মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই কেন আফগান সেনাবাহিনী ভেঙে পড়ল
পেন্টাগনের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল মার্ক মিলি চলতি সপ্তাহে সাংবাদিকদেরকে বলেছিলেন, মার্কিন গোয়েন্দা গোষ্ঠীর অনুমান ছিল মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করা হলে তালেবানদের হাতে আফগান বাহিনীর পতন ঘটতে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস লেগে যেতে পারে। কিন্তু তাদের পতন ঘটলো মাত্র ১১ দিনেই। ফলে আফগান সেনাবাহিনীর দ্রুত পতন বিশ্বজুড়ে যাদের হতবাক করে দিয়েছে, তন্মধ্যে এই কর্মকর্তাও রয়েছেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা ভুল হওয়ার পেছনে রয়েছে আফগান সামরিক বাহিনীকে জর্জরিত করা দীর্ঘস্থায়ী কিছু চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে নিরক্ষরতা, দুর্নীতি, অক্ষমতা এবং অন্যতম প্রধান সমস্যা, কাবুল সরকারের প্রতি বিশ্বাসের অভাব।
আফগানিস্তানের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষক এবং 'দ্য আমেরিকান ওয়ার ইন আফগানিস্তান'- এর লেখক কার্টার মালকাসিয়ান তালেবানদের কাছে দেশটির পতন বিষয়ে বলেন, তালেবান একটি আদর্শ সামনে রেখে এগিয়েছে এবং আফগান পরিচয় ধারণকারী মূল্যবোধকে বিদেশী হানাদারের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য তারা যুদ্ধ করেছিলো।
নেতৃত্বের অভাব
২০১৬ সালে কান্দাহারের সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় ২৩ বছর বয়সী ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট হায়াতুল্লাহ ফ্রোতানের সাথে দেখা হয় মার্কিন গণমাধ্যম এনপিআরের। তিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সেই সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
সেসময় তিনি এনপিআরকে বলেছিলেন, সরকার নিহত সৈন্যদের পরিবারকে সাহায্য করবে না। তিনি বলেন, "কোনো সেনা মৃত্যুবরণ করার পর তাদের বিষয়ে নেই কোনো নীতি বা কোনো ভালো পরিকল্পনা। সরকার যদি তাদের মৃত্যু পরবর্তী সুবিধাসহ পরিবারের জন্য নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাহলে সৈন্যদের মনোবল বাড়বে এবং সিংহের মত লড়বে তারা"।
"এছাড়াও, তাদের মধ্যে ছিল নেতৃত্বের অভাব। সৈন্যদলকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য যোগ্য কমান্ডার খুঁজে পেতে সংগ্রাম করতে হয়েছে আফগান ন্যাশনাল আর্মিকে। বছরের পর বছর আমরা মার্কিন সেনাবাহিনী দ্বারা প্রশংসিত আফগান জেনারেলদেরকে দেখেছি, এবং পরবর্তীতে অযোগ্যতা বা দুর্নীতির জন্য তাদেরকে পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে বলে জেনেছি"।
এমনকি সৈন্যদের জন্য বরাদ্দ বেতনও আত্মসাৎ করতেন কিছু জেনারেল। এছাড়া, অনেকেই তাদের সৈন্যদলের জন্য উন্নত জাতের চাল না কিনে সাশ্রয়ী এবং নিম্নমানের চাল কিনে খরচের বাকি অংশ নিজেরা নিয়ে নিতেন। একইসাথে সৈন্যদের উষ্ণ থাকার জন্যে সরকার প্রদত্ত জ্বালানি কাঠও বিক্রি করেছে অনেকে।
ফ্রোতান বলেছিলেন যে, এ সিস্টেমটিতে স্বজনপ্রীতি চলছিলো এবং সৈন্যদের প্রতি যথেষ্ট আনুগত্যও ছিল না। নেতারা শুধু দুর্নীতিবাজই ছিলেন না, তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন নিরক্ষর।
"তারা লিখতে বা পড়তে জানে না। পেশাদার সৈনিক কিভাবে হতে হয় বা নেতৃত্ব কিভাবে দিতে হয় তা জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ," বলেন ফ্রোতান।
শিক্ষার অভাব মূলত রাইফেল, যানবাহন বা অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ অর্ডার করা এবং এসকল সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণের মত মৌলিক সমস্যাগুলোর দিকে ধাবিত করে। তাছাড়া, যেহেতু এ সকল নেতারা লিখতে জানতেন না, তার মানে তারা সঠিকভাবে মানচিত্রগুলো পড়তেও পারেননি। ৬ বছর আগে তালেবানদের উপর বোমাবর্ষণকারী একটি আফগান সেনা ইউনিটের সাথে ছিল এনপিআর। সঠিকভাবে গ্রিড কো-অর্ডিনেশন করতে না পারায় নিশানা থেকে তাদের নিক্ষেপিত বোমা এক কিলোমিটার দূরে যেয়ে পড়েছিল। শুধু তাই নয়, ফ্রোতান জানান, সৈন্যদেরকে ছুটি দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজের মত সামান্য কাগজপত্র তৈরি করতেও সমস্যা হত কমান্ডারদের।
তিনি বলেন, "তাদের যথেষ্ট জ্ঞান না থাকায় ছুটির জন্য ভালো একটি সময়সূচীও তৈরি করতে পারেনা তারা। ছুটির সঠিক সময়সূচী না থাকায় সৈন্যদের শক্তি ক্ষয় এবং দুর্বল হয়ে যাওয়ার হার ছিল বেশি"।
"কয়েক বছর আগে একজন মার্কিন জেনারেল আমাদেরকে বলেছিলেন, আফগান অফিসাররা যে কেবল লিখতে বা পড়তে পারেনা তা নয়, এমনকি তারা গণনা করতেও অক্ষম। তিনি আরও উল্লেখ করেন, কতজন সৈন্য দরকার তা অফিসারদেরকে বোঝানোর জন্য মাটিতে বড় আয়তক্ষেত্র এঁকে অফিসারদেরকে বলা হত যে সে আয়তক্ষেত্র পূর্ণ করতে যে ক'জন লোক দরকার তাদের সেই পরিমাণ সেনাই প্রয়োজন"।
একটি কঠিন সময়
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০০১ সাল থেকে প্রায় ৬০ হাজার সৈন্য ও পুলিশ অফিসার যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন। এরমধ্যে গত ছয় বছরে মৃতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
মৃত্যুর উচ্চহারের কারণে নতুন নিয়োগকারীদের একটি ধারাবাহিকতা বজায় থাকতো। এসকল সৈন্যের প্রাথমিক প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন ছিল। ফ্রোতান বলেন, "মেজর কেভিন ম্যাককর্মিকের মত মার্কিন সামরিক প্রশিক্ষকেরা আমাদের বলেছিলেন যে, উন্নত সামরিক দক্ষতা শেখানো একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া"।
ম্যাককর্মিক বলেন, "এটির জন্য অনেক সময় লাগে, কম সময়ের প্রক্রিয়া নয় এটি। এসবের জন্য একটানা প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার প্রয়োজন"।
এদিকে আফগান সৈন্যদের সাথে কথোপকথনে আমরা অন্যান্য অভিযোগও শুনেছি। সৈন্যরা যাতে তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে না পারে এজন্যে কমান্ডাররা তাদেরকে সিম কার্ড ব্যবহার করতে দিত না। অনেক সৈন্যই দেশত্যাগ করে বা পুনরায় তালিকায় নাম লেখানো থেকে বিরত থাকে।
এছাড়া, আরো অনেক চ্যালেঞ্জ সামনে আসছিল। ২০১০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আফগান সৈন্যদের সাথে একটি যুদ্ধ ফাঁড়িতে ছিল এনপিআর। ভোর হবার আগেই আমেরিকানরা টহলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকলেও আফগান বাহিনীর মধ্যে অনেকেই ছিলো অর্ধসজ্জিত। এছাড়া, খাবার চাইতে থাকা কিছু সৈন্যের শরীর থেকে আসছিলো হাশিসের গন্ধ। দুই বছর পর আরেকটি মার্কিন ইউনিটের সাথে ছিল এনপিআর। সেখানকার একজন সার্জেন্ট তার সৈন্যদেরকে বলছিলেন যে তিনি আফগান ন্যাশনাল আর্মির কাছ থেকে কি আশা করছেন। তিনি বলেন, "এএনএ নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছে। যদি তারা নেতৃত্ব দিতে না চায় তাহলে তাদেরকে আপনাদের সামনে নিয়ে এগিয়ে যান"।
মার্কিনদের সমর্থন ছাড়া আফগানরা সামান্য কিছুই করতে পারতো, এবং মাঠে থাকা সৈন্যরাই কেবল এ সত্যটা জানতো। কিন্তু এ পুরো সময় জুড়ে প্রতিরক্ষা বিভাগ থেকে শুরু করে কংগ্রেস এবং হোয়াইট হাউজেও কর্মকর্তারা একই কথা বলতেন যে, আফগান বাহিনী প্রতিনিয়ত উন্নত হচ্ছে। এমনকি তারা কঠোর লড়াইয়ের পাশাপাশি নেতৃত্বও দিচ্ছে বলে উল্লেখ করা হত।
আফগানিস্তান পুনর্গঠনের জন্য বিশেষ মহাপরিদর্শক জন সাপকোর অসংখ্য প্রতিবেদনে এ সমস্যাগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ফুলব্রাইটের শুনানির মত এ প্রতিবেদনগুলোও কংগ্রেসের সদস্যদেরকে প্রভাবিত করেনি বলে মনে হয়।
এ বছর যখন তালেবানরা তাদের অগ্রযাত্রা শুরু করে, তখন ভঙ্গুরভাবে চলা আফগান ন্যাশনাল আর্মি আর টিকে থাকতে পারেনি। একইসাথে তালেবানদের বিরুদ্ধে চালানো মার্কিন বিমান হামলাও ততদিনে বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে, যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানানো আফগান সৈন্যদেরকে তালেবানরা অর্থ প্রদান করেছিল বলে আমাদেরকে জানায় একজন সৈনিক। যুদ্ধ করতে না চাওয়া অফিসারদেরকে সর্বাধিক অর্থ দেয়া হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এমনকি এ অবস্থায় উচ্চপদস্থ সামরিক নেতারাও হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। কাবুলে বর্তমানে পলায়নরত থাকা আফগান বাহিনীর একজন কর্নেল এনপিআরকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, এরকম ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব দেয়া অসম্ভব, এবং এর ফলে সেনারাও অনেকাংশে প্রভাবিত হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, "নেতৃত্ব থেকেই সদিচ্ছা আসে। নেতৃত্বে যারা থাকে তারাই অধীনস্তদেরকে আশা দেন।"
আফগান কমান্ডো
এ যুদ্ধে আরেকটি অত্যন্ত শক্তিশালী শক্তি ছিলো, যারা হলেন আফগান কমান্ডোরা। তারা ছিলেন উচ্চ প্রশিক্ষিত সৈনিক। ৩ লাখ আফগান সৈন্যের মধ্যে থাকা প্রায় ২২ হাজার কমান্ডোই ছিল আফগানের যুদ্ধ শক্তির মেরুদণ্ড। বছরের পর বছর ধরে তারা দেশজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো এবং যুদ্ধ করতে না পারা বা যুদ্ধ না করা আফগান সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলোকে সহায়তা করছিল। তবে এ বিষয়ে প্রায়ই এনপিআর-এর সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ আসে। একজন বলেছিলেন যে, তাদেরকে বিশেষ মিশনের জন্য রাখা হয়েছিলো, সাধারণ অপারেশনের জন্য নয়।
শেষের সপ্তাহগুলোতে তালেবান যখন দেশজুড়ে অগ্রসর হয়, তখন কমান্ডোরা বাস্তবতার মুখোমুখি হন। দক্ষিণের একজন কমান্ডো বলেছিলেন যে, তার ইউনিটের কেউই আত্মসমর্পন করতে চায় নি। তারা তালেবানদের সাথে যুদ্ধের জন্য তৈরি ছিল, কিন্তু কাবুল সরকার তাদেরকে আত্মসমর্পনের নির্দেশ দেয়।
তিনি বলেন, "আমরা আর নিরাপদ ছিলাম না। বন্ধুদের বাড়িতে তখন আশ্রয় নিতে হয়েছিল আমাদের, এবং এখন আমরা লুকিয়ে আছি।"
দেশের সকল কমান্ডো ইউনিট ভেঙে পড়ার পর কাবুলের ইউনিটই ছিলো সর্বশেষ ইউনিট। শহরটির কমান্ডো বলেন, "আমরা যুদ্ধ করিনি কারণ সরকার আমাদেরকে যুদ্ধ করতে নির্দেশ দেয়নি। এমনকি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও যুদ্ধ করতে বলেনি।" এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, শুধুমাত্র যুদ্ধ করার ইচ্ছার উপর নির্ভর করেনা এটি," যোগ করেন তিনি।
এখন আফগান কমান্ডাররা হয় অন্য দেশে চলে গেছে অথবা আত্মগোপন করছে। তারা দ্রুত ভিসার অযোগ্য এবং তাদের নেই কোনো আয় বা কোনো ধরণের সুরক্ষা। কমান্ডো বলেন, "গত রাতে আমি সত্যিই কাঁদছিলাম, এবং সাথে আমার স্ত্রী-সন্তানেরাও কাঁদছিল। বর্তমানে আমি একজন বেকার। তালেবানদেরকে বিশ্বাস করি না আমি।"
কমান্ডোরা এনপিআরকে জানায় যে, তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে বলে মনে করেন তারা। তারা বলেছেন, "আফগান কর্তৃপক্ষ দেশটির জন্য যোগ্য নয়। এটি আফগান জনগণের দুর্ভাগ্য।"
- সূত্র- এনপিআর
