সরকারের প্রস্তাবিত গণমাধ্যম কমিশনকে ‘জোড়াতালি’ আখ্যা দিলেন কামাল আহমেদ
গণমাধ্যম সংস্কারের নামে সরকারের প্রস্তাবিত সম্প্রচার কমিশন ও গণমাধ্যম কমিশন গঠনের উদ্যোগকে 'জোড়াতালি' আখ্যা দিয়ে একে ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক বলে মন্তব্য করেছেন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান কামাল আহমেদ। তিনি বলেন, বিটিআরসি ও প্রেস কাউন্সিলের মতো বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো বহাল রেখে নতুন কমিশন গঠন করলে দায়িত্বের ওভারল্যাপ, দ্বন্দ্ব ও অকারণ জটিলতা তৈরি হবে।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) সংবাদমাধ্যমের স্বনিয়ন্ত্রণ বিষয়ক এক আলোচনা সভায় কামাল আহমেদ বলেন, সরকার শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে দেখাতে চাইছে যে তারা অনেক কিছু করছে বা করেছে। তিনি মন্তব্য করেন, 'এই জোড়াতালি বা স্টিচিং আপ পদ্ধতি বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।'
কামাল আহমেদ জানান, সরকার সম্প্রচার কমিশন ও গণমাধ্যম কমিশন এই দুটি কমিশনের খসড়া প্রস্তুত করেছে। এর মধ্যে সম্প্রচার কমিশনের খসড়া ইতোমধ্যে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে এবং গণমাধ্যম কমিশনের খসড়া শিগগিরই প্রকাশ করা হতে পারে। তবে বিদ্যমান বাংলাদেশ টেলিকম রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) ও প্রেস কাউন্সিল বহাল রেখে নতুন কমিশন গঠন করলে কার্যকর সমাধান আসবে না বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, 'বিটিআরসি রেখেই সম্প্রচার কমিশন করা হচ্ছে। ফলে লাইসেন্সিং ও কনটেন্ট রেগুলেশনে ওভারল্যাপ হবে। একইভাবে প্রেস কাউন্সিল রেখেই গণমাধ্যম কমিশন করা হলে সাংবাদিকতা সংক্রান্ত বিরোধ কে দেখবে—প্রেস কাউন্সিল না কমিশন—সে প্রশ্ন থেকেই যাবে।'
কামাল আহমেদ বলেন, সরকার ও বাইরের চাপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করে গণমাধ্যমের ভেতর থেকেই স্বনিয়ন্ত্রণ (সেলফ রেগুলেশন) গড়ে তোলা জরুরি। এজন্য প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে স্পষ্ট সম্পাদকীয় নীতিমালা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সংবাদমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থার সংকট গভীর উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করে যে সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করে। এই আস্থা ছাড়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা টিকবে না।'
সোশ্যাল মিডিয়ার অপতথ্য ও বটনির্ভর প্রচারণাকেও বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন কামাল আহমেদ। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিমভাবে তৈরি জনমতকে প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। এছাড়া গণমাধ্যমের বিনিয়োগ ও আয়ের উৎসে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, 'সব অর্থ যে হালাল পথে আসে—এমন বিশ্বাসের কারণ নেই। মিডিয়ার সফট পাওয়ার অনেক সময় অপব্যবহার করা হচ্ছে।'
প্রেস কাউন্সিলের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর ওপর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় প্রেস কাউন্সিল কোনো বিবৃতি না দেওয়াকে তিনি ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীল কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা আশা করা যায় না। তিনি বলেন, প্রেস কাউন্সিল বাতিল করে মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে একটি স্বাধীন স্বনিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
