ইরানের হামলার পর বিশ্বের অন্যতম বড় এআই ডেটা সেন্টার পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনছে আমিরাত
ইরানের হামলার পর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। এর অংশ হিসেবে আবুধাবিতে ৫ গিগাওয়াট ক্ষমতার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ডেটা সেন্টার প্রকল্পের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছয়জন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
মূল পরিকল্পনায় আবুধাবিতে ২৬ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিশ্বের অন্যতম বড় একটি ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস নির্মাণের কথা ছিল। তবে চারজন সূত্রমতে, এখন ইউএইর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ডেটা সেন্টার নিয়ে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদারে নতুন পরিকল্পনা করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত রাখতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বসানো এবং কিছু স্থাপনা মাটির নিচে নির্মাণের বিষয়ও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বৈশ্বিক এআই উচ্চাকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র ডেটা সেন্টার প্রকল্প
মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বে নির্মাণাধীন ইউএই-ইউএস এআই ক্যাম্পাসের পরিকল্পনা গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপসাগরীয় দেশটি সফরের সময় ঘোষণা করা হয়।
তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউএইকে বৈশ্বিক এআই শক্তিতে পরিণত করার পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান অংশ এই প্রকল্প। এটি পরিচালনা করছে এআই প্রতিষ্ঠান জি৪২। প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন ইউএইর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও প্রেসিডেন্টের ভাই শেখ তাহনুন বিন জায়েদ আল নাহিয়ান।
এনভিডিয়ার এআই চিপ ও অন্যান্য উন্নত মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগের বিনিময়ে ইউএই চীনের সঙ্গে এআই সহযোগিতা কমাতে এবং স্টারগেট উদ্যোগের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিনিয়োগ করতে সম্মত হয়েছে। স্টারগেট হলো ওপেনএআই, ওরাকল ও সফটব্যাংকের যৌথ উদ্যোগ।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ব্যক্তিদের মধ্যে একজন মার্কিন কর্মকর্তা, একজন পশ্চিমা কূটনীতিক এবং প্রকল্পের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত কয়েকজন শিল্প নির্বাহী রয়েছেন। তবে নতুন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কাজ কতদূর এগিয়েছে বা এতে প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ও সময়সূচিতে কতটা পরিবর্তন আসবে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রকল্পটির প্রথম ধাপের নির্মাণকাজ গত বছর শুরু হয়েছে। ৩০ বিলিয়ন ডলারের এই ধাপে ১ গিগাওয়াট ক্ষমতার কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। 'স্টারগেট ইউএই' নামে পরিচিত এই ধাপের প্রথম ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা চলতি বছর চালু হওয়ার কথা।
প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে ইউএই সরকারের সব সংস্থা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত এআই মডেলের সঙ্গে যুক্ত করার মতো সক্ষমতা তৈরি হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের অংশীদার ওরাকলের চেয়ারম্যান এবং প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ল্যারি এলিসন।
প্রকল্পে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে জি৪২ জানিয়েছে, এআই ক্যাম্পাসের কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, 'এই মাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা, স্থিতিস্থাপকতা ও পরিচালনাগত মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয় নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়।'
ওপেনএআই জানিয়েছে, তারা ইউএইর সঙ্গে দেশটির এআই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে। প্রকল্পের অবকাঠামো ও এআই ব্যবহারের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিতে 'ভালো অগ্রগতি' হচ্ছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
মাটির নিচে ও পাহাড়ে স্থাপনা
শিল্প খাতের একজন নির্বাহী ও প্রকল্পের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত আরেক ব্যক্তি জানিয়েছেন, এআই ক্যাম্পাসের প্রথম ধাপের নির্মাণকাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী চলবে। তবে আকাশপথের হামলা থেকে সুরক্ষার জন্য এতে কিছু পরিবর্তন আনা হতে পারে। প্রকল্পের বাকি অংশ ইউএইর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দুইজন ব্যক্তি জানান, মাটির নিচে স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি সামরিক কাজে ব্যবহৃত সংবেদনশীল তথ্য সংরক্ষণ করা হবে—এমন ডেটা সেন্টার পাহাড়ের ভেতর নির্মাণের বিষয়ও বিবেচনা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপে পরিত্যক্ত খনি, শীতল যুদ্ধের সময়কার বাংকার ও গুহার ভেতর ডেটা সেন্টার নির্মাণের নজির রয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব আরব উপদ্বীপে অবস্থিত ইউএই মূলত সমতল ও মরুভূমি অঞ্চল। তবে দেশটির উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাস আল খাইমাহ ও ফুজাইরাহ আমিরাতে পাহাড়ি এলাকা রয়েছে।
তিনটি সূত্র জানিয়েছে, নতুন পরিকল্পনায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও যুক্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে থাকবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রযুক্তি।
এ ছাড়া বিস্ফোরণ প্রতিরোধী কংক্রিট এবং বিকল্প বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণ ব্যবস্থা যুক্ত করার কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আরেক ব্যক্তি।
