ইরান-সমর্থিত হুথিদের সঙ্গে সৌদির উত্তেজনা বাড়ছে, পক্ষ বেছে নিতে চাপে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান
বিগত এক বছরের বেশিরভাগ সময় জুড়েই পাকিস্তান একদিকে রিয়াদের প্রতিরক্ষা অংশীদার এবং অন্যদিকে তেহরানের কাছে ওয়াশিংটনের অনানুষ্ঠানিক গোপন যোগাযোগের মাধ্যম (ব্যাকচ্যানেল) হিসেবে এক দ্বৈত ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু চলতি সপ্তাহে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি আন্দোলন এবং সৌদি বাহিনীর মধ্যে শুরু হওয়া লড়াই ক্রমাগত এই পরীক্ষাই নিচ্ছে যে, ইসলামাবাদ কতক্ষণ এই দুটি অবস্থান একসঙ্গে বজায় রাখতে পারবে।
গত মাসে পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত হওয়া পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোটের প্রথম বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান এই সংঘাত। এই জোটটি ইসলামাবাদ ও রিয়াদের মধ্যে আগে থেকেই থাকা একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে। এই ব্যবস্থার অধীনে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেয়েও এই হুথি হুমকি পাকিস্তানকে সরাসরি যুদ্ধের দিকে টেনে নেওয়ার আশঙ্কা বেশি বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন পাকিস্তানি কর্মকর্তারা। গত জুলাইয়ে দুই পাকিস্তানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন যে, ইয়েমেনের সাথে সৌদি সীমান্তে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন রয়েছে, যা তাদের এই সংঘাতের সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
বছরের পর বছর সংকটের পর নিজ দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের পরিকল্পনার একটি মূল অংশ ছিল উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে এই প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো। আর এই চুক্তিগুলোর সমান্তরালে বা পরবর্তীতে প্রায়ই উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বিনিয়োগ পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলেছে।
তবে পাকিস্তান হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে আসা তেল ও গ্যাস চালানের ওপরও নির্ভরশীল—যেসব নৌপথ ইরান এবং হুথিরা চাইলেই ব্যাহত করতে পারে বলে প্রমাণ দিয়েছে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি তেহরানকে পুরোপুরি দূরে ঠেলে দেওয়া এড়ানোর যথেষ্ট কারণ রয়েছে ইসলামাবাদের কাছে।
অতীতে পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান এবং ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা মাঝে মাঝে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নিয়েছিল। দুই বছর আগে দুই দেশের যৌথ সীমান্ত সংলগ্ন পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে কথিত জঙ্গি আস্তানায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর ইসলামাবাদও পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছিল। সেই উত্তেজনা সাময়িকভাবে নতুন একটি সংঘাতের শঙ্কা তৈরি করলেও তা দ্রুতই শান্ত হয়ে যায়।
এবার পাকিস্তান সময় শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই এই উত্তেজনা বৃদ্ধির পথ বন্ধ করতে চাইছে।
চলতি সপ্তাহে পাকিস্তান তাদের মাধ্যমে সৌদি আরবের একটি সতর্কবার্তা তেহরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, যেখানে ইরানকে তাদের ইয়েমেনি মিত্র হুথিদের নিয়ন্ত্রণ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বুধবার সৌদি, পাকিস্তানি এবং ইরানি সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।
একটি পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, সব ফ্রন্টে উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে 'কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুনরুদ্ধারের উপায়' নিয়ে আলোচনা করতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।
পাকিস্তানের সরকারের দ্বিতীয় এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, 'সৌদি-হুথি সংঘাতে পাকিস্তান নিজেকে একটু আড়ালে রাখার চেষ্টা করছে, কারণ এতে পাকিস্তানের নিজস্ব স্বার্থ অনেক বেশি জড়িত। ইসলামাবাদ কোনোভাবেই ইরানের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না।'
বৃহস্পতিবার এক ব্রিফিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান বলেছেন, হুথিদের এই হামলার কোনো সামরিক জবাব দেওয়ার বিষয়টি বর্তমানে আলোচনার টেবিলে নেই।
মন্তব্যের অনুরোধের জবাবে খান রয়টার্সকে বলেন, 'ইরানের নেতৃত্ব সবসময়ই পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছে। পাকিস্তান ধারাবাহিকভাবে সংঘাত বৃদ্ধির বিরোধিতা করে আসছে এবং সবসময় সংযম, সংলাপ ও কূটনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।'
প্রকাশ্যে ইরানের কর্মকর্তারা পাকিস্তানের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন যে তারা এই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে কোনো হুমকি হিসেবে দেখছেন না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন এই আলোচনার সঙ্গে পরিচিত তিনটি ইরানি সূত্র। তারা ব্যাখ্যা করেছেন, পাকিস্তানের সদিচ্ছা হয়তো থাকতে পারে, কিন্তু তাদের সেই সক্ষমতা কিংবা কাতারের মতো অভিজ্ঞ মধ্যস্থতাকারীদের সমকক্ষ দক্ষতা নেই।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো সাড়া দেয়নি।
ইসলামাবাদ যে ভারসাম্যের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে, তার বিশালত্ব উপলব্ধি করে তারা এখন তাদের কৌশল নতুন করে পুনর্বিন্যাস করছে এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
গত বছর পাকিস্তান ও সৌদি আরব তাদের প্রাথমিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করার পর কুয়েতও প্রায় একই ধরনের একটি ব্যবস্থার জন্য জোর দিয়েছিল বলে জানিয়েছেন এই আলোচনার বিষয়ে অবগত চারটি সূত্র। সূত্রগুলো জানায়, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিতে থাকা আরেকটি উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক গভীর করার ব্যাপারে সতর্ক হয়ে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা সেই আলোচনার পরিধি সংকুচিত করে আনেন।
এর পরিবর্তে গত মাসে দুই দেশ ইসলামাবাদে একটি সীমিত প্রটোকলে স্বাক্ষর করে—যার আওতায় প্রশিক্ষণ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো রাখা হয়; যা কুয়েতের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম ছিল।
বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র খান বলেন, পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্কের বৃহত্তর এই জোটে এই মুহূর্তে নতুন কোনো সদস্য যুক্ত করার কোনো পরিকল্পনা নেই।
চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো ফারজানা শেখ প্রশ্ন তুলেছেন যে, ইসলামাবাদের ওপর তেহরানের বিশ্বাস আদৌ ততটা দৃঢ় ছিল কি না যতটা ধারণা করা হয়।
তিনি বলেন, কাতার ও ওমান মধ্যস্থতার টেবিলে যে ধরনের সামর্থ্য বা অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারত, পাকিস্তানের 'সে ধরনের কোনো সংস্থান বা বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই।' তিনি আরও বলেন, ইসলামাবাদের এই বাড়তি ভূমিকা তাদের নিজস্ব কূটনৈতিক প্রভাবের কারণে নয়, বরং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের মধ্যকার 'ব্যক্তিগত আন্তরিকতার' কারণে তৈরি হয়েছে।
ক্রিপ্টো চুক্তি, দুর্লভ খনিজ সম্পদে মার্কিন প্রবেশাধিকার এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের এক জোরালো কূটনীতির পর ট্রাম্প বহুবার মুনিরকে তার 'প্রিয় ফিল্ড মার্শাল' বলে অভিহিত করেছেন।
তবে অন্যরা যুক্তি দেখাচ্ছেন যে এটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইসলামাবাদের ভূমিকার জন্য মারাত্মক কোনো আঘাত নাও হতে পারে।
পাকিস্তান-ইরান সম্পর্ক বিষয়ক ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক কামরান বোখারি বলেন, তেহরান ইসলামাবাদের সাথে যুক্ত থাকে ঠিক এই কারণেই যে রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।
তিনি বলেন, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ কোনো পক্ষ যেভাবে বার্তা পৌঁছে দিতে পারে না, ইসলামাবাদের অবস্থান তাদের সেই সুযোগ দেয়। আর ইসলামাবাদ হয়ে বার্তা পাঠানোর ক্ষেত্রে ঠিক এই সুবিধাটিই কাজে লাগাতে চায় রিয়াদ ও ওয়াশিংটন।
কিন্তু হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যকার লড়াই তীব্র হলে এই পুরো সমীকরণ ওলটপালট হয়ে যেতে পারে।
বোখারি বলেন, 'বার্তা পৌঁছে দেওয়া ও সাজিয়ে গুছিয়ে উপস্থাপন করা এক জিনিস, কিন্তু সক্রিয় আকাশ প্রতিরক্ষা বা গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়; যা পাকিস্তানকে অংশীদার থেকে সরাসরি একটি যুদ্ধরত পক্ষে পরিণত করবে।'
সক্রিয় সেনা সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম সেনাবাহিনীর অধিকারী পাকিস্তান আগের প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় ইতিমধ্যে সৌদি আরবে হাজার হাজার সেনা এবং এক স্কোয়াড্রন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে রেখেছে। এদিকে ভারতের সাথে নিজেদের উত্তেজনাপূর্ণ সীমান্ত পাহারায় সেনা নিয়োজিত রাখার পাশাপাশি দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে একাধিক বিদ্রোহ সামাল দিতে হচ্ছে পাকিস্তানি বাহিনীকে। ফলে অনুরূপ প্রতিরক্ষা নিশ্চয়তা পেতে আগ্রহী অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর অনুরোধকে সংযত করার চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ।
বোখারি বলেন, 'পাকিস্তানি বাহিনী এমনিতেই অতিরিক্ত চাপের মুখে রয়েছে', যার ফলে নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া তাদের জন্য 'অত্যন্ত কঠিন'।
