তালেবানের শীর্ষ নেতৃত্বে মতভেদ: ইন্টারনেট বন্ধের পেছনে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তুলে ধরল বিবিসি
বিবিসির হাতে আসা একটি অডিও ক্লিপই প্রকাশ করে দিয়েছে—তালেবানপ্রধানকে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করছে কোন বিষয়টি। আর সেটি কোনো বাইরের হুমকি নয়; বরং আফগানিস্তানের ভেতরের এক সংকট। খবর বিবিসির
ফাঁস হওয়া ওই অডিওতে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদাকে বলতে শোনা যায়, অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ শেষ পর্যন্ত সবাইকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
তিনি সতর্ক করেন, তালেবান প্রতিষ্ঠিত ইসলামি আমিরাতে সরকার কাঠামোর ভেতরেই এমন কিছু "ব্যক্তি" রয়েছেন, যারা পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। "এই বিভক্তির ফলেই আমিরাত ভেঙে পড়বে এবং এর পরিসমাপ্তি ঘটবে," সতর্ক করেন তিনি।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কান্দাহারের একটি মাদ্রাসায় তালেবান সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া এই ভাষণ গত কয়েক মাস ধরে ছড়িয়ে পড়া একটি গুঞ্জনকে আরও উসকে দেয়। আর এই গুঞ্জনটি হলো, তালেবানের শীর্ষ পর্যায়েই নাকি গুরুতর মতবিভেদ তৈরি হয়েছে।
এ ধরনের বিভক্তির কথা তালেবান নেতৃত্ব বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির পক্ষ থেকে এবিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হলেও তা অস্বীকার করেছে কাবুলের ক্ষমতাসীনরা।
তবে এসব গুজবই বিবিসির আফগান সার্ভিসকে এক বছর দীর্ঘ এক অনুসন্ধানে নামতে উদ্বুদ্ধ করে। অনুসন্ধানকালে বর্তমান ও সাবেক তালেবান সদস্য, স্থানীয় সূত্র, বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কূটনীতিক মিলিয়ে শতাধিক ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
পুরো ঘটনার সংবেদনশীলতার কারণে, নিরাপত্তার স্বার্থে বিবিসি এসব সূত্রের পরিচয় প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে এই অনুসন্ধানের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো তালেবানের শীর্ষ পর্যায়ে পৃথক দুই গোষ্ঠীর মানচিত্র আঁকতে পেরেছে বিবিসি—যারা আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরস্পরবিরোধী দুটি দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে।
এরমধ্যে একটি গোষ্ঠী পুরোপুরি আখুন্দজাদার প্রতি অনুগত। কান্দাহারকে কেন্দ্র করে তিনি দেশটিকে এগিয়ে নিতে চাইছেন তার কল্পিত কঠোর ইসলামি আমিরাতের দিকে—যে রাষ্ট্র থাকবে আধুনিক বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন, এবং যেখানে তার অনুগত ধর্মীয় নেতারা সমাজের প্রতিটি স্তর নিয়ন্ত্রণ করবেন।
দ্বিতীয় গোষ্ঠীটি মূলত কাবুলভিত্তিক প্রভাবশালী তালেবান নেতাদের নিয়ে গঠিত। তারা এমন এক আফগানিস্তানের পক্ষে, যা ইসলামকে কঠোরভাবে অনুসরণ করলেও বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, অর্থনীতি গড়ে তুলবে এবং মেয়েদের ও নারীদের সেই শিক্ষার সুযোগ দেবে, যা এখন তাদের ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তরের পর নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তালেবানের অভ্যন্তরীণ একজন এটিকে বর্ণনা করেছেন—"কান্দাহার হাউস বনাম কাবুল" হিসেবে।
তবে প্রশ্ন ছিল, কাবুল গোষ্ঠী—যাদের মধ্যে রয়েছেন মন্ত্রিসভার সদস্য, শক্তিশালী যোদ্ধা ও প্রভাবশালী আলেম, যাদের পেছনে হাজার হাজার তালেবান অনুগত—তারা কি আদৌ ক্রমেই আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা আখুন্দজাদার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো চ্যালেঞ্জ জানাবে?
কারণ তালেবানের ধর্মীয় দৃষ্টিতে আখুন্দজাদা হলেন 'আমিরুল মুমেনিন' বা সর্বোচ্চ শাসক—যিনি কেবল আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ, এবং যাকে প্রশ্ন করার অবকাশ নেই। কিন্তু এরপরেই আসে একটি সিদ্ধান্ত, যা দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের মধ্যে চলমান সূক্ষ্ম টানাপোড়েনকে রূপ দেয় প্রকাশ্য ক্ষমতার সংঘাতে।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আখুন্দজাদা নির্দেশ দেন—ইন্টারনেট ও ফোন যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে হবে, যার ফলে আফগানিস্তান কার্যত বাইরের বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এ সিদ্ধান্তের তিন দিন পর আবারো ইন্টারনেট সংযোগ চালু হয়। কিন্তু, বন্ধই বা কেন করা হয়েছিল তার কোনো ব্যাখ্যা তখন দেওয়া হয়নি।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে যা ঘটেছিল, তা ছিল ভূমিকম্পসম, বলছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। কাবুল গোষ্ঠী আখুন্দজাদার আদেশ অমান্য করে ইন্টারনেট পুনরায় চালু করে দেয়।
"তালেবান অন্য যে কোনো আফগান রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর তুলনায় ব্যতিক্রম—এখানে কখনো ভাঙন হয়নি, বড় ধরনের ভিন্নমতও দেখা যায়নি," বলেন আফগানিস্তান বিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ, যিনি তালেবান প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই তাদের ওপর গবেষণা করছেন।
তিনি বলেন, "এই আন্দোলনের ডিএনএর মধ্যেই রয়েছে ঊর্ধ্বতনদের প্রতি আনুগত্য, শেষ পর্যন্ত আমিরের প্রতি। সে কারণেই তার স্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করে ইন্টারনেট চালু করার ঘটনা ছিল এতটাই অপ্রত্যাশিত এবং তাৎপর্যপূর্ণ।"
তালেবানের ভেতরের একজনের ভাষায়, এটি ছিল সরাসরি বিদ্রোহের শামিল।
বিশ্বাসী মানুষ
হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নেতৃত্বের সূচনা এমন ছিল না।
সূত্রগুলো বলছে, ২০১৬ সালে তাকে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করা হয় মূলত ঐকমত্য গঠনের সক্ষমতার কারণে।
যুদ্ধক্ষেত্রে নিজস্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় তিনি উপ-নেতা হিসেবে বেছে নেন সিরাজউদ্দিন হাক্কানিকে। হাক্কানি ভয়ংকর এক জঙ্গি কমান্ডার, যিনি তখন যুক্তরাষ্ট্রের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র তার জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দেওয়ার পুরষ্কার ঘোষণা করেছিল এক কোটি ডলার।
আরেক উপ-নেতা করা হয় ইয়াকুব মুজাহিদকে— যিনি তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের ছেলে। ইয়াকুব তরুণ হলেও উত্তরাধিকারের ঐতিহ্যের কারণেই তালেবানকে ঐক্যবদ্ধ রাখার প্রতীক ছিলেন।
এই বিন্যাস যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দোহায় ২০ বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হওয়া আলোচনার পুরো সময়জুড়েই বহাল ছিল। যার ফলশ্রুতিতে ২০২০ সালে এক চুক্তি হয়, এবং ২০২১ সালের আগস্টে তালেবানের আকস্মিক কাবুল পুনর্দখল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশৃঙ্খল সেনা প্রত্যাহার ঘটে।
বহির্বিশ্ব তখন তালেবানকে ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবেই মনে করেছিল।
কিন্তু ২০২১ সালের আগস্টে ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই দুই উপ-নেতাকেই কার্যত মন্ত্রীর পদে নামিয়ে আনা হয়, আর আখুন্দজাদা হয়ে ওঠেন একক ক্ষমতার কেন্দ্র—বিবিসিকে জানান তালেবানের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়া তালেবানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা আবদুল গনি বারাদারকেও প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী না বানিয়ে উপ-প্রধানমন্ত্রী করা হয়।
এরপর কাবুলে অবস্থান না করে কান্দাহারেই ক্ষমতার ঘাঁটি গেড়ে বসেন আখুন্দজাদা এবং নিজেকে ঘিরে ফেলেন অনুগত আদর্শবাদী ও কট্টরপন্থীদের দিয়ে। তার অন্য অনুগতদের হাতে তুলে দেওয়া হয় নিরাপত্তা বাহিনী, ধর্মীয় নীতিনির্ধারণ ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর নিয়ন্ত্রণ।
"শুরু থেকেই আখুন্দজাদা নিজের শক্তিশালী একটি গোষ্ঠী গড়তে চেয়েছিলেন," বিবিসিকে বলেন এক সাবেক তালেবান সদস্য, যিনি তালেবানের পক্ষ ত্যাগ করে একসময় যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত আফগান সরকারের সঙ্গেও কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, "শুরুতে তিনি সে সুযোগ না পেলেও, ক্ষমতা হাতে আসার পর তিনি দক্ষতার সঙ্গে নিজের বলয় বাড়াতে থাকেন।"
কাবুলভিত্তিক মন্ত্রীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই একের পর এক ফরমান জারি হতে থাকে—বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে, যা ক্ষমতা নেওয়ার আগে দেওয়া তালেবানের প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। জাতিসংঘের এক পর্যবেক্ষক সংস্থার ডিসেম্বরের চিঠিতে বলা হয়, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিষেধাজ্ঞাই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে "মূল উত্তেজনার উৎস"।
১৯৯০-এর দশকে তালেবানের শরিয়া আদালতের বিচারক হিসেবে যাত্রা শুরু করা আখুন্দজাদা ধর্মীয় বিশ্বাসে আরও "কঠোর" হয়ে উঠছিলেন।
তার আদর্শিক অবস্থান এমনই ছিল যে, ২০১৭ সালে তার ছেলে আত্মঘাতী হামলাকারী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এটি তিনি জানতেন এবং সমর্থনও করেছিলেন, বলে দুই তালেবান কর্মকর্তার দাবি করেন।
বিবিসিকে জানানো হয়েছে, তিনি বিশ্বাস করেন—ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি তার জীবদ্দশার বাইরেও প্রভাব ফেলবে।
একজন বর্তমান তালেবান কর্মকর্তা বলেন, "তিনি প্রতিটি সিদ্ধান্তের সময় বলেন—আমি আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করব, কিয়ামতের দিনে আমাকে প্রশ্ন করা হবে—কেন আমি কোনো পদক্ষেপ নিইনি।"
যারা তার সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, তারা বিবিসিকে জানান—তিনি খুব কম কথা বলেন, মূলত ইশারার মাধ্যমে যোগাযোগ করেন, যা কক্ষে উপস্থিত প্রবীণ আলেমরা ব্যাখ্যা করেন।
জনসমক্ষে তিনি প্রায়ই মুখ আড়াল করেন—পাগড়ির ওপর ওড়না ঝুলিয়ে চোখ ঢেকে রাখেন, কিংবা কোণাকুণি হয়ে দাঁড়ান। তার ছবি বা ভিডিও ধারণ করা নিষিদ্ধ। তার মাত্র দুটি ছবি থাকার কথা জানা যায়।
তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করাও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। এক তালেবান সদস্য বলেন, আগে নিয়মিত পরামর্শ হতো, এখন "অনেক মন্ত্রীকে কয়েক দিন কিংবা সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়।" কাবুলভিত্তিক মন্ত্রীদের জানানো হয়েছে, কেবল আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পেলেই তারা কান্দাহার যেতে পারবেন।
একই সঙ্গে অস্ত্র বিতরণসহ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলো কান্দাহারে সরিয়ে নেওয়া হয়—যেগুলো আগে তার সাবেক দুই ডেপুটি হাক্কানি ও ইয়াকুবের নিয়ন্ত্রণ করতেন।
জাতিসংঘের ডিসেম্বরের চিঠিতে বলা হয়, আখুন্দজাদার "ক্ষমতা সংহতকরণের এই প্রক্রিয়ায় কান্দাহারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তোলাও" রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তব ক্ষমতা কাবুল থেকে কান্দাহারে স্থানান্তরিত হয়েছে। তবে তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বিবিসির কাছে সেটা অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, মন্ত্রীরা নিজ নিজ কাঠামোর মধ্যে থেকে পূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন। তবে শরীয়াহ আইনের দৃষ্টিতে আখুন্দজাদার ক্ষমতাই "চূড়ান্ত" বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
'যারা দুনিয়া দেখেছে'
এমতাবস্থায় কাবুল গোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছিল, জোরদার হচ্ছিল তাদের জোট।
"ওরা (কাবুল গ্রুপ) দুনিয়া দেখেছে," এক বিশ্লেষক বলেন। "তাই তারা জানে, বর্তমান কাঠামোতে এই সরকার টিকবে না।"
এই গোষ্ঠী উপসাগরীয় দেশগুলোর আদলে আফগানিস্তান গড়তে চায়। তারা কান্দাহারে ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ, নৈতিকতা আইন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে সরকারের নীতিতে উদ্বিগ্ন।
তবে নারীদের আরও অধিকার দেওয়ার পক্ষে থাকলেও– তারা উদারপন্থী নয়; বরং ভেতরের লোকজন তাদের "বাস্তববাদী" হিসেবে দেখেন। অনানুষ্ঠানিকভাবে এদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বারাদার—যার প্রতি এখনও ব্যাপক আনুগত্য রয়েছে। ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনী বিতর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্প যাকে "তালেবানের প্রধান আবদুল" বলে উল্লেখ করেছিলেন, সেই ব্যক্তি তিনিই।
এই গোষ্ঠীর পরিবর্তিত অবস্থান নজরে পড়েছে বিশ্লেষকদের।
"তারা আগে টিভি ভাঙত, এখন নিজেরাই টিভিতে আসে," বলেন একজন।
সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তিও তারা বোঝে। সাবেক উপ-নেতা ইয়াকুব তরুণ তালেবান ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যে জনপ্রিয়, তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাকে নিয়ে তৈরি টিকটক ভিডিও এবং নানান পণ্যের মোড়কে তার চেহারার ছবি থাকার মাধ্যমেই।
তবে সবচেয়ে কার্যকরভাবে নিজের ভাবমূর্তি বদলেছেন সিরাজউদ্দিন হাক্কানি। যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী যুদ্ধের সময় পশ্চিমাদের লক্ষ্য করে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাগুলোর নেপথ্যেই ছিলেন তিনি। এসব হামলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ২০১৭ সালে কাবুলে জার্মান দূতাবাসের কাছে একটি ট্রাক বোমা বিস্ফোরণ, যাতে ৯০ জনের বেশি নিহত হন।
এই পুরো সময়জুড়ে তার মাত্র একটি পরিচিত ছবি ছিল, যা তুলেছিলেন বিবিসির একজন আফগান সাংবাদিক।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহারের ছয় মাস পর দৃশ্যপট বদলে যায়। কাবুলে পুলিশ কর্মকর্তাদের এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে হাক্কানি প্রথম আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে হাজির হন—মুখ না ঢেকেই।
পুরোনো ভাবমূর্তি ঝেড়ে ফেলার দিকে এটাই ছিল তার প্রথম পদক্ষেপ। এর কয়েক মাস পরই এফবিআই তার মাথার দাম প্রত্যাহার করে নেয়।
তবু বিশ্লেষক ও অভ্যন্তরীণরা বিবিসিকে বলেন, আখুন্দজাদার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ এখনো অসম্ভব বলেই ধরা হয়।
কাবুল গ্রুপের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে পুরুষদের দাড়ি কাটার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর না করার মতো ছোটখাটো অবাধ্যতা দেখা গেলেও বড় ধরনের বিদ্রোহ অকল্পনীয় ছিল।
এক সাবেক তালেবান সদস্য বলেন, "আখুন্দজাদার প্রতি আনুগত্য বাধ্যতামূলক।"
২০২৪ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কোনো ধরনের বিভক্তির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেন হাক্কানিও। তিনি বলেন, "এখন ঐক্যই আফগানিস্তানের জন্য সবচেয়ে জরুরি, যাতে আমরা একটি শান্তিপূর্ণ দেশ গড়তে পারি।"
একজন বিশ্লেষকের ভাষায়, কাবুলভিত্তিক গোষ্ঠীটি ইচ্ছাকৃতভাবেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আফগান জনগণের উদ্দেশে একটি "বার্তা" দিতে চাইছে। সেই বার্তাটি হলো—"আপনাদের অভিযোগ ও উদ্বেগের কথা আমরা জানি, কিন্তু আমাদের করারই বা কী আছে?"
অন্তত ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ আসার আগপর্যন্ত পরিস্থিতি ঠিক এমনটাই ছিল।
টানাপোড়েনের চূড়ান্ত মুহূর্ত
আখুন্দজাদার ইন্টারনেট-বিরোধিতা সুপরিচিত। তিনি মনে করেন, ইন্টারনেট এর কনটেন্ট ইসলামবিরোধী। তাই প্রতিদিনের খবর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট তাকে পড়ে শোনান একজন সহকারী। বিবিসিকে এমন তথ্যই একসময় জানিয়েছিলেন আখুন্দজাদার একজন মুখপাত্র।
এদিকে কাবুল গোষ্ঠীর বিশ্বাস, ইন্টারনেট ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্র টিকতে পারে না।
কিন্তু, সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশে প্রথমে কান্দাহার- গ্রুপের নিয়ন্ত্রিত প্রদেশগুলোতে ইন্টারনেট বন্ধ হয়, পরে পুরো দেশে। এরপর যা ঘটে, তা তালেবানের ইতিহাসে প্রায় নজিরবিহীন।
"এই পদক্ষেপ তালেবানের বহু সদস্যকেই বিস্মিত করে," বলে জানায় আরেকটি সূত্র।
তখন কাবুল গোষ্ঠীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর মন্ত্রীরা একত্রিত হয়ে কাবুলভিত্তিক প্রধানমন্ত্রী মোল্লা হাসান আখুন্দকে ইন্টারনেট পুনরায় চালুর নির্দেশ দিতে রাজি করান।
বাস্তবে, দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার আগেই এই আদেশ নিয়ে নিজেদের অসন্তোষ স্পষ্ট করেছিল গোষ্ঠীটি। সূত্র জানায়, গোষ্ঠীর ডি-ফ্যাক্টো নেতা বারাদার কান্দাহারে গিয়ে আখুন্দজাদার সবচেয়ে অনুগত গভর্নরদের একজনকে সতর্ক করে বলেন, তাদের "তাকে জাগাতে হবে"—এবং সর্বোচ্চ নেতার কেবল "জি-হুজুর ব্যক্তি" হয়ে থাকা বন্ধ করতে হবে।
কান্দাহার গ্রুপের ওই অভ্যন্তরীণ সূত্র জানান, বারাদার ওই গভর্নরকে বলেন, "আপনি তাকে খোলাখুলিভাবে সত্যটা বলেন না; তিনি যা বলেন, সেটাই কেবল বাস্তবায়ন করেন।"
তবে সূত্র জানায়, মোল্লা বারাদারের এই কথাগুলো উপেক্ষা করা হয়। পরবর্তী সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, সর্বোচ্চ নেতার পক্ষ থেকে সরাসরি টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধের নির্দেশ আসে। আর এটি পালনের ক্ষেত্রে "কোনো অজুহাত গ্রহণ করা হবে না"- এমন সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়।
এর দুই দিন পর বুধবার সকালে, কাবুল গোষ্ঠীর একদল মন্ত্রী—যাদের মধ্যে বারাদার, হাক্কানি ও ইয়াকুব ছিলেন—টেলিযোগাযোগমন্ত্রীর সঙ্গে কাবুলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৈঠকে বসেন। সেখানে তারা কান্দাহার-ঘনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীকে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, এই সিদ্ধান্তের পূর্ণ দায়ভার তারা নিজেরাই নিতে প্রস্তুত।
এই উদ্যোগ কাজ করে। ইন্টারনেট আবারও চালু হয়।
তবে সম্ভবত এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল আরেকটি বিষয়—এই কয়েক দিনের মধ্যেই যেন কয়েক মাস আগে দেওয়া সেই বক্তব্যে তালেবানপ্রধান হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে: অভ্যন্তরীণ মহল থেকেই তালেবানের ঐক্য হুমকির মুখে পড়ল।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন নির্দেশ কেন দেওয়া হয়েছিল? এক বিশেষজ্ঞের মতে, কন্যা শিশুদের শিক্ষা নিষিদ্ধ করার মতো ফরমানের সঙ্গে মতানৈক্য থাকলেও তালেবান সদস্যরা এতদিন আখুন্দজাদার নির্দেশ মেনেই চলেছেন।
অন্যদিকে, যারা অতীতে প্রকাশ্যে তার বিরোধিতা করেছেন, তাদের অনেককেই চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।
নারীশিক্ষা বিষয়ক এই নিষেধাজ্ঞার প্রকাশ্য সমালোচনা করে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, তৎকালীন তালেবান সরকারের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "২০ মিলিয়ন মানুষের প্রতি অবিচার" করে তালেবান "আল্লাহর পথ" থেকে সরে যাচ্ছে। একথা বলার কিছুদিনের মধ্যেই তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের জুলাই ও সেপ্টেম্বর মাসে আখুন্দজাদার মেয়েদের শিক্ষাবিষয়ক ফরমান নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর অন্তত আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে একই সঙ্গে এমন ইঙ্গিতও রয়েছে যে আখুন্দজাদা ও তার ঘনিষ্ঠরা সিরাজউদ্দিন হাক্কানির মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিজেদের কাছে রাখার চেষ্টা করছেন। যদিও ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ নিয়ে হাক্কানি প্রকাশ্যেই সর্বোচ্চ নেতার সমালোচনা করেছেন।
তারপরও, কথার পর্যায় ছাড়িয়ে সরাসরি ইন্টারনেট চালুর পদক্ষেপে যাওয়া এবং এত স্পষ্টভাবে ঐ নির্দেশ অমান্য করা নিঃসন্দেহে ভিন্ন মাত্রার ঘটনা ছিল।
এক বিশেষজ্ঞের ভাষায়, এবার হয়তো সেই ঝুঁকি নেওয়াটা তাদের কাছে যুক্তিসংগত মনে হয়েছে।
তিনি বলেন, তাদের পদমর্যাদার সঙ্গে ক্ষমতা যেমন জড়িত, তেমনি আছে "অর্থ উপার্জনের সক্ষমতা"ও। কিন্তু এই দুটিই এখন ইন্টারনেটনির্ভর—শাসন পরিচালনা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম, উভয়ের জন্যই।
তিনি বলেন, "ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া তাদের বিশেষাধিকারকে এমনভাবে হুমকির মুখে ফেলেছিল, যেভাবে মেয়েদের শিক্ষা বন্ধ করা কখনোই ফেলেনি। সম্ভবত এ কারণেই সেবার তারা 'সাহসী' হয়ে পদক্ষেপ নেন।"
ইন্টারনেট চালু হওয়ার পরপরই কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়।
কাবুল গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়া বা পদাবনতি ঘটানো হতে পারে।
অন্যদিকে, কান্দাহারের একটি সূত্রের দাবি, সর্বোচ্চ নেতা নিজেই হয়তো পিছু হটেছেন, "কারণ তিনি এমন বিরোধিতাকে ভয় পান"। বছরের শেষ দিকে এসে বাহ্যিকভাবে মনে হচ্ছিল, তেমন কিছুই বদলায়নি।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, জাতিসংঘের কিছু সদস্যরাষ্ট্র কান্দাহার ও কাবুলের নেতৃত্বের মধ্যকার বিভাজনকে "পারিবারিক মতবিরোধের" মতো হিসেবে দেখছে, যা বিদ্যমান পরিস্থিতি বদলাবে না; কারণ "সব জ্যেষ্ঠ নেতা তালেবান প্রকল্পের সাফল্যের লক্ষ্যেই নিবেদিত।"
তালেবান সরকারের জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ যেকোনো বিভক্তির কথা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন।
২০২৬ সালের জানুয়ারির শুরুতে তিনি বিবিসিকে বলেন, "আমরা কখনোই নিজেদের বিভক্ত হতে দেব না। সব কর্মকর্তা ও নেতৃত্ব জানেন, বিভাজন সবার জন্য ক্ষতিকর। এটা আফগানিস্তানের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ এবং আল্লাহর কাছে হারাম।"
তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন যে তালেবান সদস্যদের মধ্যে "মতামতের পার্থক্য" আছে, যদিও সেটিকে তিনি "একটি পরিবারের ভেতরের মতভেদ"-এর সঙ্গে তুলনা করেন।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে সেই "মতভেদ" আবারও প্রকাশ্যে আসে।
হাক্কানিকে তার নিজ প্রদেশ খোস্তে জুমার নামাজের সময় জনসমাবেশে ভাষণ দিতে দেখা যায়। সেখানে তিনি সতর্ক করে বলেন, যে কেউ "জাতির আস্থা, ভালোবাসা ও বিশ্বাসের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে পরে সেই জাতিকেই পরিত্যাগ করে বা ভুলে যায়… সে সরকার নয়।"
একই দিনে, আখুন্দজাদার অনুগত ও উচ্চশিক্ষামন্ত্রী নেদা মোহাম্মদ নাদেম পাশের একটি প্রদেশের মাদ্রাসায় সনদপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আলাদা ভাষণ দেন। তিনি বলেন, "একজনই নেতৃত্ব দেন, বাকিরা আদেশ অনুসরণ করে—এটাই প্রকৃত ইসলামী সরকার। যদি অনেক নেতা থাকে, তাহলে সমস্যা সৃষ্টি হবে এবং আমরা যে সরকার অর্জন করেছি, তা ধ্বংস হয়ে যাবে।"
ইন্টারনেট বন্ধ ও পুনরায় চালু নিয়ে বিরোধের পর, এসব সাম্প্রতিক মন্তব্য ২০২৫ সালের শুরুতে ফাঁস হওয়া অডিওতে আখুন্দজাদার বক্তব্যের গুরুত্বকে যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তাহলে ২০২৬ সালই কি সেই বছর হবে, যখন কাবুল গোষ্ঠী আফগানিস্তানের নারী-পুরুষের জীবনে বাস্তব ও অর্থবহ পরিবর্তন আনতে এগোবে? এটি এখনো একটি উন্মুক্ত প্রশ্ন।
এক বিশেষজ্ঞের ভাষায়, "বরাবরের মতোই প্রশ্ন থেকে যায়—আমিরাতের শীর্ষ পর্যায়ে মতবিরোধ স্পষ্ট হওয়ার পর, কথাগুলো কি কখনো কাজে রূপ নেবে? এখনো যে তা হয়নি, সেটা স্পষ্ট।"
