ফের ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু করেছে ইরান
মজুত থাকা বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে মাটির নিচের সুরক্ষিত স্থাপনাগুলোতে আবারও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের কাজ শুরু করেছে ইরান। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত মার্কিন ও মধ্যপ্রাচ্যের কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। এর ফলে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দাবি করা সবচেয়ে বড় সাফল্যের জায়গাটিই এখন অনেকটা ম্লান হতে বসেছে।
কয়েকজন কর্মকর্তা দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানের বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও শিল্প স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছিল। তা সত্ত্বেও দেশটি তরল জ্বালানি ও কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজনের লাগানোর কাজ পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে। তরল জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ঠিক আগমুহূর্তে জ্বালানি ভরতে হয়; অন্যদিকে কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি হামলার জন্য প্রস্তুত অবস্থাতেই মজুত করে রাখা যায়।
তারা বলেন, গোয়েন্দা তথ্য বলছে, দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের খোজির ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাসহ বেশ কয়েকটি ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিতে কর্মতৎপরতা চলছে। নতুন করে হামলা থেকে বাঁচতে ইরান নতুন ভূগর্ভস্থ সংযোজন কারখানা গড়ে তোলার চেষ্টাও করছে।
মার্কিন ও আঞ্চলিক কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান মূলত যুদ্ধের আগের তুলনায় সীমিত পরিসরে এবং আগে থেকে মজুত থাকা যন্ত্রাংশ দিয়েই এসব নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও এর বিভিন্ন উপাদান তৈরির কাজে ব্যবহৃত বেশ কিছু কারখানা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি নৌ-অবরোধের কারণে বাইরে থেকে যন্ত্রাংশ ও কঠিন জ্বালানির কাঁচামাল আমদানি করাও কঠিন হয়ে পড়েছে তেহরানের জন্য।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ২৮ ফেব্রুয়ারি তাদের যৌথ আগ্রাসন শুরুর অন্যতম মূল লক্ষ্য ছিল তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করা। তবে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের এই খবরই প্রমাণ করছে, সেই লক্ষ্য অর্জন কতটা কঠিন। এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ইরানের টিকে থাকার সক্ষমতাও বাড়িয়ে দিচ্ছে এই উৎপাদন। কারণ একদিকে ইরানের অস্ত্রের সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মিসাইল ইন্টারসেপ্টরের মজুত ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা মিসাইল ডিফেন্স অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্স-এর সিনিয়র বিশ্লেষক তাল ইনবার বলেন, 'স্থাপনাগুলোতে যখন বোমা হামলা বন্ধ থাকে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত করে নেওয়া যায়। তাছাড়া অন্য দেশ থেকে নতুন যন্ত্রাংশ কিনে এনে সেসব স্থাপনায় মজুত করাও সম্ভব। ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা নতুন করে পুনর্গঠন করছে না—এমনটা ভাবা হবে চরম বোকামি।'
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তেহরান নতুন করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি শুরু করেছে কি না—হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা সরাসরি সে প্রশ্নের উত্তর দেননি। তবে তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'ইরান এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে দুর্বল। আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিছুতেই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে দেবেন না।'
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র 'ইরানের ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌবাহিনীর শিল্পঘাঁটির প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ধ্বংস করে দিয়েছে'। সেইসঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার সক্ষমতাও 'উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।'
যুদ্ধের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হাজার হাজার হামলা চালিয়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। এসব হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা, গুদাম, ক্ষেপণাস্ত্র ও সেগুলোর উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা (লঞ্চার)। তবে গ্রীষ্মের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ইরান আবার নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলছে। কারণ তাদের ধারণা, এই যুদ্ধবিরতি বেশি দিন স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, জুনের মাঝামাঝি সময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধ অবসানের আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রাথমিক সমঝোতা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এই চুক্তির পরই ইরান সীমিত পরিসরে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি শুরু করে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, তেহরানের কাছে মজুত থাকা যন্ত্রাংশ দিয়ে অন্তত ২০০ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করার মতো সামর্থ্য রয়েছে বলে মনে করা হয়।
লন্ডনের কিংস কলেজের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো ও সিআইএ-র সাবেক ইরানবিষয়ক সামরিক বিশেষজ্ঞ জিম ল্যামসন বলেন, যুদ্ধের আগেই ইরান বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ মজুত করেছিল। এসবের মধ্যে ছিল সম্পূর্ণ প্রস্তুত ওয়ারহেড, এয়ারফ্রেম এবং গাইডেন্স ও কন্ট্রোল সিস্টেম।
ইরানের প্রকাশ করা গের বেশ কিছু ছবি ও ভিডিওর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে দেখা গেছে ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোর দেয়াল ঘেঁষে এমন বহু যন্ত্রাংশ সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা রয়েছে। ইরান ঠিক কতগুলো নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারবে, তা নির্ভর করছে তাদের এই মজুতের পরিধি এবং কতগুলো ভূগর্ভস্থ কারখানা চালু রয়েছে, তার ওপর।
'ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যাটা কয়েকশো হতে পারে, আবার কয়েক হাজারও হতে পারে,' বলেন তিনি।
যুদ্ধ চলাকালে সম্পূর্ণ প্রস্তুত মিসাইলের মজুতে বেশ টান পড়েছিল ইরানের। এ কারণেই তাদের হামলার তীব্রতা কমিয়ে আনতে হয়েছিল। কিন্তু তারপরও তাদের বিপুল সক্ষমতা অবশিষ্ট রয়ে গেছে। ইনবারের মূল্যায়ন অনুসারে, ইরানের অস্ত্রভান্ডারে এখনো কয়েক হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরান নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব হামলায় তারা নিজেদের অস্ত্রের বৈচিত্র্য প্রদর্শন করছে। এই হামলায় ব্যবহৃত কিছু ক্ষেপণাস্ত্র—যেমন খাইবার শেকান—সহজে স্থানান্তরযোগ্য, অত্যন্ত নির্ভুল এবং উৎপাদনে তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হিসেবে বিবেচিত।
বুধবার জর্ডানের এক বিমানঘাঁটিতে একযোগে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। ওই ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাসদস্যরা অবস্থান করছেন। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে ক্লাস্টার ওয়ারহেড যুক্ত ছিল। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে ও পরাস্ত করতে যুদ্ধের শুরুর দিকে ইসরায়েলে প্রায়ই এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হতো।
এপ্রিলে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি 'কার্যত ধ্বংস' হয়ে গেছে; নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির মতো সামর্থ্য তাদের আর নেই।
আরব ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, লড়াই আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ যত জোরদার হচ্ছে, ইরানের পক্ষ থেকে সংঘাতের তীব্রতা ও পরিসর আরও বাড়ানোর ঝুঁকিও তত বাড়ছে। গত কয়েক দিনে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছে ইরান। এসব হামলায় কোনো জাহাজ সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত না হলেও সেগুলো অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ইরান সেতু, সড়ক থেকে শুরু করে উৎপাদন কেন্দ্র পর্যন্ত সবকিছু দ্রুতগতিতে পুনর্নির্মাণ করছে, যা ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ধসে যাওয়া ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির সুড়ঙ্গমুখগুলো ইতিমধ্যে মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করে তুলেছে ইরান। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভূগর্ভস্থ এসব ঘাঁটিতে সংরক্ষিত অস্ত্রগুলো খুব সম্ভব অক্ষত অবস্থাতেই রয়েছে।
আরব কর্মকর্তারা জানান, ক্ষেপণাস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে ফিরে যাওয়ার পথে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে। বিশেষ করে তরল জ্বালানি তৈরির রাসায়নিক কারখানা এবং কঠিন জ্বালানি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শিল্প মিক্সার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে।
আধুনিক বিমানবাহিনীর ঘাটতি থাকায় ১৯৮০-র দশকে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধের সময় নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি গড়ে তুলেছিল ইরান। এরপর থেকে শত্রুদের প্রতিরোধ করতে দেশটি মূলত এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করে আসছে।
২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পরও নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠনের সক্ষমতা প্রমাণ করেছিল তেহরান। ওই সময় ইসরায়েল ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি লক্ষ্য করে দফায় দফায় হামলা চালালেও ইরান ধারণার চেয়েও দ্রুতগতিতে অস্ত্রের মজুত ফের গড়ে তোলে।
প্যারিসের সায়েন্সেস পো-র ইরানি কৌশলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিকোল গ্রাজেউস্কি বলেন, 'চাইলে বিভিন্ন স্থাপনা কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করে দেওয়া যায়। তবে পারমাণবিক কর্মসূচির তুলনায় ক্ষেপণাস্ত্র পুনর্নির্মাণের সক্ষমতা অনেক দ্রুত এবং এর নেটওয়ার্কও বহু জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কায় ইরান আগে থেকেই এত বিশদ ও সুরক্ষিত ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো তৈরি করে রেখেছিল।'
