক্তি মানুষের ত্বকের ওপরের স্তরে দ্রুত তাপ সৃষ্টি করে। এতে শরীরে তীব্র অস্বস্তি তৈরি হয় এবং মানুষ সেই জায়গা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। এটি মূলত ভিড় নিয়ন্ত্রণ বা সীমানার নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যবহৃত একটি 'নন-লিথাল' অস্ত্র।
ম্যাগনিয়ারের মতে, এই দুটি সিস্টেমের কোনটিই বাস্তবিকভাবে কোনো দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা সামরিক সরঞ্জাম অকেজো করতে পারে না। যদি ভেনেজুয়েলার অভিযানে সামরিক সরঞ্জাম অকেজো হয়ে থাকে, তবে তা সাইবার আক্রমণ বা তড়িৎচৌম্বকীয় কোনো পদ্ধতির মাধ্যমে করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অকেজো করতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী মূলত কয়েক ধরনের বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে। সেগুলো হলো,
- ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা: এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষের রাডার জ্যাম করে দেওয়া, যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করা এবং জিপিএস বা সেন্সরকে বিভ্রান্ত করা হয়। এর ফলে শত্রুপক্ষ বুঝতে পারে না তাদের ওপর কখন বা কীভাবে হামলা হচ্ছে।
- সাইবার অপারেশন: এর মাধ্যমে কোনো দেশের নেটওয়ার্ক বা শিল্প নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় অন্তর্ঘাতমূলক কাজ চালানো হয়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ২০০৯ সালের 'স্টাক্সনেট' (Stuxnet) ক্যাম্পেইন। এর মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রের সফটওয়্যার বদলে দিয়ে সেখানকার সেন্ট্রিফিউজগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছিল।
- মাইক্রোওয়েভ অস্ত্র: এটি মূলত উচ্চশক্তির মাইক্রোওয়েভ পালস ব্যবহার করে ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের সার্কিট পুড়িয়ে দেয়। 'চ্যাম্প' নামের এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো কোনো রকম শারীরিক শক্তি প্রয়োগ বা ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়াই প্রতিপক্ষের সব ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম অকেজো করে দেওয়া।
- গ্রাফাইট বোমা: এই বিশেষ ধরনের বোমা কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস না করেই শর্ট-সার্কিটের মাধ্যমে পুরো এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।
ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা মূলত কোনো অঞ্চলের তড়িৎচৌম্বকীয় পরিবেশকে বদলে দেয় বা বাধাগ্রস্ত করে। এটি রাডার ব্যবস্থাকে এমনভাবে বিভ্রান্ত করে যে, রাডারের পর্দায় অনেকগুলো ভুয়া লক্ষ্যবস্তু দেখা যায়। এতে রেডিও যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় এবং জিপিএস ও সেন্সর ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়ে।
এলিজা বলেন, 'এর মূল লক্ষ্য হলো শত্রুকে অন্ধ ও বিভ্রান্ত করে দেওয়া, যাতে আক্রমণের সুযোগ তৈরি হয়।'
২০০৯ সালে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে 'স্টাক্সনেট' নামের একটি কম্পিউটার ওয়ার্ম বা ভাইরাস ব্যবহার করা হয়েছিল। এটি সেখানকার শিল্প নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে নিজের দখলে নিয়ে যান্ত্রিক ক্ষতি সাধন করে। ধারণা করা হয়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যৌথভাবে এই সাইবার হামলা চালিয়েছিল।
অন্যদিকে, উচ্চশক্তির মাইক্রোওয়েভ সিস্টেম কোনো দৃশ্যমান ক্ষতি ছাড়াই ইলেকট্রনিক সার্কিট পুড়িয়ে দিতে পারে। ২০১০ সালের দিকে জনসমক্ষে করা কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যবস্তুর ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম অকেজো করা সম্ভব।
এছাড়া গ্রাফাইট বা কার্বন-ফাইবার বোমা ক্ষুদ্র পরিবাহী তন্তু ছড়িয়ে দিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে শর্ট-সার্কিট ঘটিয়ে দেয়। ১৯৯১ ও ২০০৩ সালে ইরাকে এবং ১৯৯৯ সালে সার্বিয়ায় বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পেছনে এই অস্ত্রের ভূমিকা ছিল বলে জানান ম্যাগনিয়ার। তিনি বলেন, 'কৌশলটি সব সময় একই থাকে—প্রথমে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও সেন্সর ব্যবস্থা অকেজো করে দেওয়া, এরপর মূল হামলা শুরু করা।'
অন্য দেশ যখন যুদ্ধের গবেষণাগার
যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন অস্ত্রের পরীক্ষা কি যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম করছে? ম্যাগনিয়ারের মতে, এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, অনেক দেশই করে। আধুনিক যুদ্ধগুলো মূলত নতুন প্রযুক্তির বাস্তব পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে প্রথমবার স্টিলথ বিমান, নিখুঁত লক্ষ্যভেদী বোমা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থার ব্যাপক ব্যবহার দেখা গিয়েছিল। আবার ২০০৯ সালে ইরানের ওপর সাইবার হামলা ছিল কৌশলগত স্তরে কোনো 'সাইবার-ফিজিক্যাল' অস্ত্রের প্রথম ব্যবহার।
২০১৭ সালে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবার 'মাদার অফ অল বোম্ব' ব্যবহার করে। এটি পারমাণবিক বোমা না হলেও এর বিস্ফোরণ ক্ষমতা প্রচণ্ড। মাটির নিচে থাকা সুড়ঙ্গ বা সুরক্ষিত দুর্গ ধ্বংস করতে এটি ব্যবহার করা হয়।
ম্যাগনিয়ার জানান, 'পরীক্ষা' মানেই সব সময় গোপন ট্রায়াল নয়। বরং বাস্তব পরিস্থিতিতে নতুন কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেটির কার্যকারিতা যাচাই করা এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরে সেটিকে আরও উন্নত করা। অনেক দেশই ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা, সাইবার অপারেশন বা মহাকাশ গবেষণার মতো বিষয়গুলো গোপনে পরীক্ষা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরও একটি অভিযোগ তুলে ম্যাগনিয়ার বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ও সরঞ্জাম পরীক্ষার জন্য ইসরায়েলকে ব্যবহার করে। মূলত ফিলিস্তিন, লেবানন ও ইরানের বিরুদ্ধে এসবের পরীক্ষা চালানো হয়।'
মজার ব্যাপার হলো, যুক্তরাষ্ট্র নিজেও অন্য দেশের বিরুদ্ধে 'সনিক ওয়েপন' ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছিল। ২০১৭ সালে কিউবার হাভানায় মার্কিন কূটনীতিকদের ওপর সন্দেহভাজন শব্দতরঙ্গ হামলার পর বিষয়টি নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছিল ওয়াশিংটন।
তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেছিলেন, কিউবার রাজধানীতে তাদের মিশনে 'স্বাস্থ্য আক্রমণ' চালানো হয়েছে। এর ফলে অনেক কর্মীর শ্রবণশক্তি কমে গিয়েছিল এবং তাদের হাভানা ছাড়তে হয়েছিল। কানাডা সরকারও জানিয়েছিল, কিউবায় তাদের অন্তত একজন কূটনীতিকের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
তবে ট্রাম্প যে 'ডিসকম্বোবিউলেটর' শব্দটির ব্যবহার করেছেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট বা স্বীকৃত সামরিক সংজ্ঞা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো নির্দিষ্ট যন্ত্রের নাম নয়, বরং কোনো কিছুকে ভড়কে দেওয়া বা অকেজো করে দেওয়ার একটি অনানুষ্ঠানিক নাম মাত্র।
এলিজার মতে, 'ডিসকম্বোবিউলেটর' কোনো বিশেষ নতুন প্রযুক্তি নয়। এটি সম্ভবত আগে থেকেই থাকা ইলেকট্রনিক বা সাইবার যুদ্ধকৌশলের একটি রাজনৈতিক নাম। এটি হতে পারে কয়েক ধরনের প্রযুক্তির সমন্বয়। যেমন:
- কমান্ড নেটওয়ার্ক লক্ষ্য করে চালানো সাইবার হামলা।
- অ্যান্টেনা বা সেন্সর লক্ষ্য করে চালানো সরাসরি হামলা।
- নির্দিষ্ট এলাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া।
ম্যাগনিয়ার বলেন, বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে যে সব সরঞ্জাম হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। তবে শব্দতরঙ্গ বা সনিক ডিভাইসের মাধ্যমে বড় কোনো সামরিক সরঞ্জাম অকেজো করে দেওয়া প্রায় অসম্ভব।
অভিযানের সময় ভেনেজুয়েলার রাশিয়া-নির্মিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কাজ করেনি বলে খবর পাওয়া যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এর মানে এই নয় যে কোনো 'জাদুকরী' অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। বরং সাইবার হামলা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা বা পরিচালনাগত দুর্বলতার কারণে এটি অকেজো হয়ে পড়তে পারে। এর আগে সিরিয়াতেও ইসরায়েলি হামলার সময় রাশিয়ার তৈরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটতে দেখা গেছে।
কারাকাসে অভিযানের সময় সেখানকার সেনাদের মধ্যে নাক দিয়ে রক্ত পড়া বা বমি হওয়ার মতো যে শারীরিক উপসর্গ দেখা দিয়েছিল, তা কোনো নতুন 'সনিক ওয়েপন'-এর প্রমাণ দেয় না।
ম্যাগনিয়ারের মতে, প্রচণ্ড বিস্ফোরণের চাপ, ফ্ল্যাশ-ব্যাং ডিভাইস (তীব্র আলো ও শব্দ সৃষ্টিকারী গ্রেনেড) বা সাধারণ কোনো বিভ্রান্তিকর অস্ত্রের প্রভাবেও এমনটা হতে পারে। তাই নতুন কোনো রহস্যময় অস্ত্রের ব্যবহারের সপক্ষে এখনো কোনো জোরালো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।
