রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় হাদিকে হত্যা, নির্দেশদাতা পল্লবীর সাবেক কাউন্সিলর বাপ্পী: ডিবি
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার চার্জশিট প্রদান সম্পর্কে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা শাখা) মো. শফিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, 'শরিফ ওসমান হাদি বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অঙ্গনে অতিপরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেন। তিনি বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের বিগত দিনের কার্যকলাপ সম্পর্কে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনামূলক জোরালো বক্তব্য রাখতেন। তার এসব বক্তব্যে ছাত্রলীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা চরমভাবে ক্ষুব্ধ হন।'
তদন্তের বরাত দিয়ে তিনি আরও জানান, হাদিকে সরাসরি গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ফয়সাল ও অপর আসামি আলমগীরকে পলায়নে সহায়তা করা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী ছিলেন পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি ও ৬ নং ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ মনোনীত কাউন্সিলর। আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং ভুক্তভোগীর পূর্ববর্তী রাজনৈতিক বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়েই শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে।
চার্জশিটের বিস্তারিত তুলে ধরে শফিকুল ইসলাম বলেন, 'সার্বিক তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় রেকর্ড করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা, অস্ত্র ও গুলির ফরেনসিক রিপোর্ট এবং মোবাইলসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষার রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে আসামিদের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে। এর ভিত্তিতে ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো নতুন তথ্য বা কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।'
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চার্জশিটভুক্ত ১৭ আসামির মধ্যে ১২ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি ৫ জন এখনো পলাতক। পলাতক আসামিরা হলেন: হাদিকে সরাসরি গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ, মোটরসাইকেল চালক আলমগীর শেখ, তাদের পালাতে সহায়তা করা মানবপাচারকারী ফিলিপ স্নাল, হত্যার নির্দেশদাতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী এবং ফয়সালের বোন জেসমিন।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, হাদি হত্যার মূল নির্দেশদাতা ও পরিকল্পনাকারী ছিলেন পল্লবীর সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী।
ভারতে পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ডিবি প্রধান বলেন, 'মাত্র চার্জশিট দেওয়া হলো। আদালত চার্জ গঠন করার পর তাদের হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এটি রাষ্ট্রীয় অন্য সংস্থা করবে, তবে ডিবিকে দায়িত্ব দিলে আমরাও কাজ করব।'
মূল আসামি ফয়সালের একটি ভিডিও বার্তার বিষয়ে তিনি বলেন, 'ভিডিও বার্তাটি সঠিক হলেও তার অবস্থান দুবাই নয়। ডিবির তদন্ত অনুযায়ী ফয়সাল বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।'
উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর দুপুর সোয়া ২টার দিকে রাজধানীর বক্স কালভার্ট এলাকায় রিকশায় করে যাওয়ার সময় ওসমান হাদির ওপর আক্রমণ হয়। মোটরসাইকেলে করে এসে দুজন তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করে পালিয়ে যায়। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।
এরপর তাকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসা শেষে ওই রাতেই এভারকেয়ার হাসপাতালে আনা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় শরিফ হাদি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
