২০২৩ সালে বেসরকারি খাতে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ কমেছে ১১.৪৫ বিলিয়ন ডলার

বেসরকারি খাতে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ প্রবাহে বড় পতন প্রত্যক্ষ করেছে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ২০২৩ সালে যা ১১.৪৫ বিলিয়ন ডলার কমেছে। এতে আর্থিক হিসাবের ঘাটতি বেড়ে যায়, এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাসের গতিও বাড়ে।
সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে মোট বিদেশি ঋণ এসেছে ২৫.৮ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরে যার পরিমাণ ছিল ৩৭.২৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, কমেছে ৩১ শতাংশ।
অন্যদিকে, গত বছরে ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে ৩১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, ঋণপ্রাপ্তির চেয়ে পরিশোধের পরিমাণ ৫.৩ বিলিয়ন ডলার বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে পরিশোধের তুলনায় স্বল্পমেয়াদি ঋণপ্রাপ্তির উদ্বৃত্ত ছিল ৫২৫ মিলিয়ন ডলার।
বিদেশি উৎস থেকে দেশের বেসরকারি খাতের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের সর্বোচ্চ এক বছর মেয়াদের জন্য তহবিল ঋণ নেওয়াকে– স্বল্পমেয়াদি ঋণ হিসেবে ধরা হয়। বেশিরভাগক্ষেত্রেই মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য আমদানিকারকরা বিদেশি ঋণদাতাদের থেকে ঋণ নেন, যা বায়ার্স ক্রেডিট নামেও পরিচিত। আমদানি দায় পরিশোধে ব্যাংকগুলোও বিদেশি উৎস থেকে স্বল্পমেয়াদি ঋণ গ্রহণ করে থাকে।
আর্থিক হিসাবের একটি অঙ্গ হলো স্বল্পমেয়াদি ঋণ, যারমধ্যে রয়েছে- বায়ার্স ক্রেডিট, ডেফারড পেমেন্ট (বিলম্বে মূল্য পরিশোধ), ব্যাক -টু- ব্যাক বিদেশি ঋণপত্র (এলসি), এবং বাণিজ্য অর্থায়নে স্বল্পমেয়াদি ঋণসমূহ।
কিন্তু, গতবছরে এই ঋণের পরিশোধ বাড়া এবং তাঁর সাথে ঋণপ্রাপ্তি কমায়– দেশের আর্থিক হিসাবের ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়। ফলে ২০২২-২৩ অর্থবছরে আর্থিক হিসাবের ঘাটতি এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ২ বিলিয়ন ডলারের হয়ে যায়। সে তুলনায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে উদ্বৃত্ত ছিল ১৬.৬ বিলিয়ন ডলার।
আর্থিক হিসাবের ব্যাপক এই ঘাটতির কারণে, বাজারের চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হয়েছে। ফলে ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে গ্রস বা মোট রিজার্ভ যেখানে ২৬ বিলিয়ন ডলার ছিল, তা ২০২৪ সালের জানুয়ারির শেষে ১৯.৯৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
বাংলাদেশমুখী স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের প্রবাহ কমার প্রধান কারণ বৈশ্বিক পর্যায়ে সুদহার বৃদ্ধি। এই অবস্থায়, ঋণ প্রবাহের মন্থরগতি বজায় থাকায়– আর্থিক হিসাবের ঘাটতিও বড় হতে থাকে।
তার ওপর চলতি বাজেটে সুদ পরিশোধে ২০ শতাংশ করারোপের সিদ্ধান্ত– বিদেশি ঋণের খরচ বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে ঋণের খরচ বেড়ে প্রায় ১১ শতাংশ হয়ে গেছে।
তবে বাংলাদেশে বিদেশি ঋণ আসা বাড়াতে গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই কর অব্যাহতি দেওয়া হয়। সম্প্রতি বৈদেশিক মুদ্রায় স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণের সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ব্যাংকগুলো সোফর (দ্য সেকিউরড ওভারনাইট ফিন্যান্সিং রেট) সুদহারের সাথে ৪ শতাংশ পর্যন্ত মার্কআপ বা মার্জিন যুক্ত করে গ্রাহককে ঋণ দিতে পারবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক উৎস থেকে স্বল্প-মেয়াদি ঋণের পরিমাণ কমে ২.৮ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। ওই বছরের জানুয়ারিতে যা ছিল ৪.৩ বিলিয়ন ডলার।
ঋণপ্রাপ্তির এ পতনের কারণেই ব্যাংকগুলো আমদানির ঋণপত্র খুলতে গড়িমসি করেছে। এছাড়া, ব্যাংকগুলো তাদের অফশোর ইউনিটের মাধ্যমেও বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ প্রদান কমায়। এতে আমদানিকারকদের জন্য ডলার সংকট আরও তীব্র হয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
টাকার মানে উচ্চ অবমূল্যায়নের কারণেও বেসরকারি ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ঋণ পরিশোধের খরচ বাড়ে। এতে তাঁরা বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ গ্রহণে বিমুখ হয়ে পড়ে।
২০২২ সালে মাত্র এক বছরের মধ্যে টাকার মানে ২৬ শতাংশ হারে অবমূল্যায়ন ঘটে, তবে ২০২৩ সালে এই হার কিছুটা কমে ২.৮ শতাংশ হয়।
গতবছরের শুরুতে বেসরকারি খাতের যেসব ঋণগ্রহীতা প্রতি ডলারের বিপরীতে ১০৫ টাকা বিনিময় হারে ঋণ নিয়েছিলেন, তাঁদের ১২০ টাকার বেশি দাম বাজার থেকে ডলার কিনে ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে বছর শেষে। যখন ডলারের আনুষ্ঠানিক দরও বেড়ে দাঁড়ায় ১১০ টাকায়।
আমেরিকার (যুক্তরাষ্ট্রের) ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অচিরেই সুদহার কমাবে না, এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সুদহারের উচ্চ অবস্থান বজায় থাকতে পারে।
ব্লুমবার্গের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ৪ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল বলেন, মূল্যস্ফীতির হার ২ শতাংশের দিকে নামছে কিনা– সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে কর্মকর্তারা আরও অর্থনৈতিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করছেন। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার কমানোর জন্য আমেরিকানদের মার্চের পরের সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
আমদানি হ্রাস ও উচ্চ সুদহার দেশে ঋণ প্রবাহ কমার জন্য দায়ী- বলছেন বিশেষজ্ঞরা
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসেন টিবিএস'কে বলেন, "আমাদের স্বল্প-মেয়াদি ফরেন লোন কমার অন্যতম কারণ আমাদের আমদানির পরিমাণ অনেক কমেছে। এরফলে আমাদের বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বায়ার্স ক্রেডিট কম হওয়ায় ফরেন লোন কমেছে।"
তিনি আরও বলেন, ইন্টারন্যাশনাল রেটিং এজেন্সিগুলো আমাদের দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের ঋণমান অবনমন করায় বিদেশি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আমাদের ক্রেডিট লাইন সীমা কমে গিয়েছে। এটাও অন্যতম কারণ।
বেসরকারি একটি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান টিবিএস'কে বলেন, আমাদের বিদেশি ঋণ কমার অন্যতম কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে সুদহার বেড়ে যাওয়া।
তিনি বলেন, "২০২২ সালের শুরুর দিকে ব্যবসায়ীরা বিদেশি লোন পেত মাত্র ৪ শতাংশ সুদে, যখন ব্যাংকগুলোর টাকার লোনের সুদহার ছিল ৯ শতাংশ। ২০২২ সালের দীর্ঘ সময় জুড়ে সোফর রেট ছিল ১ শতাংশেরও কম। এরসঙ্গে ব্যাংকগুলো আরও ৩ শতাংশ সুদ যোগ করতে পারতো।
"বর্তমানে সোফর রেট ৫.৫ শতাংশেরও বেশি। এছাড়া আরও ৪ শতাংশ ব্যাংকগুলো চার্জ করতে পাড়বে। একইসঙ্গে সরকার আরও ইন্টারেস্টের ওপর ২০ শতাংশ ট্যাক্স দিয়েছে, এসব কারণে ফরেন লোন কমে গেছে"- যোগ করেন তিনি।
রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম না প্রকাশের শর্তে টিবিএসকে বলেন, এখন ব্যবসায়ীরা খুবই সতর্ক হয়েছে। কারণ টাকার তুলনায় ডলারের দর গত দেড় বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধের চাপ খুবই প্রকট হয়েছে।
তিনি বলেন, "বিশেষ করে আমার ব্যাংকে প্রতি বছর বিদেশি ব্যাংকগুলো থেকে এলসি পেমেন্টের জন্য প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার ফরেন লোন নেওয়া হতো। কিন্তু, ডলারের রেটে চলমান অনিশ্চয়তার কারণে আমরা এই ঋণ সুবিধা নিচ্ছি না।"
"আমাদের চাহিদা কমে যাওয়াও বিদেশি ঋণ কমার আরেকটি কারণ। তাঁর সাথে ক্রেডিট রেটিং ডাউনগ্রেড হওয়ার ঘটনাও ঋণ প্রবাহকে প্রভাবিত করেছে।"
ঋণ পরিশোধের চাপ কমেছে
এদিকে বিদেশি ঋণ প্রবাহের পরিমাণ কমলেও– পরিশোধ বাড়ায় চাপ কিছুটা কমেছে। ফলে মাসিক পরিশোধের অঙ্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এটি ডলারের বিনিময় হারে তারতম্য কিছুটা ধীর করতে ভূমিকা রাখছে।
গত বছরের ডিসেম্বর মাস শেষে বেসরকারি খাতের স্বল্প-মেয়াদি ঋণ পরিশোধ কমে ২.২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ওই বছরের জানুয়ারিতে তা ছিল ৩.২ বিলিয়ন ডলার।
ডলারে ঋণ পরিশোধের চাপ কমার ঘটনা মুদ্রার বিনিময় হারের ব্যাপক উঠানামাকে কিছুটা লঘু করেছে, ফলে এলসির জন্য ১২২ থেকে ১২৩ টাকা দরে ডলার কিনতে পারছেন আমদানিকারকরা। ডলারের দাম আরও বাড়ার যে ধারণা বাজারে ছিল, তা না হওয়ায় রেমিট্যান্সে উন্নতি হয়েছে। জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স এসেছে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরে ১.৩ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ ছয় মাসের মুদ্রানীতি ঘোষণা করার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, (স্বল্প-মেয়াদি) বিদেশি ঋণের বেশিরভাগ অংশই পরিশোধ হয়েছে, খুব শিগগিরই মাসিক পরিশোধের পরিমাণ ১০০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসবে। ফলে আগামী দিনগুলোতে রিজার্ভ ঘুরে দাঁড়াবে।
তিনি আরও বলেন, আমদানি নিয়ন্ত্রণের ফলে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত হয়েছে। আমদানি নিয়ন্ত্রণ করায় অনেক ব্যবসায়ীর ভোগান্তি হলেও– কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অন্য উপায় ছিল না।
গভর্নর বলেন, দেশে ডলারের প্রবাহ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। ডলার তারল্যের উন্নতির জন্য ব্যাংকগুলোকে বিদেশি ঋণদাতাদের কাছে তাঁদের ক্রেডিট লাইন বাড়াতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।