সরকারি চাকরিজীবীদের গড় বেতন ১০৫% বৃদ্ধির সুপারিশ থাকছে পে কমিশনের প্রতিবেদনে
সরকারি চাকরিজীবীদের গড় বেতন ১০৫ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করে সরকার গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন আজ বুধবার (২১ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেবে।
প্রতিবেদনে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন–ভাতা ১৪০ শতাংশ বাড়িয়ে বর্তমান ১৮ হাজার টাকা থেকে ৪২ হাজার টাকা করার প্রস্তাব থাকতে পারে। একই সঙ্গে ১ নম্বর গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেতন ৮০ শতাংশ বাড়িয়ে ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হতে পারে।
কমিশনের একজন সদস্য মঙ্গলবার নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে টিবিএসকে বলেন, কমিশনের সর্বশেষ বৈঠকে সরকারি চাকরিজীবীদের গড় বেতন ১০৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০তম গ্রেডভুক্তদের বেতন ১৪০ শতাংশ এবং ১ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেতন ৮০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ থাকবে।
কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা বিশেষ ভাতা পাবেন। একই গ্রেডভুক্ত কর্মকর্তাদের মূল বেতন সমান হলেও তাদের জন্য কিছু বিশেষ ভাতার সুপারিশ করা হচ্ছে।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আজ বুধবার বিকেল পাঁচটায় সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের নতুন বেতন ও ভাতার সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা হবে।
তিনি বলেন, ওই সময় অর্থ উপদেষ্টাও সেখানে উপস্থিত থাকবেন। তবে প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়ার আগে এর বিস্তারিত বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
ইনক্রিমেন্ট ও ভাতা
ইনক্রিমেন্ট ও ভাতা প্রসঙ্গে কমিশনের একজন সদস্য জানান, নতুন বেতন কাঠামোয় চাকরিজীবীদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট মূল বেতনের ৫ শতাংশ রাখার সুপারিশ করা হচ্ছে। বর্তমান বেতন কাঠামোতেও একই হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার বিধান রয়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দুই বছরের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরেও চাকরিজীবীদের বিশেষ প্রণোদনা দিয়েছে বর্তমান সরকার।
বর্তমানে উপসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা গাড়ি সুবিধা বাবদ এককালীন ৩০ লাখ টাকা সুদমুক্ত ঋণ এবং মাসে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ৫০ হাজার টাকা করে পান।
বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এই সুদমুক্ত ঋণের পরিমাণ ৪৫ লাখ টাকা এবং গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা মাসে ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দিলেও কমিশন তা গ্রহণ করেনি।
এ বিষয়ে কমিশনের ওই সদস্য বলেন, গুটিকয়েক উচ্চ বেতনধারী কর্মকর্তাই এই সুবিধা পান। কমিশনের কাছে বিদ্যমান সুবিধা যথেষ্ট মনে হওয়ায় তা অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, "পে কমিশনের সুপারিশে একটি সার্ভিস কমিশন গঠনের প্রস্তাব থাকছে। কারণ, পাবলিক সার্ভিসে কর্মরতদের মধ্যে কিছু অসামঞ্জস্যতা রয়েছে, যা পে কমিশনের আওতার বাইরে। এসব সমস্যা সমাধানে সার্ভিস কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হচ্ছে।"
প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে আজ দুপুর দুইটায় কমিশনের শেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে কমিশনের সদস্যদের স্বাক্ষর নেওয়ার পর প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন–ভাতার জন্য প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। পে কমিশনের সুপারিশ পাওয়ার পর জানুয়ারি থেকেই আংশিক বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংশোধিত বাজেটে এ খাতে আরও ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।
তবে অর্থবিভাগের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, "অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেন নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর না করে, সে জন্য বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে চাপ রয়েছে। তারা বলছেন, বেতন কাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সরকারের জন্য রেখে দেওয়া উচিত।"
এখনই বাস্তবায়ন হচ্ছে না
পে কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করবে না সরকার। সংশ্লিষ্ট কমিটিতে পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি জানান, পে কমিশনের সুপারিশ যাচাই ও পর্যালোচনার প্রক্রিয়ায় সাধারণত তিন থেকে চার মাস সময় লাগে। ফলে নতুন বেতন কাঠামো এখনই কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
ড. সালেহউদ্দিন বলেন, কমিশনের সুপারিশে সরকারি কর্মচারীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারি চাকরিজীবীরা খুশি হবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বেতন বৃদ্ধি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কার বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, "এতে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না। সরকার সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, যা বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।"
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে বেতন বৃদ্ধির কোনো রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি তা নাকচ করেন। তিনি বলেন, "এ বিষয়ের সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই।"
জাতীয় পে কমিশনের কাজকে দৃষ্টান্তমূলক উল্লেখ করে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, কমিশনের সদস্যরা বিস্তৃত পরিসরে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন পেশাজীবী, অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগী ও প্রবীণ নাগরিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছে।
সব দাবি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়—এ কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, "বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর চাহিদা ও প্রত্যাশা যতটা সম্ভব সুপারিশে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।"
