এবার কৌশলগত দ্বীপের দখল নিল ইরানের মিত্ররা, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথে আরও বাড়ল তেহরানের প্রভাব
ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিরা শুক্রবার বাব আল-মান্দেব প্রণালির কৌশলগত পেরিম দ্বীপ দখল করেছে। ইয়েমেন সরকারের দুটি সূত্র সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছে। এর ফলে বিশ্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে তেহরানের প্রভাব বাড়তে পারে।
এর একদিন আগে হুথি গোষ্ঠী মোখা বন্দরনগরী দখল করে। ইয়েমেনের লোহিত সাগরের উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তারা শহরটি দখল করে।
এর ফলে বৈশ্বিক নৌপথ ও তেলের দামের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে নতুন একটি ফ্রন্ট খোলার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বাব আল-মান্দেব এশিয়া ও ইউরোপকে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের মাধ্যমে যুক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক নৌপথ। তেল বাণিজ্যের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির তুলনায় এটি কম গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেলসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহনে এই নৌপথ ব্যবহার করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। ফলে সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির জন্য লোহিত সাগরের নৌপথ ব্যবহার করছে।
চলতি সপ্তাহে তেহরান সতর্ক করে বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শত্রুতা আরও বাড়াবে। দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ অবরোধ অব্যাহত রয়েছে এবং ইরানে সামরিক হামলাও চালিয়ে যাচ্ছে ওয়াশিংটন।
কীভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি হলো?
দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর গত এক মাসে ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুথিদের মধ্যে আবারও লড়াই তীব্র হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে সৃষ্ট উত্তেজনাই এর পেছনে রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি এবং ওয়াশিংটনের কাছ থেকে আরও ছাড় আদায়ের উপায় খুঁজতে গিয়ে লোহিত সাগর ইরানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
গত মাসে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর কাছ থেকে বন্দরনগরী মোখার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লক্ষ্যে হুথিরা অভিযান জোরদার করে। কয়েক সপ্তাহ আগে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো যখন বন্দরে পণ্য ওঠানামা করছিল, তখন ২৫টির বেশি হুথি রকেট বন্দর এলাকায় আঘাত হানে বলে জানিয়েছেন বন্দরটির পরিচালক আবদেল মালেক আল-শারাবি।
বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত শহরটির নিয়ন্ত্রণ ছিল ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের হাতে। সৌদি-সমর্থিত এই বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন তারিক সালেহ, যিনি সংকটে থাকা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট। পরে হুথিরা শহরটি দখলের দাবি করে। এরপর খবর আসতে থাকে, পুরো উপকূল দখলের লক্ষ্যে গোষ্ঠীটি অন্য শহরগুলোর দিকেও অগ্রসর হচ্ছে।
চলতি মাসের শুরুতে সিএনএনকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে সালেহ সতর্ক করে বলেছিলেন, বাব আল-মান্দেবের নৌপথের ওপর সরাসরি অবস্থিত পেরিম দ্বীপ হুথিরা দখল করতে পারলে তারা প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। তাদের সেখান থেকে সরাতে 'একটি বিশাল বাহিনী এবং নৌবাহিনী' প্রয়োজন হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এখনই কেন এমন হলো?
লোহিত সাগরসংলগ্ন পশ্চিম উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকাগুলো দখলে হুথিদের অভিযান গোষ্ঠীটির জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য পূরণ করছে বলে মনে করেন একজন বিশেষজ্ঞ।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি সিএনএনকে বলেন, 'তারা বাব আল-মান্দেবের আশপাশে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর ভালো অবস্থানে রয়েছে... এবং এখন এই এলাকা থেকে আসতে পারে এমন যেকোনো স্থল অভিযান থেকেও তারা নিজেদের রক্ষা করতে পারবে।'
২০২২ সালের হুথি ও সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তা সত্ত্বেও কয়েক মাস ধরে ইয়েমেনের পক্ষগুলোর মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল তীব্র অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট। জুলাইয়ে সেই উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। ওই সময় ইরানের একটি বিমান হুথিদের নিয়ন্ত্রিত সানা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানটিতে হুথিদের একটি প্রতিনিধিদল ছিল, যারা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় অংশ নিতে যাচ্ছিল।
হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে চার বছরের যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের অভিযোগ তোলে। এরপর তারা সৌদি জাহাজ অবরোধ করে, ইয়েমেনের কাছ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালায় এবং সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় আক্রমণ করে।
এই হামলার ফলে সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়ানোর সুযোগও পায় ইরান। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র এবং সেখানে মার্কিন সেনা ও সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেগুলো ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে বলে তেহরানের অভিযোগ।
এরপর কী?
পেরিম ও মোখা দখলের ফলে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পাওয়া হুথিরা লোহিত সাগরে আরও বেশি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডও বাড়তে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের সম্মুখসারির অবস্থান বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে।
ভূরাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে এই পরিস্থিতি ইয়েমেনের মানবিক সংকট আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। জাতিসংঘ ইতোমধ্যেই দেশটির মানবিক সংকটকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বাব আল-মান্দেবে হুথিদের কার্যকর অবরোধ তৈরি হলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে নতুন একটি ফ্রন্ট খুলে যেতে পারে এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে। এতে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি বাজারের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সৌদি আরবের ইউরোপে ডিজেল পাঠানোও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এই পদক্ষেপ তেলের বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি করছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা ইতোমধ্যে খুব কম থাকায় বাজার চাপের মধ্যে রয়েছে। লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় হুথিদের অগ্রসর হওয়ার খবর প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার তেলের দাম ৪ শতাংশ বেড়ে যায়। বৈশ্বিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০৫ ডলারে পৌঁছায়। তবে যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা তাদের ইরানি প্রতিপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করতে যাচ্ছেন—এমন খবরের মধ্যে শুক্রবার তেলের দাম ৩ শতাংশ কমে যায়।
উদ্বেগের মধ্যেও হুথির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাদের এই অগ্রযাত্রা আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলের জন্য উদ্বেগের কারণ নয়। গোষ্ঠীটি বলেছে, তারা কেবল সৌদি জাহাজকে লক্ষ্য করছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের নাগি বলেন, 'এখন প্রশ্ন হলো, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। এটি যুদ্ধের শেষ নয়, আগামী কয়েক দিনে আমরা সম্ভবত আরও কিছু অগ্রগতি দেখতে পাব।'
