স্বতন্ত্র পে-স্কেল, ঝুঁকিভাতা, ওভারটাইমসহ পুলিশের একগুচ্ছ দাবি; বাস্তবায়নের আশ্বাস সরকারের
পুলিশ সদস্যদের ঝুঁকিভাতা, ওভারটাইম ডিউটির বিল, স্বতন্ত্র পে-স্কেল, সুদমুক্ত মোটরসাইকেল ঋণ এবং ধাপে ধাপে সম্মানসূচক (অনারারি) পদোন্নতির মতো একগুচ্ছ দাবি উঠে এসেছে পুলিশ সপ্তাহের 'প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কল্যাণ প্যারেডে'। সরকার পুলিশের এসব দাবি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছে।
রোববার (১০ মে) রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ মিলনায়তনে আয়োজিত এই কল্যাণ প্যারেডে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে পুলিশ সদস্যরা তাদের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সদস্যদের দাবিগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং সেগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন।
ওভারটাইম ও ঝুঁকিভাতার দাবি
নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে নিয়মিত অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় পুলিশের পক্ষ থেকে ওভারটাইম ডিউটির জন্য অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ বিল এবং ঝুঁকিভাতা দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, 'পুলিশের কর্মঘণ্টার নির্দিষ্ট সীমা নেই। ডিউটি রোস্টারের বাইরেও সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই ওভারটাইম ও ঝুঁকিভাতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়েছে।'
এসআইদের জন্য সুদমুক্ত মোটরসাইকেল ঋণ
তদন্ত কার্যক্রমে নিয়োজিত উপ-পরিদর্শকদের (এসআই) যাতায়াত সমস্যার কথা তুলে ধরে সুদমুক্ত মোটরসাইকেল ঋণের দাবি জানানো হয়। পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, অধিকাংশ থানায় তদন্ত কর্মকর্তাদের জন্য পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় ব্যক্তিগত খরচে তাদের চলাচল করতে হয়। মোটরসাইকেল কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ ও জ্বালানি খরচের সুবিধা দেওয়া হলে তদন্ত কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে বলে জানান ওসি কামরুল হাসান।
স্বতন্ত্র পে-স্কেল ও অনারারি পদোন্নতি
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর মতো পুলিশের জন্যও আলাদা বা স্বতন্ত্র পে-স্কেল চালুর বিষয়টি দীর্ঘদিনের দাবি, যা এই কল্যাণ প্যারেডে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হয়েছে।
কল্যাণ প্যারেডে অংশ নেওয়া খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক নারী কনস্টেবল চাকরির শেষ পর্যায়ে সম্মানসূচক (অনারারি) পদোন্নতির দাবি জানান। তিনি বলেন, 'অনেক সদস্য একই পদে দীর্ঘদিন চাকরি শেষে অবসরে যান। সেনাবাহিনীর মতো অবসরের আগে সম্মানসূচক পদোন্নতি দেওয়া হলে সদস্যদের মধ্যে প্রেরণা বাড়বে।' এ ক্ষেত্রে কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পদ পর্যন্ত ধাপে ধাপে অনারারি পদোন্নতির ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়।
অবকাঠামো ও সাইবার ইউনিটের প্রস্তাব
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, পুলিশ মেস, ব্যারাক, থানা ভবন, ফাঁড়ি ও অন্যান্য অপারেশনাল ইউনিটের অবকাঠামো উন্নয়নে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এই বরাদ্দ পুনরায় চালুর দাবি জানানো হয়েছে।
এছাড়া সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বিভাগীয় শহরগুলোতে স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ সাইবার ইউনিট গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন কর্মকর্তারা। বর্তমানে অধিকাংশ সাইবার কার্যক্রম কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে সক্ষমতা তৈরি হয়নি বলে তারা জানান।
স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক সহায়তা
দীর্ঘ কর্মঘণ্টার কারণে পুলিশ সদস্যদের মানসিক চাপের বিষয়টি তুলে ধরে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে পুলিশ হাসপাতাল সম্প্রসারণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালুর দাবি জানানো হয়। বিশেষ করে সাইকিয়াট্রিক (মনোরোগ) সেবার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার অনুরোধ করা হয়।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ও আশ্বাস
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশের যৌক্তিক দাবিগুলো সরকারের আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের বিশেষ নীতিমালার আওতায় ওভারটাইম ভাতা দেওয়ার বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
এছাড়া পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষায় কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতাল আধুনিকায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তব্যে প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবিক পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার বিষয়ে সরকারের অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, 'চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাইবার পুলিশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বিগ ডেটা বিশ্লেষণসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরও সম্প্রসারণ করা জরুরি। সরকার এ লক্ষ্যেই একটি আধুনিক ও দক্ষ পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে।'
