লোহিত সাগরে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়তেই গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন বন্ধ করল সৌদি আরব
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যে ড্রোন হামলার পর গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। বাগদাদ ও রিয়াদ জানিয়েছে, ইরাক থেকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী এ হামলা চালিয়েছে। এ হামলার জেরে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ইরাকের একজন সামরিক কমান্ডারকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি আরব উপদ্বীপজুড়ে বিস্তৃত। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার কারণে সেখানে তৈরি হওয়া জট এড়িয়ে সৌদি আরবকে তেল রপ্তানিতে সহায়তা করছিল পাইপলাইনটি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের কারণে বর্তমানে প্রণালিটিতে ট্যাংকার চলাচল প্রায় বন্ধের পর্যায়ে রয়েছে।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ করা হয়েছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাইপলাইনটির মাধ্যমে প্রতিদিন ৪০ লাখ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছিল। যা বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ।
ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার সময়ই এই হামলা হলো। হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ার সঙ্গে লোহিত সাগরে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় আরব উপদ্বীপের দুই পাশেই জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
শুক্রবার লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ হুথিরা দখল করেছে বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ইয়েমেন সরকারের চারজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
সৌদি আরবের তেল পাইপলাইন ও পেরিম দ্বীপে শুক্রবারের হামলা যুদ্ধ আরও বিপজ্জনকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত। একই সময়ে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও থমকে আছে।
ওই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক সহায়তার জন্য সৌদি আরব ওয়াশিংটনের কাছে সহযোগিতা চেয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় নভেম্বরে কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে এর রাজনৈতিক চাপ ইতোমধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান পার্টির ওপর পড়ছে।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকালে দেশটির রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে হামলা হয়।
হামলার জন্য কারা দায়ী, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। স্যাটেলাইট ছবিতে মদিনার দক্ষিণে পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তেল রপ্তানিতে এর কী প্রভাব পড়েছে, তা জানানো হয়নি।
শনিবার ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, বরখাস্ত হওয়া ইরাকি সামরিক কমান্ডার মাইসান প্রদেশে সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব দিতেন। ইরানের সীমান্তবর্তী দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এই প্রদেশটি দীর্ঘদিন ধরেই ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তৎপর রয়েছে এবং প্রভাব বিস্তার করে আসছে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধের পর সৌদি আরব এখন পর্যন্ত হামলার জবাব না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় 'প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা' নেওয়ার অধিকার সৌদি আরব সংরক্ষণ করে বলেও জানানো হয়েছে। ইরাক সরকার হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) শুক্রবার জানিয়েছে, সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল সরবরাহ তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হুথি-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর হামলাও এর অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
ইরাক হামলার জবাবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইরান সীমান্তের শালামচেহ সীমান্তপথ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন দেশটির দুজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা।
ইরানে থেকে সবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য আমদানির অন্যতম প্রধান পথ এই সীমান্তপথ।
পাইপলাইনে হামলার জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করতে ইরাকে ব্যাপক অভিযান চলছে বলেও জানিয়েছেন ওই দুই কর্মকর্তা।
