ভেনেজুয়েলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র—মাদুরোকে আটকের পর ট্রাম্পের ঘোষণা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার বলেছেন, ভেনেজুয়েলা এখন থেকে সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে বন্দি করে নিউইয়র্কে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ট্রাম্প এই ঘোষণা দেন।
ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসর্টে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, 'নিরাপদ, যথাযথ ও সুবিবেচনাপ্রসূত ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরাই দেশটি চালাব। ভেনেজুয়েলার জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবে না—এমন কারও হাতে দেশটির ক্ষমতা চলে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে পারি না আমরা।'
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও জানান, এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় কার্যক্রম শুরু করবে। বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুত থাকা এই দেশটির জরাজীর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো সংস্কারের কাজ করবে তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে।
তবে সংবাদ সম্মেলনে তেলের ওপর অতিমাত্রায় গুরুত্বারোপ করায় সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন। মাদুরোকে বন্দি করা এবং মাদকবাহী নৌযান সন্দেহে চালানো প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাগুলোকে ট্রাম্প প্রশাসন একটি সাধারণ আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রে মাদক সরবরাহ বন্ধ করা। তেলের প্রসঙ্গ আসায় সমালোচকরা এখন সেই অভিযানের নেপথ্য উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন।
ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, রাতভর চলা এই নাটকীয় অভিযানে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের কিছু অংশে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং বেশ কিছু সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। মার্কিন বিশেষ বাহিনী মাদুরোকে তার একটি সেফ হাউস বা তার আশপাশ থেকে বন্দি করে।
শনিবার সন্ধ্যায় মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে প্রথমে উপকূলের কাছে একটি মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে নেওয়া হয় এবং পরে বিমানে করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ভিডিওতে দেখা গেছে, নিউইয়র্ক সিটি থেকে প্রায় ৯৭ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমের স্টুয়ার্ট ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে একটি বিমান অবতরণ করার পর বেশ কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা তাতে আরোহণ করেন। মার্কিন বিচার বিভাগের একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, মাদুরো নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন। পরে কড়া পুলিশি পাহারায় একটি বিশাল গাড়িবহরকে ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে প্রবেশ করতে দেখা যায়।
মাদুরোর বিরুদ্ধে 'নারকো-টেররিজম' ষড়যন্ত্রসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বিচার বিভাগের ওই কর্মকর্তার তথ্যমতে, আগামী সোমবার ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে তাকে প্রথমবারের মতো হাজির করা হতে পারে। তার স্ত্রীর বিরুদ্ধেও কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্রসহ বেশ কিছু অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে ট্রাম্প ঠিক কীভাবে ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। দেশটির মূল ভূখণ্ডের ওপর বর্তমানে মার্কিন বাহিনীর কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। এছাড়া মাদুরোর সরকার এখনো ক্ষমতায় সক্রিয় বলে মনে হচ্ছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতা করার কোনো আগ্রহ তাদের নেই।
যুক্তরাষ্ট্র যখন দেশটির নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবে, তখন ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বে কে থাকবেন, সে বিষয়েও ট্রাম্প নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি।
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ভেনেজুয়েলার সরকার ও সেনাবাহিনী এখনো কার্যকর থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কীভাবে দেশটি চালাবে—সাংবাদিকদের বারবার করা এমন প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দেননি ট্রাম্প।
তিনি শুধু বলেন, 'আমার ঠিক পেছনে যারা দাঁড়িয়ে আছেন (রুবিও ও হেগসেথ), তারাই দেশটির দেখভাল করবেন।' প্রয়োজনে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সেনা পাঠানোর ব্যাপারেও তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, 'সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে সেনা মোতায়েন করতে আমরা ভয় পাই না।'
এদিকে ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আদেশ দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। শনিবার বিকেলে দেশটির সরকারি টেলিভিশনে শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে হাজির হয়ে ডেলসি এই পুরো ঘটনাকে 'অপহরণ' বলে অভিহিত করে এর তীব্র নিন্দা জানান।
১২ বছর ধরে ভেনেজুয়েলা শাসন করা মাদুরোকে অপসারণের ফলে কলম্বিয়া, ব্রাজিল, গায়ানা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলসংলগ্ন এই দেশটিতে বড় ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হতে পারে। তবে ট্রাম্প স্পষ্ট বলেছেন, তিনি বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সাথে কাজ করবেন না।
ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মাচাদোর কোনো যোগাযোগ নেই। গত বছর শান্তিতে নোবেলজয়ী এই নেত্রী সম্পর্কে তিনি বলেন, 'দেশের ভেতরে তার কোনো জনসমর্থন বা সম্মান নেই।'
ভেনেজুয়েলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সামরিক উপস্থিতির বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য ইরাক ও আফগানিস্তান আক্রমণের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। ওই দুটি দেশেই বহু বছর ধরে অত্যন্ত ব্যয়বহুল দখলদারিত্ব এবং হাজার হাজার মার্কিন সেনার প্রাণহানির পর শেষপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে পিছু হটতে হয়েছিল।
ট্রাম্প দাবি করেন, তার প্রথম মেয়াদসহ এ পর্যন্ত সব সামরিক অভিযানেই তিনি কেবল 'বিজয়' পেয়েছেন। তবে এর আগে কোনো অভিযানেই অন্য কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে এভাবে সরাসরি ক্ষমতাচ্যুত করার নজির নেই। অতীতে ট্রাম্প নিজেই এ ধরনের হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেছিলেন। ২০১৬ সালের এক নির্বাচনী বিতর্কে তিনি ইরাক আক্রমণকে একটি 'বিশাল ভুল' বলে অভিহিত করেছিলেন। ২০২১ সালে বলেছিলেন, তিনি গত কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে কোনো নতুন যুদ্ধ শুরু না করার জন্য গর্বিত।
এর আগে ৩৭ বছর আগে পানামার সামরিক নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে মাদক পাচারের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত করতে লাতিন আমেরিকায় এভাবে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। মাদুরোর বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্র তাকে একটি 'নার্কো-স্টেট' (মাদক-রাষ্ট্র) পরিচালনার দায়ে অভিযুক্ত করেছে। এছাড়া ২০২৪ সালের নির্বাচনেও কারচুপির দাবি তুলেছে।
৬৩ বছর বয়সি মাদুরো একসময় বাস চালক ছিলেন। ২০১৩ সালে হুগো শ্যাভেজ মারা যাওয়ার আগে তাকে উত্তরসূরি মনোনীত করেন। মাদুরো সব সময় মার্কিন অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন মূলত ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের দখল নিতেই এসব করছে।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ১৮২৩ সালের 'মনরো ডকট্রিন'-এর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্যের দাবি করা হয়েছিল। এছাড়া ১৯০০-র দশকের শুরুর দিকে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের 'গানবোট ডিপ্লোম্যাসি'র ছায়াও এতে দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প নিজেও সংবাদ সম্মেলনে এই তুলনার সঙ্গে একমত পোষণ করেন এবং রসিকতা করে বলেন, এর একটি আধুনিক সংস্করণ হতে পারে 'ডনরো ডকট্রিন'।
লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের সরকার মাদুরোর বিরোধিতা করেছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনেও কারচুপির অভিযোগ তুলেছে। কিন্তু তারপরও ভেনেজুয়েলার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও তেল সম্পদের ব্যবহারের বিষয়ে ট্রাম্পের দম্ভোক্তি তাদের মধ্যে পুরনো ক্ষত জাগিয়ে তুলেছে। ওই অঞ্চলের দেশগুলো সাধারণত মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরোধী।
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই যুক্তরাষ্ট্রের এই হস্তক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে মেক্সিকো এই হস্তক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা ডা সিলভা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি 'অগ্রহণযোগ্য সীমা' অতিক্রম করেছে।
ভেনেজুয়েলার প্রধান দুই সমর্থক দেশ রাশিয়া ও চীন মার্কিন পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছে।
