ভেনেজুয়েলার চাবিকাঠি এখন ট্রাম্পের হাতে, মন গলাতে মরিয়া মাচাদো ও রদ্রিগেজ
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বর্তমানে অনেকটাই বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলা। দেশটির ভবিষ্যৎ কী, তা দেখার অপেক্ষায় কোটি মানুষ। এর মধ্যেই দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিতে লড়াইয়ে নেমেছেন দুই নারী নেত্রী। তাদের লক্ষ্য এখন দুটি—দেশের ক্ষমতা নিজেদের হাতে রাখা এবং সেই সাথে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থন আদায়।
লড়াইয়ের এক পক্ষে আছেন বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া করিনা মাচাদো। নোবেলজয়ী এই নেত্রী ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র ফেরানোর লড়াইয়ের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আলোচনায় আসেন। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে তিনি শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর থেকে মাচাদো অনেকটা আড়ালেই ছিলেন। ওই নির্বাচনে সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন নির্বাচন কর্তৃপক্ষ মাদুরোকে বিজয়ী ঘোষণা করে। তবে দুই সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর এক অভাবনীয় অভিযানে মাদুরো আটক হন।
মাচাদোর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন দেলসি রদ্রিগেজ। মাদুরোর শাসনামলে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন, এখন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। তাকে 'পুরোনো পন্থী' এবং মাদুরোর কট্টর সমর্থক হিসেবেই মনে করা হয়। তবে একদিকে ওয়াশিংটনকে খুশি করা, অন্যদিকে দেশে মাদুরোর অনুগতদের সামাল দেওয়া—সব মিলিয়ে দেলসি এখন কঠিন এক সমীকরণের মুখোমুখি।
ভেনেজুয়েলার এই ক্ষমতার লড়াইয়ের মূল চাবিকাঠি যার হাতে, তিনি বসে আছেন দুই হাজার মাইলেরও বেশি দূরে; প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কারাকাসে সেই প্রাণঘাতী অভিযানের নির্দেশ তিনিই দিয়েছিলেন। ঘোষণাও দিয়েছিলেন, আপাতত ভেনেজুয়েলার শাসনভার যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই থাকবে।
ট্রাম্প অবশ্য ভেনেজুয়েলায় দ্বিতীয় কোনো হামলার নির্দেশ এখনো দেননি, তবে সামরিক হস্তক্ষেপের শঙ্কা কিন্তু পুরোপুরি কাটেনি। সমুদ্রে সন্দেহভাজন মাদক চোরাকারবারিদের জাহাজে কয়েক মাস ধরে হামলার পর সম্প্রতি তিনি জানিয়েছেন, তার প্রশাসন এখন স্থলভাগের মাদকচক্রগুলোর ওপর নজর দেবে। কারাকাসকে চাপে রাখতে ক্যারিবিয়ান সাগরে বিশাল এক মার্কিন সামরিক বহরও মোতায়েন রেখেছেন তিনি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভেনেজুয়েলার হাল শেষ পর্যন্ত কে ধরবেন বা দেশটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কেমন হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর।
আপাতদৃষ্টিতে সমীকরণটি সহজ মনে হতে পারে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে দেলসি রোদ্রিগেজের প্রশংসা করেছেন। অন্যদিকে, নিজের প্রশাসনে মাচাদোর প্রভাবশালী সমর্থক থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প এখনো তাকে সমর্থন দেননি।
তবে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের অতীতের আলোচনাগুলো বলে দেয়, তার মত যেকোনো সময় দ্রুত বদলে যেতে পারে। তার প্রশংসা নিমিষেই হুমকিতে রূপ নিতে পারে, আবার উল্টোটাও হতে পারে।
যেমন, গত ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বৈঠকটি ছিল বিপর্যয়কর। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ফিরে পেতে ইউক্রেনকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এগিয়ে আসতে হয়েছিল ইউরোপীয় মিত্রদের। আবার নিউইয়র্কের নতুন মেয়র জোহরান মামদানির কথাই ধরা যাক। মেয়র নির্বাচনের সময় ট্রাম্প তার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু হোয়াইট হাউসে প্রথম বৈঠকেই ট্রাম্পকে মুগ্ধ করে ফেলেন মামদানি।
ভেনেজুয়েলার দুই নেত্রী মাচাদো ও রদ্রিগেজ—উভয়েই মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখছেন। বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ফোনে দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। রদ্রিগেজকে 'চমৎকার মানুষ' হিসেবে অভিহিত করে ট্রাম্প বলেন, 'আমাদের বোঝাপড়াটা বেশ ভালোই যাচ্ছে।'
যোগাযোগের ক্ষেত্রে মাচাদো অবশ্য এক ধাপ এগিয়ে তিনি সরাসরি ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। হোয়াইট হাউসের সময়সূচি অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেওয়ার কথা তার। তবে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ পেলেও মাচাদোর পথচলা খুব একটা মসৃণ না-ও হতে পারে। এর নেপথ্যে রয়েছে সেই কাঙ্ক্ষিত নোবেল শান্তি পুরস্কার।
হোয়াইট হাউসের ভেতরে মাচাদোর বেশ কয়েকজন শক্তিশালী মিত্র রয়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাদের একজন, যিনি মাচাদোর কাজের প্রশংসা করেছিলেন এবং ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য তার নাম প্রস্তাব করেছিলেন। এমনকি শপথ নেওয়ার আগে ট্রাম্প নিজেও মাচাদোকে 'মুক্তিযোদ্ধা' বলেছিলেন।
কিন্তু ট্রাম্প যে নিজেই নোবেল পেতে চান, তা তো গোপন কিছু নয়। গত সপ্তাহেই ট্রাম্প আক্ষেপ করে বলেছেন, 'ইতিহাসে আমার চেয়ে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য আর কাউকে দেখি না। আমি বড়াই করছি না, তবে আমি ছাড়া আর কেউ যুদ্ধ থামায়নি।'
মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, নেতা হওয়ার মতো সমর্থন বা গ্রহণযোগ্যতা নিজ দেশে মাচাদোর নেই। তবে ট্রাম্পকে খুশি করতে চেষ্টার কমতি রাখেননি মাচাদো। গত অক্টোবরে নোবেল জয়ের পর তিনি পুরস্কারটি আংশিকভাবে ট্রাম্পকে উৎসর্গ করেছিলেন।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মাচাদো এমনও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে নিজের পুরস্কারটি তিনি ট্রাম্পকে দিয়ে দিতে চান। যদিও নরওয়েজিয়ান নোবেল ইনস্টিটিউট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই পুরস্কার হস্তান্তরযোগ্য নয়। মাচাদোর প্রস্তাব শুনে ট্রাম্প বলেছিলেন, পুরস্কারটি পেলে তিনি সম্মানিত বোধ করবেন। তবে এর বিনিময়ে মাচাদো ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বে ট্রাম্পের সমর্থন পাবেন কি না, সে বিষয়ে সরাসরি কোনো উত্তর মেলেনি।
এরই মধ্যে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গেও 'কোনো একসময়' দেখা করতে আগ্রহী। তবে রোদ্রিগেজ এখন বেশ কঠিন এক পরিস্থিতির মধ্যে আছেন। তাকে খুব সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে। একদিকে জনসমক্ষে তিনি মার্কিন অভিযানের কড়া সমালোচনা করছেন। মাদুরোকে আটক করাকে 'বর্বরতা' এবং ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে সুর নরম করতে বাধ্য হয়েছেন রদ্রিগেজ। তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে 'সহযোগিতার এজেন্ডা' নিয়ে এগোনোর প্রস্তাব দিচ্ছেন। শান্তির বার্তা হিসেবে তার সরকার ইতিমধ্যে কারাবন্দী কয়েকজনকে মুক্তি দিতে শুরু করেছে। মুক্তি পাওয়া এসব বন্দীর মধ্যে কয়েকজন প্রভাবশালী মার্কিন নাগরিকও রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রদ্রিগেজের সম্পর্কটা বেশ জটিল। তার প্রতিদ্বন্দ্বী মাচাদো মনে করিয়ে দিয়েছেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন ভেনেজুয়েলার এই ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট। যদিও রদ্রিগেজ বারবার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তবে এত সবের মধ্যেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে বছরের পর বছর কাজ করে গেছেন। বিশেষ করে তেলের বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি সম্পর্কটা ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। উল্লেখ্য, বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের খনি রয়েছে ভেনেজুয়েলাতেই।
২০১৭ সালে রদ্রিগেজ যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন, তখন ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির মাধ্যমে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ কমিটির তহবিলে ৫ লাখ ডলার অনুদান দেওয়া হয়েছিল। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। এমনকি ২০১৯ সালে কারাকাসে বন্ধ হয়ে যাওয়া মার্কিন দূতাবাস আবার খোলার সম্ভাবনা যাচাই করতে মার্কিন শার্জ ডি অ্যাফেয়ার্স জন ম্যাকনামারার সফরেরও অনুমতি দিয়েছেন।
হোয়াইট হাউসকে খুশি করার এই প্রচেষ্টা আপাতত কাজে আসছে বলেই মনে হচ্ছে। ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তারা রদ্রিগেজকে একজন স্থিতিশীল ও বাস্তববাদী নেতা হিসেবেই দেখছেন, যার সঙ্গে কাজ করা যায়। এ ছাড়া রদ্রিগেজ লাভজনক ব্যবসায়িক সুযোগের জন্যও দরজা খোলা রেখেছেন। বুধবারই ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রির প্রথম খবর পাওয়া গেছে।
তবে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের লাতিন আমেরিকা বিষয়ক ফেলো উইল ফ্রিম্যান মনে করেন, রোদ্রিগেজ 'খুবই কঠিন এক দ্বিমুখী খেলা' খেলছেন। এই খেলায় তিনি জিতবেনই, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
গত সপ্তাহে সিএনএনকে ফ্রিম্যান বলেন, 'রদ্রিগেজকে একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনকে বোঝাতে হবে যে তিনি তাদের লক্ষ্য পূরণে সহযোগিতা করছেন। অন্যদিকে মাদুরো সরকারের কট্টরপন্থী অংশ ও সেনাবাহিনীকে আশ্বস্ত করতে হবে যে তিনি তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না।'
