ট্রাম্পের হাতে নিজের নোবেল তুলে দিয়েও মেলেনি সমর্থনের আশ্বাস, জুটল শুধুই ট্রাম্পের নাম লেখা উপহারের ব্যাগ
গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া করিনা মাচাদো। সঙ্গে করে নিয়ে এলেন এমন এক উপহার, যার প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লোভ দীর্ঘদিনের—তার নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কার।
ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাচ্যুত শাসক নিকোলাস মাদুরোর কট্টর সমালোচক মাচাদো। গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করায় গত বছরই তিনি এই পুরস্কার জিতেছেন। হোয়াইট হাউসে নিজের অর্জিত সেই মেডেলটিই রেখে এলেন তিনি। আশা ছিল, এই উপহারের বিনিময়ে হয়তো আরও মূল্যবান কিছু মিলবে—মাদুরো-পরবর্তী ভেনেজুয়েলার নেতৃত্ব দেওয়ার লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন।
কিন্তু মাচাদো যদি ভেবে থাকেন যে এই উপহার ট্রাম্পের মন গলাবে এবং তিনি সুস্পষ্ট সমর্থন পাবেন, তবে আপাতত তাকে অপেক্ষাই করতে হচ্ছে।
হোয়াইট হাউস থেকে বের হওয়ার সময় মাচাদোর হাতে দেখা যায় ট্রাম্পের নাম লেখা একটি 'ব্যাগ'। কিন্তু তার নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো স্পষ্ট বার্তা মেলেনি।
মাদুরো-পরবর্তী ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বের দৌড়ে যে দুজন লড়ছেন, মাচাদো তাদের একজন। তবে ট্রাম্প বেছে নিয়েছেন দীর্ঘদিনের ক্ষমতাঘনিষ্ঠ দেলসি রদ্রিগেজকে, যিনি বর্তমানে দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায়, ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন মাচাদো। ট্রাম্পের হাতে সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো একটি বড় প্ল্যাক। দেওয়ালে ঝোলানোর মতো করে সাজানো সেই প্ল্যাকে নোবেল মেডেলটি রাখা আছে। তাতে লেখা—'মুক্ত ভেনেজুয়েলা নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতিগত ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপের স্বীকৃতিস্বরূপ ভেনেজুয়েলার জনগণের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতার প্রতীক হিসেবে এটি উপহার দেওয়া হলো।'
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, 'আমার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে মারিয়া আমাকে তার নোবেল শান্তি পুরস্কারটি উপহার দিয়েছেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের কী চমৎকার এক নিদর্শন!'
তবে অসলোভিত্তিক নোবেল পিস সেন্টার তাৎক্ষণিকভাবে জানিয়েছে, নোবেল মেডেল এভাবে হস্তান্তর বা ভাগ করে নেওয়া যায় না। 'এক্স'-এ তারা লিখেছে, 'একটি মেডেলের মালিকানা বদল হতে পারে, কিন্তু নোবেল বিজয়ীর খেতাব কখনো বদলায় না।'
এদিকে গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকির জেরে মাচাদোর এই কাণ্ডে হতাশ নরওয়ের কয়েকজন আইনপ্রণেতা। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত এই দ্বীপটি নিয়ে আগে থেকেই উত্তাপ ছড়িয়েছেন ট্রাম্প।
নরওয়ের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নেতা ও অসলোর সাবেক মেয়র রেমন্ড জোহানসেন ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, 'এটি অবিশ্বাস্য রকম লজ্জাজনক ও ক্ষতিকর।' তিনি আরও বলেন, 'পুরস্কার দেওয়াটা এখন এতটাই রাজনীতিকীকরণ হয়ে গেছে যে, এটি শেষ পর্যন্ত শান্তি পুরস্কারের মূল উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।'
নরওয়ের সোস্যালিস্ট লেফ্ট পার্টির নেতা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক মুখপাত্র কিস্টি বার্গস্টো দেশটির টিভি টু চ্যানেলকে বলেছেন, এভাবে পুরস্কার বিলিয়ে দেওয়াটা 'অযৌক্তিক ও অর্থহীন'।
'আবেগঘন মুহূর্ত'
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাচাদো বলেন, মেডেলটি ট্রাম্পের হাতে তুলে দেওয়া ছিল 'ভীষণ আবেগঘন এক মুহূর্ত'। নিজের এই কাজের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, ট্রাম্প এটার 'যোগ্য'।
সাংবাদিক র্যাচেল ক্যাম্পোস-ডাফিকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারের একটি অংশ শুক্রবার প্রচারিত হয়। সেখানে মাচাদো বলেন, 'এটি ছিল এক বিশাল দায়িত্ব, কারণ আমি ভেনেজুয়েলার জনগণের পক্ষ থেকে এই কাজটি করেছি।'
দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে নেতৃত্ব দেওয়ার ব্যাপারে মাচাদো তার ইচ্ছার কথা আবারও স্পষ্ট করেছেন।
তিনি বলেন, 'আমি আমার দেশের সেবা করতে চাই। আমি বিশ্বাস করি, সঠিক সময় এলে আমি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হব। ভেনেজুয়েলার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট।'
এর আগে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎকে 'ঐতিহাসিক' ও 'অসাধারণ' বলে উল্লেখ করেছিলেন মাচাদো। তিনি জানান, ভেনেজুয়েলার প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন এবং মানবাধিকার ও বাক্স্বাধীনতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মার্কিন প্রশাসন সচেতন রয়েছে।
মাচাদো জোর দিয়ে বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় ইতিমধ্যে একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রয়েছেন। তিনি হলেন বিরোধী দলীয় প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেজ। ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রও তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
তৎকালীন নির্বাচন কমিশন নিকোলাস মাদুরোকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিল। এরপর মার্কিন বিশেষ বাহিনীর হাতে হঠাৎ আটক হওয়ার আগপর্যন্ত তিনি ক্ষমতা আঁকড়ে ছিলেন। তবে বিরোধী দল ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা তখন নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলেছিল।
আগে ওয়াশিংটন মাচাদো ও গঞ্জালেজের পাশে থাকলেও মাদুরো আটকের পর ট্রাম্প আর বিরোধীদের সমর্থন দেননি। বরং তিনি মাদুরো সরকারেরই অংশ ডেলসি রদ্রিগেজকে সমর্থন দেন, যা মাদুরোবিরোধীদের হতবাক করে দেয়। ট্রাম্প প্রশাসন বারবারই ইঙ্গিত দিয়েছে, রদ্রিগেজকে তারা একজন স্থিতিশীল ও বাস্তববাদী নেতা মনে করে, যার সঙ্গে কাজ করা সম্ভব।
খালি হাতেই ফেরা?
মাচাদো বেশ ইতিবাচক কথা বললেও ছবি তোলা আর ট্রাম্পের নাম খোদাই করা উপহারের ব্যাগ ছাড়া তিনি আসলে কী পেলেন, তা অস্পষ্ট।
বৃহস্পতিবার বৈঠকের শুরুতে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানান, মাচাদো সম্পর্কে ট্রাম্পের মূল্যায়ন বদলায়নি।
লেভিট বলেন, 'প্রেসিডেন্ট এই বৈঠকের জন্য উন্মুখ ছিলেন। মিস মাচাদো ভেনেজুয়েলার বহু মানুষের জন্য এক অদম্য ও সাহসী কণ্ঠস্বর।' তবে তিনি এ-ও জানিয়ে দেন, ভেনেজুয়েলা পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত সমর্থন মাচাদোর নেই বলে ট্রাম্প আগে যে মন্তব্য করেছিলেন, সেই অবস্থানে কোনো নড়চড় হয়নি। লেভিটের ভাষায়, 'এই মুহূর্তে এ বিষয়ে তার (ট্রাম্পের) মতামতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।'
