ইরানের অস্ত্র ও পরামর্শেই ইয়েমেনের বন্দরনগরী মোখা শহর দখল করেছে হুথিরা
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ধরে এ সপ্তাহে হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রার পেছনে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সরাসরি নির্দেশনা ছিল।
ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তা, ইরানি ও আঞ্চলিক কয়েকটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধে নতুন একটি ফ্রন্ট খুলতেই হুথিদের এই অগ্রযাত্রার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মোখা দখলের মাধ্যমে হুথিরা বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ব্যাঘাত ঘটলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ আরও সংকুচিত হবে। ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করায় আগে থেকেই বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চাপে রয়েছে।
ইরানের মিত্র হুথি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের ছয় মাসের মাথায় এসে গোষ্ঠীটি এখন ওই প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করার দিকে মনোযোগী বলে মনে হচ্ছে।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট সরকারপন্থী বাহিনী উত্তরাঞ্চলে অভিযান চালানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
ইরানের দুটি সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ইরান হুথিদের যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরবে হামলা আরও জোরদার করতে বলেছে। এ কাজে সহায়তার জন্য আরও অর্থ, অস্ত্র ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাঠানোরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তেহরান।
ইরান হুথিদের মিত্র হিসেবে বর্ণনা করলেও প্রকাশ্যে তাদের সামরিক নির্দেশনা দেওয়ার কথা অস্বীকার করে আসছে। ইরানের দাবি, হুথিরা তাদের 'প্রক্সি' নয়।
তেহরানের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া এক আঞ্চলিক কূটনীতিক জানিয়েছেন, সামরিক কৌশল নিয়ে কয়েক সপ্তাহের আলোচনার পর আইআরজিসির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ইয়েমেনে গিয়েছিলেন। তারা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের পরিচালিত হামলা তদারক ও কমান্ড করেছেন।
তৃতীয় এক ইরানি সূত্র বলেছেন, ইরান হুথিসহ অন্যান্য মিত্রদের সঙ্গে কয়েকটি বৈঠক করেছে। তবে মোখার দিকে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্তটি ইরানের নয়, হুথিদেরই।
ওই সূত্র আরও বলেন, এই পদক্ষেপ তেলের দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি করে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ইরানকে সহায়তা করেছে।
ইয়েমেনের ভেতরে সৌদি আরব-সমর্থিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পাঁচ সামরিক সূত্র জানিয়েছে, লোহিত সাগর উপকূল ধরে হুথিদের নতুন অভিযান আইআরজিসি পরিচালনা করেছে। তিহামা নামে পরিচিত সমতল ও সংকীর্ণ ওই উপকূলীয় এলাকায় রকেট হামলার মাধ্যমে অভিযানটি শুরু হয়।
ইয়েমেনি সামরিক সূত্রগুলো যোগাযোগের আড়িপাতা তথ্য এবং আটক হুথি যোদ্ধাদের বক্তব্যের বরাত দিয়ে বলেছে, তাদের ধারণা যে ইরানের এই অভিযান পরিচালনা করছেন আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডার আবদোলরেজা শাহলেই।
ইরানি সূত্রগুলো তাৎক্ষণিকভাবে এ তথ্য নিশ্চিত করতে পারেনি।
তবে তারা এর আগে বলেছিল, আইআরজিসির বিশেষায়িত কুদস ফোর্সের সদস্য শাহলেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়েমেনে সময় কাটিয়েছেন।
ইরানি সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে আকাশ ও সমুদ্রপথে অবরোধ থাকা সত্ত্বেও আইআরজিসি ইয়েমেনে অস্ত্র ও জনবল আনা-নেওয়া করতে সক্ষম হয়েছে।
তবে কীভাবে তারা এটা করেছে, সে বিষয়ে তারা বিস্তারিত জানায়নি।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেন বিশ্লেষক আহমেদ নাগি বলেন, 'পশ্চিম উপকূলে তাদের অভিযান দেখলে বোঝা যায়, এটি তাৎক্ষণিক প্রস্তুতি নিয়ে চালানো কোনো অভিযান নয়।'
তিনি মোখা দখলকে যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেন।
নাগি বলেন, 'হুথিদের সক্ষমতার বিকাশ মূলত তাদের পাওয়া নতুন অস্ত্রের কারণে হয়েছে। এসব অস্ত্র তারা সরাসরি ইরানিদের কাছ থেকে অথবা বিভিন্ন চোরাচালান নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পেয়েছে।'
সর্বশেষ অভিযানে হুথিদের ড্রোন ব্যবহারের বিষয়টি তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।
অনিশ্চিত সামরিক পরিস্থিতি
গত সপ্তাহে হুথিরা মোখার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করলে ইয়েমেন সরকার সৌদি আরবের কাছে আরও বিমান সহায়তা ও অন্যান্য সহযোগিতা চেয়েছিল বলে জানিয়েছেন আরও দুই ইয়েমেনি কর্মকর্তা।
তারা বলেন, হুথিদের প্রধান ঘাঁটি সানা এবং তেল সংরক্ষণাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থাপনা ও অন্যান্য হুথি লক্ষ্যবস্তুতে সৌদি বিমান হামলা চালানোর অনুরোধ জানিয়েছিল ইয়েমেন সরকার।
তবে সৌদি আরব শুধু রসদ, অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। দেশটি সীমিতসংখ্যক বিমান হামলা চালিয়েছে, যা উত্তরাঞ্চলের জাওফ ও মারিব প্রদেশের যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে কেন্দ্রীভূত ছিল। ইয়েমেন সরকার এসব এলাকাকে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করত।
ওই কর্মকর্তাদের নিজস্ব মূল্যায়ন হলো, হুথিদের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে রিয়াদ উদ্বিগ্ন ছিল। কারণ, এতে সৌদি ভূখণ্ডে আরও ব্যাপক ড্রোন হামলার আশঙ্কা ছিল।
লোহিত সাগর উপকূল এবং হুথিদের অন্যান্য বড় লক্ষ্যবস্তুর পরিবর্তে উত্তরাঞ্চলীয় ফ্রন্টে সৌদি আরবের সামরিক মনোযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্সের অনুরোধে সৌদি কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেননি।
২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকে কয়েক বছর ধরে বড় ধরনের যুদ্ধ বন্ধ থাকায় ইয়েমেনের সামগ্রিক সামরিক পরিস্থিতি নির্ণয় করা কঠিন। ইরান ও সৌদি আরব—দুই দেশই ইয়েমেনে তাদের সমর্থিত বাহিনীগুলোতে বিনিয়োগ করেছে। তবে সরকারপন্থী জোট অভ্যন্তরীণ বিভক্তির কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
নাগি বলেন, তিহামায় আগের কয়েক দফা যুদ্ধে হঠাৎ অগ্রসর হওয়া ও পিছু হটার ঘটনা ঘটলেও এবার সৌদি-সমর্থিত বাহিনী সহজেই হুথিদের সরিয়ে দিতে পারবে কি না, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
তিনি বলেন, 'সৌদিদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে হয়তো আমরা সরকারের কিছু অগ্রগতি দেখতে পারি। তবে এবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কঠিন হতে পারে।'
