ট্রাম্পের শুল্কারোপ: ২০২০ সালের পর বিশ্ববাজারে সবচেয়ে বড় ধস, পাল্টা ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি চীন-ইউরোপের

বিশ্ববাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতি ঘিরে শুরু হয়েছে বড় ধরনের অস্থিরতা। বুধবার হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া ঘোষণার পরপরই বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে তীব্র ধস নেমেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ট্রাম্পের এই আগ্রাসী শুল্কনীতি যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। খবর বিবিসির।
ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত সব ধরনের পণ্যের ওপর ন্যূনতম ১০ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করা হবে। তার দাবি, এতে করে ফেডারেল রাজস্ব আয় বাড়বে এবং স্থানীয় শিল্পায়নে গতি আসবে। তবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এর প্রভাব হতে পারে সম্পূর্ণ উল্টো—পণ্যের দাম বেড়ে যাবে, ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়বে এবং বিনিয়োগে তৈরি হবে অনিশ্চয়তা।
নতুন এই শুল্কনীতির জেরে বৃহস্পতিবার একদিনেই এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৪ দশমিক ৮ শতাংশ পড়ে যায়, যা করোনা মহামারির সময়ের পর সর্বোচ্চ পতন। এতে মার্কিন বাজারে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্য হারিয়ে গেছে। ডাও জোন্স ৪ শতাংশ এবং প্রযুক্তি খাত-নির্ভর নাসডাক সূচক প্রায় ৬ শতাংশ নিচে নেমেছে।
এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ববাজারেও। শুক্রবার সকালে জাপানের নিকেই ২২৫ সূচক ২ দশমিক ৭ শতাংশ ও অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ সূচক ১ দশমিক ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচকও ছিল সামান্য নিচের দিকে। তবে চীন ও হংকংয়ের বাজার বন্ধ ছিল কুইংমিং উৎসবের কারণে।
বৃহস্পতিবার লন্ডনের এফটিএসই ১০০ সূচক ১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ইউরোপের অন্যান্য বাজারেও উল্লেখযোগ্য দরপতন হয়।
শুল্কের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ভোক্তাপণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর ওপর। এসঅ্যান্ডপিতে শীর্ষ ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল নাইকি, অ্যাপল ও টার্গেট—তিনটিই ৯ শতাংশের বেশি দর হারিয়েছে।
এশিয়ায় উৎপাদিত স্পোর্টসওয়্যারের জন্য পরিচিত নাইকি কোম্পানির শেয়ার একপর্যায়ে ১৪ শতাংশ কমে যায়। অ্যাপল, যাদের উৎপাদন অনেকাংশেই চীন ও তাইওয়ানভিত্তিক—শেয়ার কমেছে ৯ শতাংশ। খুচরা বিক্রেতা টার্গেটের শেয়ারও পড়ে গেছে প্রায় ১০ শতাংশ।
শুল্ক আরোপের কারণে ইউরোপের খুচরা পণ্য উৎপাদনকারীরাও ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। অ্যাডিডাসের শেয়ার ১০ শতাংশের বেশি ও পুমার শেয়ার ৯ শতাংশ পড়ে গেছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাল্টা শুল্কের শিকার হওয়া মোটরসাইকেল প্রস্তুতকারী হার্লি-ডেভিডসনের শেয়ার এবারও কমেছে ১০ শতাংশ।
বিলাসবহুল পণ্যের কোম্পানি পানডোরা ১০ শতাংশ দর হারিয়েছে এবং এলভিএমএইচ (লুই ভিটন, মোয়েট, হেনেসি) ৩ শতাংশ নিচে নেমেছে।
চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর যথাক্রমে ৫৪ শতাংশ এবং ২০ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই ঘোষণার পরপরই চীন ও ইইউ পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, তার দেশও প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেবে। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত যানবাহনের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। উল্লেখ্য, এর আগেই ট্রাম্প কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক বসিয়েছেন, যদিও বুধবারের ঘোষণায় এই দুই দেশকে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ট্রাম্পের এই ঘোষণায় 'গভীর উদ্বেগ' প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি আশঙ্কা করছে, এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিমাণ চলতি বছরে ১ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন শুল্কনীতি যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন এই শুল্কের অতিরিক্ত খরচ নিজেরা বহন করা, সরবরাহকারীদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা অথবা ভোক্তাদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতে পণ্যের দাম বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক চাহিদার ওপর।
বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা ব্যয়ই ১০ থেকে ১৫ শতাংশ অবদান রাখে। ফলে মার্কিন বাজারে দুর্বলতা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দিতে পারে।

বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান প্রিন্সিপাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট জানিয়েছে, ইউরোপে এর ফলে প্রবৃদ্ধি প্রায় ১ শতাংশ কমে যেতে পারে, যদি ইইউ পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। একই প্রতিষ্ঠানের প্রধান বৈশ্বিক কৌশলবিদ সিমা শাহ বলেন, 'শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার যে লক্ষ্য ট্রাম্প নিয়েছেন, তা যদি বাস্তবায়ন হয়ও, তাতে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু তার আগেই এই শুল্কনীতির ফলে অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।'
ইতিমধ্যে শুল্কের জেরে কর্মসংস্থানেও ধাক্কা লেগেছে। গাড়ি নির্মাতা স্টেলান্টিস জানিয়েছে, ট্রাম্পের ২৫ শতাংশ করের কারণে তারা মেক্সিকোর টলুকা ও কানাডার উইন্ডসর কারখানায় উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। এর জের ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি কারখানায় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় প্রায় ৯০০ কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতেও ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসী। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানান, বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা উদারনীতিক নীতি তিনি উল্টে দিতে চান। এই উচ্চঝুঁকিপূর্ণ কৌশলের পক্ষে তিনি আবারও অবস্থান নেন।
তিনি বলেন, 'আমি মনে করি, সবকিছুই খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে। এটা অনেকটা একজন রোগীর বড় কোনো অস্ত্রোপচারের মতোই—আমি আগেই বলেছিলাম, এমনটাই হবে।'
ট্রাম্প আরও বলেন, 'বাজার উন্নতি করবে, শেয়ারবাজার উন্নতি করবে, দেশও উন্নতি করবে।'
তবে হোয়াইট হাউসের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা জানাচ্ছেন, নতুন শুল্ক আরোপ কোনো কৌশল নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি নীতির অংশ। যদিও ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, যদি কোনো দেশ 'অসাধারণ কিছু' দিতে চায়, তবে আলোচনার পথ খোলা থাকবে।
এদিকে, শেয়ারবাজারে ধসের মধ্যেও স্বর্ণের বাজারে উল্টো প্রবণতা দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার একপর্যায়ে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম বেড়ে ৩ হাজার ১৬৭ দশমিক ৫৭ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা একটি নতুন রেকর্ড। এরপর অবশ্য কিছুটা কমে আসে। মার্কিন ডলারের মানও দুর্বল হয়ে পড়ে বিশ্বের অন্যান্য মুদ্রার তুলনায়।
বিশ্ববাজারে চলমান অস্থিরতা নিয়ে ফ্রিডম ক্যাপিটাল মার্কেটস-এর প্রধান কৌশল বিশ্লেষক জে উডস বলেন, 'আপনি এখন দেখছেন, খুচরা বিক্রেতারা কার্যত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, কারণ শুল্কের পরিধি এমন সব দেশে পৌঁছেছে, যেগুলোকে আমরা লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ভাবিনি।' তিনি আরও বলেন, সামনে আরও অস্থিরতা দেখা যেতে পারে।
অনুবাদ: সাকাব নাহিয়ান শ্রাবন